আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি ডলার

থমকে আছে কাস্টমসের মানি লন্ডারিং ঠেকানোর উদ্যোগ

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ১৩ জুন, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
96

আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে কোটি কোটি ডলার পাচার ঠেকানোর উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। নয় মাস আগে চট্টগ্রাম কাস্টমসে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং শাখা গঠন করা হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। প্রতিষ্ঠার নয় মাস গত হলেও দৃশ্যমান কোন কাজই শাখাটি করতে পারেনি। ওভার ইনভয়েসিং এবং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার চললেও কোন ঘটনারই কুলকিনারা করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত দুইটি চালানে অর্থ পাচারের ঘটনার ব্যাপারে মামলা করার অনুমোদন চেয়েও পাওয়া যায়নি। আরো চারটি চালানে অর্থ পাচারের ঘটনা চিহ্নিত হলেও তাও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এতে করে অর্থ পাচারকারীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দেশ থেকে চলে যাওয়া হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে গেলেও অর্থ পাচার ঠেকানোর কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত না হওয়ায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে নানাভাবে ফন্দিফিকির করে পাচার করা হয়েছে হাজার কোটি টাকা। ওভার ইনভয়েসিং করে যেমন ডলার পার করে দেয়া হয়েছে, তেমনি মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে খালি কন্টেনার এনেও কোটি কোটি ডলার পাচার করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম আমদানি বাণিজ্য। কোটি কোটি ডলারের পণ্য আমদানির আড়ালে বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে। বিদেশী রপ্তানিকারকদের অ্যাকাউন্ট থেকে পাচারকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের বিদেশি অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। দুবাই, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ নানা দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এসব অর্থ পাচারের কোন কুলকিনারা হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে চীন থেকে আমদানিকৃত একটি চালান আটক করা হয় গত বছরের ৭ মে। ঢাকার আমদানিকারক লোটাস সার্জিক্যাল এক হাজার ৭টি হুইল চেয়ার ও ৪৫০ পিস ক্রেচ প্লাস ওয়াকার আমদানির ঘোষণা দেয়। অথচ তিনটি কন্টেনারের মধ্যে এক কন্টেনারে মাত্র ৪০টি হুইল চেয়ার পাওয়া যায়। বাকি দুটি কন্টেনারে কার্টনভর্তি ইট নিয়ে আসা হয়। ওই চালানটি আমদানি করতে ৭১ হাজার ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানিকারক। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসেবে এরমূল্য দাঁড়ায় ৫৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
অপরদিকে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর বালুভর্তি একটি কন্টেনারের চালান আটক করে কাস্টমস। ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রোগ্রেস ইমপেক লিমিটেড ‘কাগজ’ আমদানির ঘোষণা দিয়ে ৪১০ বস্তা বালু নিয়ে আসে। ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি চীনে ১৫ হাজার ডলার পাঠিয়েও দেয়। এভাবে প্রতিনিয়ত পণ্য আমদানির নামে মানি লন্ডারিং হচ্ছে।
আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে টাকা পাচার ঠেকাতে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার নুর উদ্দিন মিলনকে প্রধান করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে মানি লন্ডারিং শাখা গঠন করা হয়। মানি লন্ডারিং শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানি লন্ডারিং শাখায় যাদের রাখা হয়েছে তাদের সবাইকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এটি দেয়া হয়েছে। এছাড়া শাখার কর্মকর্তাদের বসার আলাদা কোনো জায়গাও দেয়া হয়নি। আবার দেখা গেছে, শাখাটি দেখভালের জন্য যাদের রাখার হয়েছে তাদের বাইরেও অন্য গ্রুপের সহকারী কমিশনার কিংবা ডেপুটি কমিশনারকে মানি লন্ডারিং শাখা দেখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। তাই কাজের মধ্যেও তৈরি হয় সমন্বয়হীনতা।
গত নয় মাসে এই কমিটি মাত্র দুইটি মানি লন্ডারিং ঘটনা চিহ্নিত করেছে। অথচ এই দুইটি ঘটনার ব্যাপারেও এই শাখা থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মানি লন্ডারিং ঘটনার ব্যাপারে কোন আমদানিকারকের বিরুদ্ধে মামলা করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। ওই দুইটি ঘটনায় মামলা দায়েরের অনুমোদন চেয়ে দুই মাস আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কোন অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এতে করে শাখাটির কার্যক্রম শুরুর নয় মাস গত হতে চললেও এখন পর্যন্ত এই শাখার দৃশ্যমান কোন কাজ দেখা যায়নি। অথচ মানি লন্ডারিং এর নানা ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করা হচ্ছে। এই শাখা থেকে আরো চারটি চালান চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধেও কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপ-কমিশনার নুর উদ্দিন মিলন দৈনিক আজাদীকে বলেন, মানি লন্ডারিং মামলা করতে যেহেতু এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়ের অনুমতি প্রয়োজন তাই আমরা দুটি চালানে মামলা চেয়ে চিঠি দিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত আমরা মামলার অনুমতি পাইনি। অনুমতি পেলেই মামলা করা হবে। এই দুটি ছাড়াও পাইপলাইনে এধরণের আরো চারটি চালান রয়েছে, যেগুলোতে আমরা মানি লন্ডারিংয়ের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। ধাপে ধাপে সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শাখার কাজে ধীরগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নুর উদ্দিন মিলন আরো বলেন, মানি লন্ডারিং শাখা গঠিত হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। গত বছর মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও মানি লন্ডারিংয়ের বিধি প্রকাশ না হওয়ায় আমরা এগোতে পারিনি। অবশেষ চলতি বছরের মার্চে বিধি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করেছি।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, মানি লন্ডারিং শাখা যাতে গতি পায়, সেজন্য আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করবো। আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। যারা অসাধু ব্যবসায়ী তাদের আমরা ছাড় দিবো না ।
আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিং এবং টাকা পাচারের ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, কাস্টমসের দুর্নীতির কারণেই মানি লন্ডারিং হচ্ছে। দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তাদের সিগন্যাল ছাড়া কোন আমদানিকারকই মানি লন্ডারিং করার সাহস করবে না। প্রতিটি ঘটনার সাথে কাস্টমসের লোকজন জড়িত। তাই মানি লন্ডারিং এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ আশা করাটা কিছুটা কঠিন। তিনি বলেন, ওভার ইনভেয়েসিং বা মিথ্যা ঘোষণা যেভাবেই টাকা পাচার হোক না কেন তা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি। টাকা পাচার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে খ্যাতিমান এই অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেন।

x