আমজাদ হোসেন এক কিংবদন্তির প্রস্থান

মুহাম্মদ মুসা খান

শুক্রবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
40

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট, বাঙালির ঐতিহ্য-বাঙালির ভবিষ্যৎ, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব বিকাশ ও পরিণতি এবং আন্দোলনের রূপরেখা। তাঁর কিশোর উপন্যাস গুলো হলো- জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা, ভূতের রাণী হিমানী, সাত ভূতের রাজনীতি, শীতের রাজা উহুকুহু, টুক টুক, রঙ্গিন ছড়া, কৃষ্ণ চূড়া। গল্প গ্রন্থ-পরীনামা জোছনায় বৃষ্টি ও
কৃষ্ণলীলা। তাঁর রচনা সমগ্র- মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত কিশোর গল্প, আমজাদ হোসেনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, উপন্যাস সমগ্র-১, নির্বাচিত গল্প, গল্প সমগ্র, কিশোর গল্প সমগ্র, কিশোর সমগ্র, মাধবী সমগ্র। ফিকশন- ডারকেলিংডে।

একজন মানুষের মধ্যে অনেকগুলো গুণ থাকতে পারে। তবে উল্লেখ করার মত গুণ কতটি থাকে! দুই বা তিনটি। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে যাকে আমরা চিনি, সেই সদ্য প্রয়াত আমজাদ হোসেন অনেকগুলো গুণের সমন্বয়ে একজন প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন। তিনি শুধুমাত্র চলচ্চিত্র জগতের মানুষই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, ইতিহাসবিদ, জীবনীগ্রন্থ প্রণেতা, সংলাপ রচয়িতা, কবি, প্রবন্ধকার, কাহিনীকার, নাট্যকার, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তাঁর মত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষ সমসাময়িক সময়ে খুবই বিরল।
আমজাদ হোসেনের জন্ম ১৯৪২ সনের ১৪ আগস্ট জামালপুরে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিখ্যাত ”দেশ” পত্রিকায়। ১৯৫৬ সনে কলেজে ভর্তির পর দেশ পত্রিকায় একটি কবিতা লিখে পাঠান, কবিতা প্রকাশের আগেই দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ আমজাদ হোসেনকে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে লিখা ছিল,-
কল্যণীয়েষু,
পুনশ্চ, এই যে, তুমি কেমন আছ? কী অবস্থায় আছ জানি না। তোমার কবিতা পেয়েছি। তোমার হাতে/কলমে সরস্বতীর আশীর্বাদ আছে। আমার এই পত্র পাওনা মাত্রই তুমি কলিকাতায় চলিয়া আস, তোমার থাকা-খাওয়া-শিক্ষা সমস্ত কিছুর ভার আমার ওপরে।
শুভেচ্ছান্তে, সাগরময় ঘোষ।
তবে তাঁর কলিকাতায় যাওয়া হয়নি।
তিনি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত হন ১৯৬১ সনে ”তোমার-আমার” চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। ভাষা আন্দোলনের উপর তাঁর রচিত নাটক ”ধারাপাত” অবলম্বনে চলচ্চিত্র ”ধারাপাত” নির্মাণ করেন পরিচালক সালাহ্‌উদ্দিন ১৯৬৩ সনে। এই চলচ্চিত্রে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ও করেন। তাঁর একক পরিচালিত প্রথম সিনেমা ”জুলেখা” (১৯৬৭)। তবে পরিচালক নুরুল হক বাচ্চুর সাথে যৌথ পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র ”আগুন নিয়ে খেলা” (১৯৬৭)। তিনি আরেক কিংবদন্তি পরিচালক জহির রায়হানের সহকারী হিসেবেও কাজ করেন। আমজাদ হোসেন ২০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র গুলো হলো- আগুন নিয়ে খেলা, জুলেখা, দুইভাই, বাল্যবন্ধু, পিতাপুত্র, নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, দুই পয়সার আলতা, জন্ম থেকে জ্বলছি, ভাত দে, সখিনার যুদ্ধ, হীরামতি, গোলাপী এখন ঢাকায়, আদরের সন্তান, সুন্দরী বধূ, প্রাণের মানুষ, কাল সকালে, গোলাপী এখন বিলাতে। তাঁর রচিত বিখ্যাত সারাজাগানো জব্বার আলী চরিত্রের নাটক ”জব্বার আলী এখন রিমান্ডে, হ্যালো জব্বার আলী” অমর সৃষ্টি হিসেবে খ্যাত হয়েছে। ঈদের নাটক জব্বার আলীতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে।
আমজাদ হোসেন ১৫টি উপন্যাস রচনা করেছেন। উপন্যাস গুলো হলো-”ধ্রুপদী এখন ট্রেনে”, ”দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা”, ”আমি এবং কয়েকটি পোস্টার”, ”রক্তের ভালবাসা”, ”ফুলবাতাসী”, ”রাম রহিম”, ”আগুনে অলংকার”, ”ঝরাফুল”, ”শেষ রজনী”, ”মাধবীর মাধব”, ”মাধবী ও হিমানী, মাধবী সংবাদ। তাঁর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস হলো- যুদ্ধে যাবো, অবেলায় অসময়, উত্তরকাল যুদ্ধযাত্রার রাত্রি। তিনি ৪টি জীবনী গ্রন্থ রচনা করেন। মাওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর জীবন ও রাজনীতি এবং শ্রী হেমচন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর রচিত ৯টি ইতিহাস গ্রন্থ হলো, বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস (১ম খণ্ড ও ২য় খণ্ড), নঙালবাড়ি কৃষক আন্দোলন, বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট, বাঙালির ঐতিহ্য-বাঙালির ভবিষ্যৎ, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব বিকাশ ও পরিণতি এবং আন্দোলনের রূপরেখা। তাঁর কিশোর উপন্যাস গুলো হলো- জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা, ভূতের রাণী হিমানী, সাত ভূতের রাজনীতি, শীতের রাজা উহুকুহু, টুক টুক, রঙ্গিন ছড়া, কৃষ্ণ চূড়া। গল্প গ্রন্থ-পরীনামা জোছনায় বৃষ্টি ও কৃষ্ণলীলা। তাঁর রচনা সমগ্র- মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত কিশোর গল্প, আমজাদ হোসেনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, উপন্যাস সমগ্র-১, নির্বাচিত গল্প, গল্প সমগ্র, কিশোর গল্প সমগ্র, কিশোর সমগ্র, মাধবী সমগ্র। ফিকশন- ডারকেলিংডে।
আমজাদ হোসেন ছিলেন সফল একজন মানুষ। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সেটাই সোনা হয়েছে। তিনি ১৯৯৩ সনে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯৩ ও ১৯৯৪, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার- ২০০৪, ইউরো শিশু সাহিত্য পুরস্কার- ২০০৮ (ভূতের রাণী-হিমানীর জন্য), ফজলুল হক স্মারক পুরস্কার- ২০০৯ পেয়েছেন। তাঁর রচিত চলচ্চিত্র নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, ভাত দে, জয়যাত্রা-বিভিন্ন বিভাগে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। তাছাড়া, আবার তোরা মানুষ হ, নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, জন্ম থেকে জ্বলছি, ভাত দে, হীরামতি চলচ্চিত্র-বিভিন্ন বিভাগে বাচসাস পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলো। কয়েকটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হয়েছিলেন। তাঁর লেখা কালজয়ী চলচ্চিত্র ”জীবন থেকে নেয়া” (পরিচালক জহির রায়হান) বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, এই চলচ্চিত্রে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ঘটনাবলীর এক দলিল হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে।
বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী আমজাদ হোসেন একজন গীতিকারও ছিলেন। তাঁর লিখা অসংখ্য গান কালজয়ী ও হৃদয়ছোঁয়া-তম্মধ্যে “আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার”, “হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ”, “কেউ কোনদিন আমাকে তো কথা দিল না”, “চুল ধইরো না, খোপা খুলে যাবে গো”, “একবার যদি কেউ ভালবাসতো”, “বাবা বলে গেল আর কোন দিন গান করো না”, “কত কাঁদলাম কত সাধলাম”, “তিলে তিলে মইরা যামু”, “তবুও তোরে ডাকবো না” উল্লেখযোগ্য।
আমজাদ হোসেন ছিলেন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ। তিনি দৈনিক সমকালের এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- “জীবন থেকে নেয়া” ছবিটি নিয়ে পেছনের কথা। শহীদ আসাদের লাশ নিয়ে সারাদেশ ঘুরেছিলেন মাওলানা ভাসানি। মাওলানা ভাসানির সাথে সেই সময়ে আমজাদ হোসেনও ছিলেন। শহীদ আসাদের লাশ দাফন করার পর মাওলানা ভাসানি আমাজাদ হোসেনের মাথায় হাত রেখে বললেন- “আসাদকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাতে হবে”। সেই অনুযায়ী আমজাদ হোসেন অনেক খেটেখুটে একটা স্ক্রিপ্ট দাঁড় করালেন, কাজী জাফরের বাড়ীতে শুটিং হবে ঠিক হলো এবং মাওলানা ভাসানির বক্তৃতা দিয়ে শুটিং উদ্বোধন করবেন। কিন্তু শুটিং শুরুর আগের দিন রাতে আসাদের পরিবার ডকুমেন্টারি বানাতে নিষেধ করলেন, যা শুনে মাওলানা ভাসানি কষ্ট পেয়ে কেঁদে কুটে একাকার হয়ে আসাদের জন্য দুহাত তুলে দোয়া করলেন। আসাদের জন্য তৈরি করা স্ক্রিপ্টটা রেখে দিলেন। এই স্ক্রিপ্ট দিয়ে পরবর্তীতে “জীবন থেকে নেয়া” ছবিটি নির্মিত হয়। জহির রায়হানের চাওয়া অনুযায়ী তিনি এই গল্প তৈরি করেছিলেন।
আমজাদ হোসেন আমাদের চলচ্চিত্র ও সাহিত্য অঙ্গনের একজন বটবৃক্ষ। যাঁর ছোঁয়ায় আমাদের শিল্প সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু জীবদ্দশায় আমজাদ হোসেন কয়েকটি পুরস্কার ছাড়া তেমন কিছু পায়নি। যার ফলে তিনি শেষ দিকে অভিমান নিয়ে চুপ করেছিলেন।
আমজাদ হোসেন সম্পর্কে চিত্রনায়ক ফারুক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একজন আমজাদ হোসেন বাঙ্গালি জাতির অহংকার। একজন আমজাদ হোসেন নিজেই একটি ইন্ডাষ্ট্রি, যাকে নিয়ে নতুন প্রজন্ম গবেষণা করলে হয়তো নিজেদের মেধার বিকাশে তা কাজে লাগাতে সক্ষম হবে। সৃষ্টিশীল মানুষটি চলচ্চিত্রের জন্য কতটা গৌরবের তা সত্যি অকল্পনীয়। অথচ এই মানুষটিকে আমরা পর্যাপ্ত মূল্যায়ন করতে পারিনি। অনেকটা অভিমানে তিনি প্রস্থান করলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, অসুস্থতার কয়েকদিন পর তিনি তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ২৭ নভেম্বর তাঁকে ব্যাংককে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ৭৬ বছর বয়সে ১৪ ডিসেম্বর তিনি সেখানের হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। গত ২২ ডিসেম্বর জামালপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। কিংবদন্তি এই গুণী মানুষটির আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

x