আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা

সাক্ষাৎকার গ্রহণে : হাসান আকবর, শুকলাল দাশ, সবুর শুভ, ঋত্বিক নয়ন ও ইকবাল হোসেন

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২০ পূর্বাহ্ণ
60

আবাসনে গ্যাসের সংকট
নিরসন করতে হবে
ইঞ্জিনিয়ার মো. দিদারুল হক চৌধুরী
কো-চেয়ারম্যান-১, রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার

আবাসন খাতে গ্যাসে সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের কো-চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. দিদারুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত সময়ে বাংলাদেশের আবাসনখাত নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের নানান ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে সুফল ভোগ করছে আবাসন খাত। গত বাজেটে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর যে সিদ্ধান্ত এসেছে তা আবাসন খাতে একটি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে। তবে গ্যাস সংযোগ না থাকায় অনেক গ্রাহক ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠছে না। এখনো বন্দর নগরীতে কয়েক হাজার ফ্ল্যাটে গ্যাসের সংযোগ নেই। ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আবাসিকে গ্যাসের সংযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশ দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা গেলে আবাসন খাত অনেক বেশি লাভবান হবে।
আবাসন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার পাশাপাশি আবাসন মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। সরকার মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কাজ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে যে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, সেজন্য আবাসন সমস্যা সর্বাগ্রে সমাধান করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান হবে না। আবাসন ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে প্রাইভেট-পাবলিক-পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে আবাসন সমস্যার সমাধান করা যাবে।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বর্তমানে আবাসন ব্যবসা ভাল অবস্থানে রয়েছে। দেশের উন্নয়ন দ্রুত গতিতে হচ্ছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোকে অনেক পেছনে ফেলেছে। তবে রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে। এ আবাসন ব্যবসায়ী বলেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। নানা কারণে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে মন্দা ছিল। এখন সেই মন্দাবস্থা কাটিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ সেক্টরটি। বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় এখন বিনিয়োগের সুবর্ণ সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে।
আবাসন খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের দাবি জানিয়ে সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে সরকার ৭০০ কোটি টাকার একটি তহবিল দিয়েছিল। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল দিলে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটবে। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে শিল্প হিসেবে আবাসন খাতের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘ভিশন-২০২১’ ও ‘ভিশন-২০৪১’ বাস্তবায়ন ঘটবে।

আবাসন খাতকে এগিয়ে নিতে তহবিল
গঠনের বিকল্প নেই
ইঞ্জিনিয়ার এস এম আবু সুফিয়ান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপিক প্রপার্টিজ লি., সাবেক সভাপতি রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার

আবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সরকারি পলিসি সাপোর্টের পাশাপাশি একটি বড় তহবিল গঠনের বিকল্প নেই। দেশের মানুষের বড় অংশ হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। রিয়েল এস্টেট সেক্টরে বেশিরভাগই উচ্চ মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মানুষের বিনিয়োগই বেশি। এখানে মধ্য আয়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্বল্প সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে আগ্রহী হবে। এজন্য সরকারিভাবে বড় তহবিল গঠন করতে হবে।
এপিক প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এস এম আবু সুফিয়ান বলেন, আবাসন খাত শুধু কোনো একটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। এ খাতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হবে। ২০০৭-০৮ সালে সুদের হার কমিয়ে সরকার মাঝারি সাইজের ফ্ল্যাট কিনতে যে ঋণের সুযোগ দিয়েছিল, তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পলিসিগত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এই শিল্পটি স্থবির হয়ে আছে। তবে মানুষের নিজের প্রয়োজনেই এই খাত টিকে থাকবে।
আবাসন খাতের সুনাম কুড়ানো প্রতিষ্ঠান এপিক প্রপার্টিজের এ কর্ণধার বলেন, এক সময় চট্টগ্রামে বড় আকারের ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি ছিল। প্রথমদিকে আরাম-আয়েশের জন্য মানুষ ফ্ল্যাট কিনত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ফ্ল্যাট এখন প্রয়োজনীয়তার পর্যায়ে চলে এসেছে। দাম ও চাহিদার সংমিশ্রনে এখন ১২০০ থেকে ১৫০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি। আর গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ডেভেলপাররাও এই ধরনের ফ্ল্যাট বেশি নির্মাণ করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অ্যাপার্টমেন্ট কেনার মধ্যে একটি বড় অংশই রয়েছে প্রবাসী। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক প্রবাসী রয়েছেন যারা নিজের আয়ের টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনছেন। যাদের মধ্যে মোট ক্রেতার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রয়েছে। একসময়ে উচ্চবিত্তরা ফ্ল্যাট কিনত। তবে তা মোট খাতের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। যখন সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠে। বিভিন্ন ব্যাংক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ফ্ল্যাট কেনার হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এভাবে অর্ধেক ক্রেতা রয়েছে। বাকী অর্ধেক রয়েছে সাধারণ ক্রেতা। জীবনের সঞ্চিত অর্থ ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনেন। এখন অতিরিক্ত সুদের কারণে আগ্রহ থাকলেও অনেকে ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না। যার নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে আবাসন খাতে। সুদের হাম কমিয়ে দিলে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এখানে টাকার প্রবাহ বাড়বে।
তিনি বলেন, দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের উপরে। একটি উন্নয়নশীল দেশে এই প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত। তবে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আবাসন খাতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ দেশে যতই মানুষ বাড়ছে, ততই আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। মানুষ মধ্যম আয়ের দেশে গেলেই এ চাহিদা আরো বাড়বে। সরকার ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে চলেছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেই সাধারণ মানুষ আরো বিলাসী হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। আধুনিক ও মানসম্মত ফ্ল্যাটের চাহিদাও দিন দিন বাড়বে।
নিজের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এপিক দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আবাসন খাতে সুনামের সাথে ব্যবসা করে আসছে। এপিকের সফলতার পেছনে গ্রাহকসেবাই অন্যতম। আমাদের সব গ্রাহকই আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। গ্রাহকরা সেটা বুঝতে পারেন। আর গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের কারণেই এপিকের পথচলা আরো মসৃণ হয়েছে।’

নির্মাণ সামগ্রীর উচ্চমূল্য আবাসন
সেক্টরকে সংকটে ফেলেছে
মহিউদ্দিন খসরু
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিক এসেটস লি.

ইউনিক এসেটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন খসরু বলেছেন, নির্মাণ সামগ্রীর উচ্চমূল্য আবাসন সেক্টরকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহায়তার অভাবে আমরা সংকট কাটাতে পারছি না। তিনি ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সিঙ্গেল ডিজিটের ঋণ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি ফ্ল্যাট একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। এটি কোন বিলাস দ্রব্য নয়। নিতান্ত প্রয়োজনীয় একটি পণ্য। ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চায় না। আবার সুদও চড়া। সিঙ্গেল ডিজিটে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করলে বহু মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। গ্যাস সংকট আবাসন ব্যবসার বড় অন্তরায় হয়ে রয়েছে। শত শত ফ্ল্যাট অবিক্রিত রয়ে গেছে গ্যাসের অভাবে। আমরা ডিমান্ড নোটের টাকা পরিশোধ করেও গ্যাস সংযোগ পাইনি। ক্রেতাদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে পারিনি। আবার অনেকের জন্য গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। দেশে এলএনজি আমদানি হয়েছে। গ্যাসের এখন আর অভাব নেই। এই অবস্থায় আমাদেরকে গ্যাস সংযোগ দেয়া হলে ফ্ল্যাট ব্যবসায় কিছুটা গতি আসতো। আবাসন শুধু একটি ব্যবসা নয়, একটি সামাজিক দায়বোধ থেকেও আমরা কাজ করি। তিনি আবাসন ব্যবসায় সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান।

সরকারের প্রণোদনা
পাওয়া গেলে আবাসন
খাত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে
গোপাল কৃষ্ণ লালা
চেয়ারম্যান, এয়ারবেল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড

দেশের শতকরা ৭২ ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করে এবং মোট ঘরের শতকরা ৮১ ভাগ গ্রামে অবস্থিত। গ্রামীণ জনগণ সাধারণত নিজেদের উদ্যোগে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে আসছে। গ্রামাঞ্চলের শতকরা ৮০ ভাগ ঘরের অধিকাংশই কাঠামোগত দিক থেকে নিম্নমানের। এ আবাসন এখন দেশে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে। যার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে ১ কোটি টাকা লোক নির্ভরশীল। নানা সমস্যার কারণে আবাসন ব্যবসায় বর্তমানে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারপরও আবাসন ব্যবসায়ীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এ খাতকে বাচিঁয়ে রেখে মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে। জমির সমস্যা, রেশিও, রেজিষ্ট্রেশন খরচ, ভ্যাট ট্যাঙ্রের যন্ত্রণা, সরকারি প্রণোদনার অভাব ও ব্যাংক লোনের অপ্রতুলতা এ খাতের সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া একটি ফ্ল্যাট একবার রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর পরবর্তীতে বিক্রি করার ক্ষেত্রে আবারও সমান হারে রেজিস্ট্রেশন খরচ দিতে হচ্ছে। এটাও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকার গত বাজেটে ফ্ল্যাট কিনলে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দিয়েছে তাতে আবাসন খাতের খুব একটা লাভ হচ্ছে না। কারণ কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট কিনতে একজন ক্রেতাকে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন খরচ দিতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি ১০ শতাংশ জরিমানাও দিতে হবে। এ কারণে কালো টাকা এখানে খুব একটা বিনিয়োগ হচ্ছে না। আবাসন ব্যবসায়ীরা গত বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রণোদনা পাওয়া যায়নি। এ প্রণোদনা পাওয়া গেলে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। তাছাড়া ডেভেলপ করার জন্য সরকারিভাবে জমি পাওয়া গেলে কম খরচে ফ্ল্যাট বিক্রি করা যেত। এতে দেশের আবাসন সমস্যার অনেকখানি সুরাহা হবে।

শর্ত সাপেক্ষে জায়গার ব্যবস্থা
করলে কম খরচে মানুষ আবাসন
সুবিধা পেতে পারে
ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার হোসেন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিপিডিএল

সিপিডিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার হোসেন বলেছেন, আবাসন মানুষকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রদান করে। একান্তে নিজস্ব ভুবনে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান ছাড়াও কর্ম ও উপার্জনের ভিত্তি রচনা করে। সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত গৃহায়ণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। সবার সাধ্যের মধ্যে পরিকল্পিত আবাসনের ব্যবস্থা করতেও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়, তাই সবার জন্য সাধ্যের আবাসন গুরুত্ব পাচ্ছে।
আবাসন খাত ভাল খারাপ দুটোর মধ্যদিয়েই যাচ্ছে বর্তমানে। জায়গার রেশিও বেশি, ব্যাংক লোনের অপ্রতুলতা, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ নাগালের বাইরে থাকার কারণে আবাসন ব্যবস্থা এখন আগের মতো নেই। এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে এতে।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আবাসন ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম ততটুকু হয়নি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে আবাসন ব্যবস্থা মোটামুটি ভাল অবস্থায় ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেরকম নেই। আবাসন খাত কোন সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার হোসেন বলেন, ডেভেলপ করার জন্য জমির সমস্যা, ফ্ল্যাটে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগে নানা সমস্যা, প্ল্যান পাস করতে বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে ফ্ল্যাট রেডি করতে অহেতুক দেরি হয়।
আর মানসম্মত একটি ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করতে খরচ হয় ১২ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত। এটাও সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরপরেও আবাসন খাত বর্তমানে শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে দেশের ১ কোটির মতো মানুষ। দেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের ভূমিকা অগ্রগণ্য। পরিকল্পিত নগরায়ন কিংবা পরিচ্ছন্ন দেশ গঠন করতে হলে আবাসন খাতকে সরকারিভাবে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পিত দেশ গঠনে আবাসন খাত একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে। দেশে আবাসন সংকট নিরসনে সরকার প্রতিশ্রুতিশীল।
অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দিচ্ছে। আবাসনও সেই ধরনের একটি মৌলিক চাহিদা। তাই এক্ষেত্রে সরকার ডেভেলপ করার জন্য শর্ত সাপেক্ষে জায়গার ব্যবস্থা করলে কম খরচে মানুষ আবাসন সুবিধা পেতে পারেন। বর্তমানে জায়গার সংকটই বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আবাসন সংকট নিরসনে শহরকে
গ্রামে ছড়িয়ে দিতে হবে
ডা. কাজী আইনুল হক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইক্যুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লি.

ইক্যুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. কাজী আইনুল হক বলেছেন, দিন দিন মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এতে আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। যেভাবে চাহিদা বাড়ছে সে হারে মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধান মিলছে না। যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে শহরকে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে আবাসন সংকট নিরসনে সুফল আসবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই সরকারিভাবে নাগরিকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। কারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আবাসন হচ্ছে মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি। প্লট দেওয়ার সংষ্কৃতিকে সরকারের ভুল পলিসি মনে করেন তিনি। এ ব্যাপারে বলেন, এক সময়ে একটি সংষ্কৃতি তৈরি হয়েছিল মানুষকে জমি (প্লট) দেওয়া। সিডিএ, রাজউক, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ জমি দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো একটি ছোট জায়গায় জমি দিয়ে মানুষের আবাসন সংকট জীবনেও শেষ করা যাবে না। এই ভুল পলিসিটাই আমাদের সর্বনাশ করে দিচ্ছে। সিঙ্গাপুর আজকে শতভাগ আবাসন সমস্যা সমাধান করেছে। সিঙ্গাপুর গভর্নমেন্ট অথরিটি থেকেই অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে কম দামে বিভিন্ন মেয়াদে মূল্য পরিশোধের সময় দিয়ে মানুষকে দিচ্ছে। একইভাবে চীন, ভারত, মালয়েশিয়াতে আবাসন সংকটের সমাধান হয়েছে। সরকারিভাবেই বড় অংশের সমস্যা সমাধান হচ্ছে, বাকীটা প্রাইভেট সেক্টর থেকে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাউজিং কমপ্লেঙ হচ্ছে, যেখানে দুই তিন হাজার পর্যন্ত ফ্ল্যাট হচ্ছে। এক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পাকিস্তান আমলেও কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যা এখনো হয়নি। আমাদের দেশে আবাসনের চাহিদার কারণেই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আসতে হয়েছে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে এসেছে এবং গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করছে, তাও পরিকল্পিত হচ্ছে না। সাময়িক চাহিদা মিলছে মাত্র। এতে চাহিদা বাড়ার কারণে গতানুগতিভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে আবাসন খাত।
পৃথিবীতে অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হচ্ছে আবাসন। যখন অর্থনৈতিক মন্দা হয়, তখন আবাসন খাত পিছিয়ে পড়ে। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক মন্দার পেছনেও হাউজিং সেক্টর ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। ওইসময়েও সরকার আবাসন খাতে নজর দিতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। আবাসনে কালো টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে বাজে বলেছেন তিনি। তাঁর মতে, একটি বোগাস কথা চলে আসছে, কালো টাকা সাদা করার। এটার মতো বাজে সিদ্ধান্ত আর কিছুই হতে পারে না। আবার সরকার টাকা দিয়ে আবাসন খাতকে উন্নয়ন করবে তাও কিন্তু নয়, সরকার পলিসি সাপোর্ট দেবে। এখন সিডিএ, রাজউক পাঁচ কাঠা, ১০ কাঠা জায়গা দিচ্ছে। এই জায়গা না দিয়ে এসব জমি ডেভেলপারদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প নির্মিত হতো, সিডিএ এবং রাজউকের তত্ত্বাবধানে এসব ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, তাহলে আবাসন খাত আরো সমৃদ্ধ হতো। একজন ডেভেলপারের একটি ফ্ল্যাটের মধ্যে অর্ধেক খরচ হয় জমিতে। কিন্তু সিডিএ কিংবা রাজউকের সেই খরচ নেই। তারা সরকারি জমিতেই অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করছে। অথচ বেসরকারিখাতে উদ্যোক্তাদের মূল্যেই তারা এসব অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করছে। অথচ একটি প্রাইভেট ডেভেলপার যে ফ্ল্যাট ৫হাজার টাকা বর্গফুটে বিক্রি করছে, সেখানে সিডিএ কিংবা রাজউকের উচিত ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধায় বিক্রি করতো, সেক্ষেত্রে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষরাও ফ্ল্যাটের মালিক হতো। নাগরিকরা এর সুফল ভোগ করতো।
পৃথিবীর সব দেশে বাড়ির মালিক হওয়া সহজ কাজ, ঘর ভাড়ার টাকায় তারা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারে। ওইসব দেশে সহজশর্তে একেবারে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যায়। জামানতের পরিমাণ বাসাভাড়ার চেয়েও কম। সবই সরকারি পলিসির বিষয়। বেসরকারিখাত এগিয়ে এসেছে বলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। তবে সবই হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। সরকার সরকারি কর্মচারীদের আবাসন নিশ্চিত করছে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের পেতে আপত্তি কোথায়? এক্ষেত্রে পলিসি সাপোর্ট দিলেই আবাসন খাত আরো অনেক এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন সাহেব বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকার সময়ে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের জন্য দুই দফায় ১৪শ কোটি টাকার তহবিল দিয়েছিলেন। সিঙ্গেল ডিজিটে মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ দিয়েছিলেন।
সেই প্রথম মধ্য আয়ের লোকজন অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সুযোগ পেয়েছিল। অথচ প্রাইভেট সেক্টরে যে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হয়, মধ্যবিত্তরা সে ফ্ল্যাট কিনেন না। সবই কেনেন উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা। কারণ ১৪-১৫ শতাংশ সুদে মধ্যবিত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারেন না।
যোগাযোগ সহজলভ্য হলেই আবাসন খাত আরো এগিয়ে যাবে। বন্ধুদেশ ভারতের মুম্বাইয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রতিদিন ৭০ লাখ লোক কাজের কারণে মুম্বাইয়ে আসে, দিনশেষে মুম্বাই থেকে চলে যায়। যোগাযোগ উন্নত হলে শহর ছড়িয়ে পড়ে। কোলকাতাতেও তাই হয়েছে। যোগাযোগ উন্নত করে হাটহাজারী, নাজিরহাট ও পটিয়াতে শহরের সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না। এতে আবাসন সংকট অনেকাংশে কমে যাবে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আবাসন সেক্টর উর্ধ্বমুখী ছিল, কিন্তু ২০১২ সালে হঠাৎ পতন শুরু হয়েছে।

সিঙ্গেল ডিজিট সুদ কার্যকর
করা গেলে আবাসন খাত
চাঙা হয়ে উঠবে
আবদুল কৈয়্যুম চৌধুরী
সভাপতি, রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টার

রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি আবদুল কৈয়্যুম চৌধুরী বলেছেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদ কার্যকর করা গেলে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াবে। ২০১৬ সাল থেকে আবাসন খাত আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে আশানুরুপ হয়নি। গতবছরও ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী অনেক প্রতিষ্ঠান ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঋণ দিয়েছিল। ফলে মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়েছিল। এখন আবার বিভিন্ন ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাংক ঋণে সুন্দর হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা গেলে আবাসন খাত আবারো চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তবে ফ্ল্যাট বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছে। মানুষের মধ্যে এখনো আস্থার সংকট রয়েছে। আমরা আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি কমানোর সরকারি ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি ক্ষেত্র-বিশেষে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত দিতে হয়। বিশ্বের কোথাও ৭ থেকে ৮ শতাংশের উপর নিবন্ধন ফি নেই। নিবন্ধন ফি বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হন না অনেকে। এটা ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আনতে পারলে গ্রাহকরা ফ্ল্যাট কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি করতে হবে। এজন্য একটা ফ্ল্যাট যখন দুই বার বিক্রি হবে দ্বিতীয়বার বিক্রির ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি নুন্যতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এখন নতুন ফ্ল্যাট বিক্রিতে যে নিবন্ধন ফি, পুরানো ফ্ল্যাট বিক্রিতেও একই নিবন্ধন ফি দিতে হয়। এটা ৩ থেকে ৪ শতাংশে নিয়ে আসলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে। এছাড়া গ্রাহকদের কম সুদে দীর্ঘ মেয়াদি কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে মানুষ বাসা ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। সরকার সহযোগিতা না করলে রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সরকারি সাহায্য ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশে স্বল্প ও মধ্য আয়ের লোকজনের জন্য আবাসন নিশ্চিত সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে। ভূমির পরিমাণ বাড়ছে না। কিন্তু সিডিএ প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। এসব প্লট বরাদ্দ না দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি ভূমি দেওয়া হয়, তাহলে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে গ্রাহকরা ফ্ল্যাট পাবে। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের লোকজনের ফ্ল্যাটের মালিক হতে সহজতর হবে।

পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা
নগরীর জন্য খুবই প্রয়োজন

আশিক ইমরান
প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট অ্যান্ড সিইও, ফিআলকা

বিশ্বমানের ও পরিকল্পিত নগরী গড়ে তুলতে শহরমুখী জনস্রোত কমানোর বিকল্প নেই এমনটি বলেছেন স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি আজাদীকে জানান, উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেটাই আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে যদি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিকল্পিত আবাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে শহরমুখী জনস্রোত কমবে। আর এজন্য মাস্টারপ্ল্যানে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা আছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল গ্রাম হবে শহর। এ নিয়ে সরকারের কর্মসূচিও আছে। সরকার এখন উপজেলা পর্যায়ে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
নগরীর জন্য আবাসন ব্যবস্থার খুবই প্রয়োজন রয়েছে, তবে সেই আবাসন ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে করা উচিত। এই নগরীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হলে এখন থেকে পরিকল্পিতভাবে শহর সম্প্রসারণ করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে আমাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সিডিএ বেশ কয়েকটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেগুলো এখনো আবাসযোগ্য হয়ে উঠেনি। নগরীতে যতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প হবে সবগুলোর পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে কিনা তা দেখভাল করার দায়িত্ব সিডিএর। কিন্তু আমরা দেখছি সিডিএর জনবল সংকটের কারণে তাদের যে ভূমিকা পালনর করা উচিত সেটা হচ্ছে না। যে প্রকল্পগুলো নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়ন করার মতো সিডিএর সক্ষমতা নেই।
স্থপতি আশিক ইমরান জানান, আধুনিক-বিশ্বমানের নগরীর জন্য মাস্টারপ্ল্যান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরীতে সেটা দীর্ঘদিন থেকে অনুপস্থিত। সেজন্য মহানগরী গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। আমাদের যে মাস্টারপ্ল্যানগুলো ছিল সেগুলোর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি।
এখানে অবকাঠামোগত অনেক সমস্যা আছে। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের যে পরিমাণ সড়ক দরকার তার অর্ধেকও নেই। এ ছাড়াও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম না থাকার ফলে কর্মদিবসে যানজটে অচল হয়ে যায় শহর।
আশার কথা হচ্ছে, চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়নে আরেকটা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেয়া হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ২১ বছর মেয়াদী এই মাস্টারপ্ল্যানে অনেক কিছু একীভূত করা হয়েছে, যেটা যুগোপযোগী। একটি আধুনিক সচল শহর গড়তে যা যা উপাদান প্রয়োজন তার সবই আছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বিশ্বমানের উন্নত শহরে রূপান্তরিত হবে। স্থপতি আশিক ইমরান আরো জানান, চট্টগ্রাম নগরীতে এখন যেটার বেশি অভাব সেটা হচ্ছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। অনেকগুলো নতুন রাস্তা করা দরকার। রিং রোড করা দরকার। অবশ্য এর মধ্যে অনেকগুলো সড়ক নির্মাণাধীন আছে। এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে, আউটার রিংরোডের নির্মাণ-কাজ চলছে। শহরের ভেতরে অনেকগুলো ইন্টারনাল রোডের নির্মাণকাজ চলছে। এগুলো হয়ে গেলে আশা করা যায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কিছুটা ভালো অবস্থায় ফিরবে চট্টগ্রাম। টানেলের কাজ হচ্ছে এবং কর্ণফুলীর ওপারে যে দক্ষিণ চট্টগ্রাম-শহরের আরেকটা অংশ, সেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে কানেকটিভিটিতে টানেল একটা বিশাল ভূমিকা রাখবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলোকে রক্ষা করা এবং এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। পাহাড় এবং চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়গুলো, আমার ডিজাইনে আমি সবসময় রাখার চেষ্টা করি। সেটা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হচ্ছে আবার অনেক ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হচ্ছেনা।

x