আবাসন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা

শনিবার , ১৬ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
63

চট্টগ্রামে চলছে রিহ্যাব আবাসন মেলা। র‌্যাডিসন ব্লু চিটাগং বে বিউতে আয়োজিত এই মেলায় রয়েছে বিভিন্ন আবাসন নির্মাণকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্টল। মেলায় দর্শনার্থীর আগমন এবং ফ্ল্যাট ক্রয়ে তাঁদের আগ্রহ আবাসন নির্মাণ- সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করছে।
দীর্ঘকাল থেকে আমাদের দেশজ ঐতিহ্য লোক ভূয়োদর্শন দ্বারা প্রভাবিত। সরল জীবনযাপন ও উন্নততর চিন্তানুশীলনকে একটি আদর্শ ধারণা হিসেবে লালন করা হয়, যদিও সাধারণ দেহাতি মানুষের জন্য উন্নততর চিন্তানুসরণের চেয়েও সামান্য একটু মাথা গোঁজার আশ্রয় জরুরি ও বড় রকমের মাথা ব্যথা। আমাদের দেশে আশ্রয় ও আবাসের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো প্রতিটি পরিবারের জন্য এক নিদারুণ সমস্যা। আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। আমাদের জনসংখ্যায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি হারের কারণে ভবিষ্যতেও এক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতির ধারা বজায় থাকবে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
নদী ভাঙন, সড়ক নির্মাণ, শহরের বিস্তৃতি, সেকেলে চিন্তাধারায় পুকুর, উঠান, কাছারি, বাগান ইত্যাদি মিলে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গৃহ নির্মাণ, শিল্পায়ন প্রভৃতির কারণে প্রতি বছর আনুমানিক ১.৬ শতাংশ হারে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, ঘনবসতির এ দেশে জমির এ অপব্যবহার ও সংকোচন ভবিষ্যতে জাতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে আবাসন কাঠামোর ঊর্ধ্বমুখী নির্মাণ; যেমন-নগরে, জেলায়, উপজেলা শহরগুলোতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ, পল্লি অঞ্চলে গুচ্ছ শহর, বহুতল গৃহ নির্মাণের জন্য বিশেষ ঋণ তহবিল গঠন ও অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও উৎসাহ প্রদানমূলক ব্যবস্থা।
যতই দিন যাচ্ছে, মানুষের ভিতরে তৈরি হচ্ছে স্থায়ী আবাসনের প্রয়োজনীয়তা। মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে যদিও এটি তৃতীয় স্থানে, তবু তার গুরুত্ব অত্যধিক। দু’মুঠো খেয়ে মানুষ শান্তিতে ঘুমুতে চায়। তার প্রয়োজন একটা স্থায়ী ঠিকানা। শহরে ভাড়া বাসায় জীবন অতিক্রম করার সংখ্যা যত বাড়ছে, তত বাড়ছে ফ্ল্যাট ক্রয়ের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের প্রতিযোগিতাহীন গুরুত্ব। বছর বছর ভাড়া বৃদ্ধি এবং নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে বাড়ির মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়ার ঝগড়া বা তর্ক-বিতর্ক নিত্য দিনের বিষয়। খবর নিলে জানা যাবে, খুব কম সংখ্যক মানুষ আছে, যারা বাড়ির মালিকের সঙ্গে তর্কে বা বিবাদে লিপ্ত হয় নি। নানা ঝামেলা এড়াতে আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও মানুষ ঝুঁকছে ফ্ল্যাট ক্রয়ের দিকে। আবাসন-নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৭ সাল থেকে আবাসন খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। গত বছরও এই খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় নি। নির্বাচনের আগে কয়েক মাস অনিশ্চয়তার কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ায় প্রত্যাশায় ছেদ পড়েছে। তবে এ বছর তাঁদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাঁরা বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে। সরকারি চাকরিজীবীদের পাঁচ শতাংশ সুদে গৃহ ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট কেনার জন্য এ বছর সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা বাজারে যুক্ত হবেন বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন।
ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে নিবন্ধন খরচ। নিবন্ধন বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি খরচ এতো বেশি পড়ে যে ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগ্রহে ভাটা পড়ে যায়। জানা যায়, এখন ফ্ল্যাটের দামে ১৪ শতাংশ কর ও ফি দিতে হয় গ্রাহকদের। অন্যান্য দেশে এই হার ৪ থেকে ৭ শতাংশ মাত্র। রেজিস্ট্রেশন ফি বেশি হওয়ার কারণে ফ্ল্যাটের দাম বেশি পড়ছে। ফলে ফ্ল্যাট ক্রয়ে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করতে পারছে না অনেকে।
মধ্যবিত্ত লোকের আবাসনের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আবাসন নির্মাণকারীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভালো মানের ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তাঁরা প্রলুব্ধ করতে পারছেন গ্রাহকদের। গ্রাহকরাও তাঁদের আয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের স্বপ্নের ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারকেও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। স্বল্প সুদে গৃহ ঋণের ব্যবস্থা করলে মধ্যবিত্ত সমাজের স্বপ্ন পূরণ ঘটতে পারে। নিরবচ্ছিন্ন ধারায় ঋণ প্রদান নিশ্চিত করার জন্য গৃহ নির্মাণ ঋণ দান সংস্থার জন্য প্রয়োজন মাফিক নির্দিষ্ট অঙ্কের তহবিলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গৃহ খাতে ঋণ প্রদান পদ্ধতি আরো সহজ ও সুদের হার কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি আবাসন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জরুরি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা।

x