আবরার হত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
50

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় চলছে সমগ্র দেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন অনেকেই। তাদের সবারই স্ট্যাটাসে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে।
এদিকে আবরার হত্যার প্রতিবাদে সাত দফা দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই বুয়েট ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। বিচার দাবি করে মিছিল বের করেন তাঁরা। ‘আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই’- ব্যানারে মিছিলটি শেষ করে সেখানে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের সুনির্দিষ্ট সাতটি দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করে সবার ছাত্রত্ব আজীবন বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়েরকৃত মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।
আবরার হত্যাকাণ্ডে আমরা মর্মাহত, আমরা ক্ষুব্ধ। ভিন্নমত পোষণ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বলে তাকে মেরে ফেলা হবে? ভিন্নমত প্রদান করার স্বাধীনতা কি এ দেশে নেই? এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেছেন, আবরার ফাহাদকে কারা কোন ‘আবেগ ও হুজুগে’ হত্যা করেছে, তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে। তিনি বলেছেন, আমি যতটুকু বুঝি এখানে ভিন্ন মতের জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলার কোনো অধিকার নেই। এখানে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। তদন্ত চলছে, তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারসোনালি আমার কোনো ভিন্নমত নেই। ওবায়দুল কাদের বলেন, ভিন্নমত পোষণ করে বলে বিএনপি বলছে, ভারত সফরে দেশ বিক্রি করে দিয়েছি। তাই বলে কি বিএনপিকে মেরে ফেলব? যে নেতারা বলছে তাদের কি মেরে ফেলব?
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্যও প্রায় একই। তিনি পত্রিকান্তরে বলেছেন, ফেসবুকে কোনো একটা মত প্রকাশের কারণে বুয়েটের একজন শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হয়ে থাকলে তা খুবই হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে আর কী বাকি থাকল? তাঁর মতে, ছাত্রলীগ এখন যা করছে এটা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি কাজ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যের দুর্নীতি বের হচ্ছে। অন্যদিকে ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িতরা নৃশংসতা করছে। আমরা তো অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। এভাবে তো চলতে পারে না।’
প্রত্যেক রাষ্ট্রে নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকা বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও ধর্মের অনুসারী ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা থাকবে-এটাই নিয়ম, এটাই বিধান। ব্যক্তির কথায়, কাজে বা আচার-ব্যবহারে নমনীয়তা থাকবে। আচরণে, কথাবার্তায় সংযম ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন, উদার মনোভাব, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমঝোতা ও সহযোগিতার দ্বারা উদ্ভূত সংকট নিরসনের মানসিকতা প্রয়োজন। সর্বজনীন মতামত গ্রহণ করায় উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
সহিষ্ণুতা নিঃসন্দেহে মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণের তাৎপর্যপূর্ণ বুনিয়াদ। অপরের কথা, বক্তব্য, মতামত, পরামর্শ ও জীবনাচার যতই বিরক্তিকর ও আপত্তিকর হোক না কেন তা সহ্য করার মতো ধৈর্য যদি মানুষের মধ্যে না থাকে তাহলে সমাজে নৈরাজ্য, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। যে কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। তার জন্য তর্ক হতে পারে, যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব হয়। দেশে যদি ভিন্নমত প্রকাশ করার স্বাধীনতা না থাকে, কাউকে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে যুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন হবে কী করে?
আমরা মনে করি, মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যার বিচার প্রক্রিয়ার ভেতর এই রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসবে। তার সুষ্ঠু বিচারের অপেক্ষায় থাকলাম।

x