আফ্রিকার জঙ্গলে

ডা. অঞ্জনা দত্ত

মঙ্গলবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
71

একেবারে হঠাৎ করেই ঠিক হলো আফ্রিকায় বেড়াতে যাব। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ওটা ছিল পূর্ব আফ্রিকার তিনটি দেশ কেনিয়া, উগান্ডা এবং রুয়ান্ডায় যাওয়ার প্ল্যান। কেনিয়া এবং উগান্ডা সাফারির জন্য বিখ্যাত। আর রুয়ান্ডায় বছর পঁচিশ আগে সংঘটিত জেনোসাইড এর স্মরণে নির্মিত মিউজিয়ামটি দেখার ইচ্ছে ছিল। এই তিনটি দেশের ভিসা ঐ সব দেশে পৌঁছার পর এয়ারপোর্টে নেয়া যায়। ই ভিসাও করা যায়। আর দিল্লীতে কেনিয়ার দূতাবাস থেকেও নেয়া যেত,আমাদের দেশে যেহেতু আফ্রিকার এইসব দেশের দূতাবাস নেই। যখন অন এরাইভাল ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে অনর্থক দিল্লীর ঝামেলা করা কেন ?
নির্দিষ্ট দিনে মুম্বাই ছত্রপতি শিবাজী বিমানবন্দর থেকে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সে উড়াল দিলাম। গন্তব্য নাইরোবী। হোটেল বুকিং দেয়া আছে। পরেরদিন মাসাইমারা অভয়ারণ্যে ট্যুরের বুকিংও দেয়া ছিল। মাসাইমারায় দুই রাত তিন দিনের ট্যুর। থাকতে হবে তাঁবুতে। জীবনে প্রথম তাঁবুতে থাকব। একধরণের উত্তেজনা কাজ করছিল মনের ভিতর। ও হ্যাঁ, আমাদের দেশের সাথে সময়ের পার্থক্য জি এম টি +৩ ঘন্টা।
আমাদের গাড়িতে ছিল দুই স্প্যানিশ এবং এক চৈনিক দম্পতি। মাসাইমারার দিকে আমাদের নিয়ে রওনা দিল মাইক্রোবাসটি। নাইরোবি থেকে মাসাইমারার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিঃমিঃ। ৭/৮ ঘন্টা লাগবে পৌঁছাতে। যাওয়ার পথে ক্ষণিকের বিরতি ছিল গ্রেট রিফট ভ্যালীতে। এই সুন্দর উপত্যকাটি লেবানন থেকে মোজাম্বিক পর্যন্ত ৬০০০ কিঃ মিঃ বিস্তৃত। দারুণ লাগছিল উপত্যকার চমৎকার বনভূমি দেখতে। এর পরে আর একবার থামাল লাঞ্চ করার জন্য। বুফে লাঞ্চ। অনেকগুলো পাত্র দেখে খুব খুশি হয়ে গেলাম। ভাবলাম অনেক রকমের খাবার রয়েছে। তা হরেক রকমের খাবার ছিল বৈকি! কাসাভা (এক ধরণের গাছের শিকড়) সেদ্ধ, ভুট্টার গুড়ো সেদ্ধ, মিষ্টি কুমড়ো সেদ্ধ ( বড় বড় টুকরো), কাঁচকলা সেদ্ধ, নুডলস , ফ্রায়েড রাইস, প্লেইন রাইস (কম সেদ্ধ, মুখে দিলে চাল চাল লাগে), বাঁধাকপি ভাজি , মাছ ভাজি,বীফ, ছাগলের মাংস। খাওয়ার পরে আবার গাড়ি ছুটে চলল মাসাইমারার দিকে।
মাসাইমারা অভয়ারণ্যের কথা আপনারা শুনে থাকতে পারেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল অথবা এনিমেল প্ল্যানেটে মাসাইমারা জঙ্গলের জীব বৈচিত্র্য নিয়ে ধারণকৃত ভিডিও দেখানো হয়ে থাকে। মাসাইমারা নামকরণ হয়েছে ঐ অঞ্চলের আদিবাসী ‘মাসাই’ এবং ‘মারা’ নদীর নামানুসারে। এই মারা নদীতে হরিণ অথবা জেব্রা এবং ওয়াইল্ড বিস্টস জল খেতে যেয়ে কুমিরের শিকারে পরিণত হয়। সেই নদীটির পাড়ে গিয়েছিলাম। সে কথা পরে হবে।
ভেবেছিলাম নাইরোবি থেকে বের হলেই রাস্তার দুধারে জেব্রা, জিরাফ , হরিণ ট্যুরিস্টদের স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে থাকে। নাঃ! তেমন কিছু ঘটেনি। একটু হতাশই হলাম। তবে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর ঠিকঠিক বেবুন, জিরাফ, জেব্রা, হরিণ দেখতে পেলাম। মাথা নষ্ট হওয়ার যোগাড়! ততক্ষণে অভয়ারণ্যের পথে পাকা রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তায় চলতে শুরু করেছে গাড়ি। একসময় পৌঁছে গেলাম আমাদের ক্যাম্পে।

ক্যাম্প ম্যানেজার তাঁবু বন্টন করে দিলেন। তাঁবুতে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে হুড়মুড় করে আবার বের হলাম বনের উদ্দেশ্যে। বনের ভিতরেই তো রয়েছি। তবে এখন যাচ্ছি আরও ভিতরে জঙ্গলের বাসিন্দাদের দেখতে। সূর্য ডুবতে তখনও কিছু সময় বাকি ছিল। এরমধ্যে যতটা দেখা সম্ভব , আর তাছাড়া অনেকসময় সন্ধ্যার দিকে বনের রাজা বের হয়ে আসে নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করতে। কপাল ভাল হলে মোলাকাত হয়েও যেতে পারে। সবাই খুব উত্তেজিত। বনের রাজার দেখা না মিললেও অন্য জীবজন্তুর দেখা তো পাওয়া যাবে! এটাই ত অনেক। কতদিনের স্বপ্ন!!
সেদিন অবশ্য সিংহ অথবা চিতাবাঘ দেখতে পাইনি। তবে ওয়াইল্ড বিস্টস , জিরাফ , জেব্রা , অল্প কিছু হরিণ খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। দূর থেকে হাতিও দেখেছিলাম। পরেরদিন সারাদিনের সাফারি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে বিগফাইভের( সিংহ , চিতাবাঘ , গন্ডার , হাতি,বাফেলো) দেখা পেতেও পারি। ব্রেকফাস্ট শেষে রওনা দিলাম অভয়ারণ্যের দিকে। প্রথম ঢুকতেই ওয়াইল্ড বিস্টসদের দেখলাম ঘাস খাচ্ছে। মাঝে মাঝে দুই একটা জেব্রাও দেখা যাচ্ছিল। কিছু হরিণও ছিল কাছাকাছি। ছিল অস্ট্রিচ পাখি। এমন সময় ট্যুর গাইড জানাল সিংহ দেখার সম্ভাবনা আছে। অনেকদিন ধরে এইসব কাজ করতে করতে ওদের একটা অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে সিংহ বা চিতাবাঘ বনের কোনদিকে থাকতে পারে!
গাড়ি ঘুরিয়ে চলল গাইডের দেখানো পথে। যেতে যেতে নাকে মৃত পশুর গন্ধ লাগল। একজায়গায় চোখে পড়ল অনেকগুলো শকুন কিছু একটা ঘিরে বসে আছে। তার মানে কাছে অবশ্যই সিংহ অথবা চিতাবাঘ আছে। সিংহ সাধারণত শিকার করে নিজের খাবারটুকু খেয়ে বাকিটা ফেলে রাখে যেটি হায়েনা এবং শকুনরা খেয়ে থাকে। এই শকুনরা এখন সেরকম কোন দেহাবশেষ খাচ্ছে।
হঠাৎ দেখতে পেলাম একটা ছোট টিলার সামনে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন ট্যুর কোম্পানির। গাইড জানাল ওখানে সিংহ আছে। কি বলে! ঠিক ঠিক দেখি বনের দুই রানি টিলার ওপরে আয়েশি ভঙ্গিতে বিশ্রাম নিচ্ছে। সবাই ফটাফট ছবি তুলছে। হাঁ করে গিলছে সিংহীদের। সেদিন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় সিংহ এবং সিংহীদের দেখেছিলাম। কখনো বিশ্রাম নিচ্ছে, কখনো বা অন্যসব জীবজন্তুদের ডিস্টার্ব না করে ওদের পাশ দিয়ে দিব্যি হেঁটে চলে গেল। এছাড়া চিতাবাঘও দেখেছিলাম। তাও শিকার করে খেয়েদেয়ে অলস সময় কাটানোর ভঙ্গিতে!

এরপর আমাদের নিয়ে গেল মারা নদীর পাড়ে। আহা! একটি কুমির কী সুন্দর সাঁতরে সমগোত্রীয় কারও বাড়ি যাচ্ছে। কতগুলো জলহস্তি নদীতে বেশ কিছুক্ষণ ডুবে থেকে এখন ডাঙ্গায় উঠে রোদে গা শুকিয়ে নিচ্ছে। পরেরদিন ভোরবেলায়, তখনও আঁধার কাটেনি পুরোপুরি, আবার গেলাম অরণ্যের ভিতর। সেদিন দেখেছিলাম দুর্দান্ত এক দৃশ্য! সিংহী মুখে শিকার করা ওয়াইল্ড বিস্টস ধরে রেখেছে। সিংহকে গাছের ওপর বিশ্রামরত অবস্থায় দেখেছি। দেখেছি মৃত পশু গাছে ঝুলে আছে। সাধারণত চিতাবাঘ শিকার করে টানতে টানতে নিরিবিলিতে তারিয়ে তারিয়ে খাওয়ার জন্য এমনটি করে থাকে। কত বিচিত্র রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে আফ্রিকার জঙ্গলে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। যতদিন বেঁচে থাকব স্মৃতির কুঠুরিতে আফ্রিকায় বেড়ানোর দিনগুলো জ্বলজ্বল করবে। কী করে নেবেন নাকি প্ল্যান একখানা আফ্রিকায় বেড়াতে যাবার?

x