আন্দোলনে ব্যর্থরা নির্বাচনেও ব্যর্থ হয় : প্রধানমন্ত্রী

২০০৮ সালে আরও বেশি ভোট পড়েছিল

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
493

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আন্দোলনে যারা ব্যর্থ হয় তারা নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারে না, এটাই হল বাস্তবতা’। তিনি নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের কারণ তাদেরকেই ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে সমালোচনার জবাবে এবারের চেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আরও বেশি ভোট পড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। গতকাল বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ফার্মগেটস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি সভাপতির বক্তব্য রাখছিলেন। বক্তব্যে নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের জন্য ‘মনোনয়ন বাণিজ্যসহ’ নানা কারণ উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। ২০১৩, ১৪ এবং ১৫ সালে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা তাদের অবরোধ ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত কিন্তু আর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়নি। কারণ জনগণ আর তাদের কোন ধর্তব্যের মধ্যেই নেয়নি। জনরোষের কারণে তাদের সকল আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।’
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বিএনপি’র নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণ তাদেরকেই অনুসন্ধান করে দেখার আহ্বান জানিয়ে এ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘তারা (বিএনপি) অগ্নিসন্ত্রাস করেছে। ৩ হাজার ৯শ’র ওপর গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সাড়ে ৩ হাজারের ওপর মানুষকে তারা পুড়িয়েছে। ৫শ’র কাছাকাছি মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছে। ছোট্ট শিশু থেকে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী কেউ বাদ যায়নি। তাদের রোষ থেকে শুধু মানুষ নয়; গাছপালাও রেহাই পায়নি। গাছ কেটেছে, রাস্তা কেটেছে, রেল লাইনের ফিস প্লেট খুলে ফেলেছে। এই অপকর্মের পর তারা কিভাবে আশা করতে পারে জনগণ আবার তাদের ভোট দেবে।’ এ সময় বেগম জিয়ার এতিমের অর্থ আত্মসাৎ মামলায় কারাগারে আটক থাকার পাশাপাশি একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি তারেক রহমানকে দলের চেয়ারপার্সন করায় নেতৃত্বের শূন্যতা, বিএনপি’র নির্বাচনে পরাজয়ের একটি প্রধানতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘তাদের দলে কি এমন কোনো ভাল মানুষ নেই যাকে তারা চেয়ারপার্সন বানাতে পারে, তারা বানালো একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে।’
দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, উপযুক্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে কেবল অর্থের বিনিময়ে অনেক অখ্যাত, স্বল্প পরিচিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক একটা সিটে ৪/৫ জন করে মনোনয়ন, যে বেশি টাকা দিচ্ছে তাকেই দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আগে যে টাকা দিয়েছে দেখা গেল তার থেকে বেশি দিয়ে আরেকজন মনোনয়ন নিয়ে গেছে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যখন সিট অকশনে (নিলাম) দেওয়া হয় তখন তারা নির্বাচনে জেতে কিভাবে?’ কেবল যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপি যে সব আসন হারিয়েছে তার গুটিকয়েক উদাহরণ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ধামরাইয়ে আতাউর রহমান খানের ছেলে জিয়াউর রহমান, আমরা ধরেই নিয়েছিলাম তিনি মনোনয়ন পেলেতো জিতবেনই। কিন্তু তাকে না দিয়ে যে বেশি টাকা দিল তাকে মনোনয়ন দেওয়া হল। নারায়ণগঞ্জে তৈমুর আলম খন্দোকারকে মনোনয়ন দেওয়া হলো না, চট্টগ্রামে মোর্শেদ খানকে না দিয়ে যে ভালো টাকা দিল তাকেই মনোনয়ন দিল।’
এসব মনোনয়ন বঞ্চিতদের অনেকে তাঁর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করে এসব কথা জানিয়ে গেছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে তারা আমাকে জানিয়েছেন, ‘ভাইয়াকে আবার পাউন্ডে সেখানে পেমেন্ট করতে হবে।’ এছাড়া স্বাধীনতা বিরোধী জামাত শিবিরকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপি’র ভরাডুবির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে উচ্চ আদালত থেকে একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে (জামাতে ইসলামী) সেই জামাতের ২৫ জনই মনোনয়ন পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীকে কখনোই ভোট দেবে না। ভোট তাঁরা দিতে চায়ও না। ভোটও দেয়নি।’ ‘যাদের কোনো রাজনীতিই নেই। কেবল দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মানি লন্ডারিং, এতিমের অর্থ আত্মস্যাৎ করা, অগ্নি সন্ত্রাস এবং মানুষ হত্যা যাদের নীতি তারা জেতার আশা কিভাবে করে?’ প্রশ্ন তোলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ এর নির্বাচনে জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছিল। ব্যাপক হারে ভোট পড়ে। আপনারা যদি ২০১৮ এর নির্বাচন আর ২০০৮ এর নির্বাচন তুলনা করেন, ২০০৮ এ কিন্তু ভোট পড়েছিল আরো অনেক বেশি। প্রায় ৮৬ ভাগ ভোট পড়েছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রায় ৯০ ভাগের উপরে ভোট পড়েছিল।’
সমালোচকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকেই লিখছে, অনেকেই অনেক কথা বলছে। কিন্তু তারা যদি এই তুলনাটা দেখেন, তাহলে দেখবেন যে ২০০৮ এর নির্বাচনে ভোট পড়েছিল অনেক বেশি। তখনও জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। নৌকা মার্কায় ভোট পেয়ে আমরা দেশ সেবার কাজে নিয়োজিত হই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র ১০ বছরের মধ্যে যদি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে পারি তাহলে অতীতে যারা ২৮ বছর ক্ষমতায় ছিল তারা কেন পারে নাই? এটা হচ্ছে সব থেকে বড় প্রশ্ন। তার কারণ একটাই, তারা (বাংলাদেশের) স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেনি। আর যে কারণে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে তারা হত্যা করে এই বাংলাদেশের সম্পূর্ণ অর্জন তারা মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তাদের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ এগোতে পারেনি।’
তিনি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের ওপর যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে সেই বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো ইনশাল্লাহ। সেই বিশ্বাস আমাদের আছে।’
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে উল্লেখ শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁরা জানতে পারেন নি বঙ্গবন্ধু কি বেঁচে আছেন, না নেই। অথচ পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে না গিয়ে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে যে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, সে অনুযায়ীই আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজ নামচা বই দুটি পড়ার জন্য দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি এ সময় ‘সিক্রেটস ডকুমেন্টস অব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত এবং প্রকাশিতব্য মোট ১৪ খণ্ড ভলিউমের বই থেকে আরো তথ্য জানতে পারবেন বলেও উল্লেখ করেন।

- Advertistment -