আনন্দ পুকুর

নাসের রহমান

সোমবার , ২৬ মার্চ, ২০১৮ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
59

পুকুরটির নাম আনন্দপুকুর। পুকুরের নাম আনন্দপুকুর হয় কি করে? এখানকার সব স্থানগুলোর সুন্দর সুন্দর নাম আছে। কিন্তু এ আনন্দ পুকুর নামটা শুনার পর থেকে খুব আগ্রহ হয নামটা কি করে হলো। একেকজন একেক রকম বলে। কেউ বলে নাম একটা দিতে হয়। তাই আনন্দ শব্দটা যুক্ত করেছে। কেউ বলে এ পুকুরে নেমে গোসল করলে নাকি মনটা আনন্দে ভরে যায়। এমনিতে পুকুরে নেমে গোসল করা আবার সাঁতার কাটায় আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়। কেউ বলে আনন্দ নামের একজন পুকুরটির খননের কাজ করেছে। সে থেকে পুকুরের নাম তার নামে প্রচার হয়েছে। আসলে এসবের একটিও নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না বা প্রশ্নও তোলে না। তবে সবাই যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে তা আবার অনেকের পছন্দের যা সবার মুখে মুখে ফিরে। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর প্রথম দিকে এ পুকুরপাড়ে ছেলেমেয়েরা বসে বসে গল্প করতো। পুকুরের চার পাশে সবুজ ঘাসে ভরা ছিল, কিন্তু অনেক গাছপালা ছিল। সবসময় জায়গাটি ছায়াশীতল থাকতো। পুকুরের পানি ছিল একেবারে স্বচ্ছ। পাড়ের গাছের ছায়া গিয়ে পড়তো পানির ভিতর। উপর থেকে সহজে দেখা যেতো। এখানে বসে যারা গল্পগুজুব করতো তাদের মধ্যে অনেকে প্রেমে জড়িয়ে পড়তো। জুটি বেঁধে পাশাপাশি বসে গল্প করতে করতে বিকেলটা কাটিয়ে দিতো। পুরো ক্যাম্পাসের ভিতর এ পুকুরপাড়ে এলে যেন অন্যরকম এক অবস্থার মধ্যে জড়িয়ে যেত অনেকে। মনটা এমনিতে কোমল হয়ে যেতো। তাই এ পুকুরপাড়ে এসে বসলে অনেক কথার মাঝে আবেগ অনুভূতির কথা হতো। ভাল লাগার মতো কোন কোন কথায় একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতো। সে সময়ে চট করে কোন কিছু হয়ে যেতো না। এক দেখায় ভাল লাগলেও অনেক সময় নিতো একে অপরের সাথে মনের কথায় এগিয়ে যেতো। ধীরে ধীরে দিনের পর দিনে এ পুকুর পাড়ে এরা একের মনের সাথে আরেকজনের মনের যেন মিল খুঁজে পেতো। সে মিল এদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতো। ভাল লাগার ব্যাপারটি দিনে দিনে বড় হয়ে উঠতো। একসময়ে তা ভালবাসায় রুপ নিতো। এরকম অনেক জুটি তৈরি হয়ে যায়। এ পুকুরপাড়ে এসে তাদের সাথীকে খুঁজে নিয়েছে। এতে পুকুরটি সবার কাছে আপন হয়ে উঠে একান্ত নিজের মনে হয়। এরাই এ প্রিয় পুকুরটির নাম খুঁজে নেয়। যেখানে এলে তাদের আবেগ অনুভূতি জেগে ওঠে। প্রেম ভালবাসায় সাড়া জাগায়। একজন আরেকজনের ভালবাসার মতো বড় একটা বন্ধনে জড়িয়ে যায়। তাই তারা পুকুরটির নাম দেয় আনন্দ পুকুর। এ নামটি সবাই গ্রহন করে। ধীরে ধীরে অপূর্ব সুন্দর এ পুকুরটির নাম হয়ে যায় আনন্দপুকুর। যদিওবা এখন পুকুরের পাড়ে আগের মতো সবুজ ঘাসের চাদর বিছিয়ে নেই। পুকুরের জলও টলটলে স্বচ্ছ নয়।অখন্ড আকাশটা আগের মতো পুকুর জলে নেমে আসে না। তবু আনন্দ পুকুর পাড়ে ছেলে মেয়েরা এখনো আসে। ভালবাসা শুরু করতে, প্রেমের শপথ নিতে। এদের ধারনা এখান থেকে শুরু করলে অনেকদিন টিকে থাকবে। এমনকি শেষ পর্যন্ত। এরকম একটি আবেগ এখনো অনেকের মধ্যে কাজ করে। তারা এ আনন্দ পুকুর পাড়ে ছুটে আসে। আগের নিরিবিলি সে পরিবেশ নেই। রাস্তার পাশে কিছু খাবার দোকান গড়ে উঠেছে। খুব কম টাকায় এখানে খাবার পাওয়া যায়। কিছু কিছু গাছগাছালি আছে তবে আগের মতো জায়গাটি আর ছায়া শীতল নেই। তবুও এরা আসে। প্রেম ভালবাসা যাই হোক না কেন এদের কাছে আনন্দ পুকুর নামটা যেন অনেক দুর এগিয়ে যেতে পথ দেখায়।

মেয়েগুলো এমন করে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ছেলেদের সামনাসামনি। তবে ছেলেরা কেউ দাঁড়িয়ে নয়, ভ্যানের উপর গাদাগাদি করে বসে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েদের অনেকে ছেলেদের দিকে তাকালেও কেউ কেউ তাকাতে পারছে না। কেমন যেন লজ্জায় চোখ দু’টি বার বার নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। মুখেও এর আভা জড়িয়ে আছে। পাশের মেয়েটি খোঁচা দিলে একপলক ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আবার কেমন যেন লজ্জার ভেতর মুখটাকে রাঙিয়ে তুলছে। মেয়েরা গাছতলায় দাঁড়ালেও বিকেলের রোদটুকু তাদের চোখেমুখে খেলা করছে। ছেলেরা মেয়েদের দিকে মুখ করে বসায় তাদের পিঠে এসে রোদটুকু থেমে গিয়েছে। ফাল্গুন শুরু হলেও শীত একেবারে কেটে যায়নি। বসন্তের এ মৃদু বাতাস ছেড়ে যাওয়া শীতের ছোঁয়া আর পড়ন্ত বিকেলের রোদও তাদের মনটাকে কোথায় যেন টেনে নিয়ে যায়। মেয়েরা মেয়েদের সাথে আর ছেলেরা ছেলেদের সাথে কি যেন বলাবলি করে। মেয়েদের কথা ছেলেদের কাছে আর ছেলেদের কথা মেয়েদেরকাছে পৌঁছতে পারে না। তারপরও তারা কি কথা বলছে তা অনুমান করতে পারে। কখনো হেসে ওঠে আবার কখনো অভিমান করে খানিক চুপ করে থাকে। কথা শুরু হলে সহজে থামে না। এমন ভাব দেখায় কারো কথা কেউ কানে নিচ্ছে না। আসলে কান পেতে থাকে কি বলছে শোনার জন্য, সত্যিই যেন শুনতে পায়। তা না হলে বিকেল সময়টা এরা কাটিয়ে দেয় কি করে?

জায়গাটি আসলে অনেক সুন্দর। একবারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। আশেপাশে অনেক গাছগাছালি। উঁচু নিচু টিলার দু’ধারেনানা ধরনের লতা গুল্ম, কোথাও আবার ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। সহজে দৃষ্টি ফিরে আসতে চায় না। এসব টিলার কোল ঘেঁষে বিস্তৃর্ন ঝিল একেবেঁকে যেন পুরো ক্যাম্পাস এলাকাকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে। ঝাকে ঝাকে অতিথি পাখিরা ঝিলের জলে ভেসে বেড়ায়। জলের নানা রকম শেওলা আর ফানার ভেতর এসব পাখিরা সহজে স্থির হয়ে বসে থাকে। এত হাজারো পাখি যে এসবের মাঝে ভেসে বেড়ায় তা দুর থেকে মনে হয় না। কাছাকাছি গেলে বুঝা যায় পাখিরা কেমন করে লুকিয়ে আছে এসবের ভিতর। কারো উপস্থিত টের পেলে তারা উড়ে যেতে শুরু করে। ডাক দিয়ে দু’একটা উড়াল দেওয়ার সাথে সব পাখিরা একসাথে জল থেকে উড়ে যেতে শুরু করে।সে এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। এত পাখি যে এখানে লুকিয়ে আছে তা ভাবা যায়নি। এরা উড়ে উড়ে পাশের কোন ঝিলে জায়গা খুঁজে। সেখানে হয়তো পাখিরা ভর্তি। কিছুক্ষণ পরে আবার দল বেঁধে ফিরে আসে। এমন নি:শব্দে বসে পড়ে যেন শ্যাওলা আর পানার সাথে মিশে আছে।

ছেলেমেয়েদের দৃষ্টি এসবের দিকে যায়না যে তা নয়। তবে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা গাছের আড়ালে বসে এসব দৃশ্যে বিভোর হয়। তারা আবার খুব চুপচাপ থাকে। কাছে গেলেও তাদের উপস্থিতি সহজে টের পাওয়া যায় না। এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভেতর বসে মোবাইলের স্ক্রীনে একে অপরকে কি যেন দেখায়। কথা বললেও যেন একবারে নি:শব্দে শুধু পাশের জন শুনতে পায়। অবশ্য তারা পাশাপাশি বসে থাকার মাঝে এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পায়। শুধু আনন্দ নয়। তাদের মধ্যে এক ধরনের ভাব, আবেগ তৈরি হয়। কোন কথা না বলেও তাদের মনের কথা একজন আরেকজন সহজে বুঝতে পারে। তাদের আবেগ অনুভূতি তাদেরকে এত কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। একই সাথে দু’জনের বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে তাদের ভালবাসা এগিয়ে যায়। কিন্তু এ ছেলেমেয়েগুলো দলে দলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করে? এরাতো আর অতিথি পাখি না, শীতের সময় দল বেধে দুরদেশ থেকে উড়ে উড়ে এসে বিলের ঝিলে ঘুরে বেড়াবে। আবার শীত শেষ হলে উড়ে উড়ে চলে যাবে। এরাতো এখানে থাকে, এ পাঁচ বছর থাকতে হবে। হলের আবাসিক ছাত্রছাত্রী তারা। কারো এক বৎসর আবার কারো দু’বৎসর শেষ হয়েছে। তৃতীয় বর্ষের কেউ কেঊ আছে। এরা দলে দলে এভাবে ঘুরাঘুরি করে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কিসের অপেক্ষা তাদের। শুধু কি সময় কাটানোর? হলের ভিতর এ সময় বসে থাকলে ভাল লাগে না। সেজন্য বের হয়ে আসা। বিশেষ করে যখন ক্লাস থাকে না তখন এত সময় কাটানো কিছুটা বিরক্তিকর হয়ে পড়ে। যারা খুব ভাল রেজাল্ট করবে তারা লেখাপড়া নিয়ে লেগে থাকে। কিন্তু সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এ সময়টাতে বের হয় সময় কাটানোর জন্য। এতে যদি কারো সাথে মনের মিল খুঁজে পায় তাতে খারাপ কি, সময়টাতো ভাল কাটবে। এ দাঁড়িয়ে থাকার ভিতর থেকে দিনে দিনে একজন আরেকজনের সাথে চোখে চোখে ভাব বিনিময় করতে পারে। একজন আরেকজনকে সহায়তা করে, পরিচয় করিয়ে দেয়। এতে কেউ কেউ জুটিও বেঁধে ফেলতে পারে। ছেলেদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি আগে আসে। মেয়েদের কেউ সেটি নিয়ে এগিয়ে যায়। এখন মেয়েটির পছন্দ হলে মেলাতে চেষ্টা করে। কিন্তু এটা সহজে হয় না। মেয়েটি হ্যাঁ বা না কিছু বলতে চায় না। তবে তার যে ইচ্ছা আছে এটা বুঝা যায়। কিছুদিন সময় নেয় হয়তো। এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে চিন্তা ভাবনা করে নিতে হয়। তবে হ্যাঁ বললে যে হয়ে যায় তাও না। দু’জন প্রথম প্রথম কয়দিন মোবাইলে কথাবার্তা বলে । এতে একজন আরেকজনকে চিনতে চেষ্টা করে। প্রতিদিন কিন্তু বিকেলে এসে দলবেঁধে দাঁড়ায়। এখানে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে কি যেন ইশারায় বলে। মেয়েটি সহজে বলতে চায় না। ছেলেটি বার বার মেয়েটির দৃষ্টি ফেরাতে চেষ্টা করে। এতেও তাদের ভিতর একধরনের ভাব তৈরি হয়। এরা যেন মনে মনে প্রস্তুতি নেয়, বিশেষ করে মেয়েটি এগিয়ে যাবে কি না। মেয়েরা ছেলেটির নানা গুনাগুন তুলে ধরতে চায়। কিন্তু মেয়েটি কোন জওয়াব দেয় না। চুপ করে শুনে যায়। এ শুনার মধ্যেও এক ধরণের ভাল লাগা তৈরি হয়। মেয়েটি তা বুঝতে পারে। কিন্তু সহজে ধরা দিতে চায় না। যাচাই করে দেখতে চায়। নাকি আবেগের বশে কিছুদিন ঘুরাঘুরি করে আবার কেটে পড়বে। এরকম অনেকে এমন দেখায় যেন তার একদিনও চলে না মেয়েটিকে ছাড়া। কিন্তু বছর যেতে না যেতে অন্য কারো সাথে আবার ঘুরে বেড়ায়। এতে মেয়েটি বেশ বেকাদায় পড়ে যায়। সহপাঠি, বন্ধুবান্ধব সবার কাছে কেমন যেন তার মূল্যটা হঠাৎ করে কমে যায়। তখন ধৈর্য্য ধরে সামনের দিকে এগিয়ে চলা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। কোন পথ খুঁজে পায় না । ইচ্ছা করে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে চায়। কিন্তু সে পথ আর খোলা থাকে না।

মেয়েরাও যে এরকম করে না তা নয়। সংখ্যায় একেবারে হাতে গোনা। তবে ছুটির সময় বাড়ি গেলে দেখা যায় করো কারো বিয়ে হয়ে গেছে। তখন ছেলেটি কিছুদিনের জন্য একবাওে চুপচাপ হয়ে যায়। অবশ্য পরে আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠে। আবার পড়ালেখায় মনোনিবেশ করে। মেয়েটি ছেলেটির সাথে বন্ধুত্বের সর্ম্পটা অটুট রাখতে চায়। এখানে ছেলেমেয়েদের অনেকের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। হয়ত চার জন ছেলে চার পাঁচ মেয়ে এরা একসাথে চলাফেরা করে ঘুরে বেড়ায়। গল্পগুজবে মেতে উঠে। আনন্দ ফূর্তিও করে। এরকম অনেক ছেলেমেয়েদের দেখা যায় দলে দলে ঘুরাঘুরি করতে। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে আলাদা কোথাও দাঁড়িয়ে কথা বলা বা কোন গাছ তলে নিরিবিলি বসে থাকবে এসব অনেকে পছন্দ করে না। খুব সেকেলে মনে করে। অনেক আগে ছেলেমেয়েরা এরকম জুটি বেঁধে প্রেম করতো। একের মনের কথা অন্যকে বলে মনটাকে হালকা করতো। দু’জন পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে কিসব গল্প করতো। কথায় কথায় হেসে উঠতো। গাছের ছায়ায় অনেকক্ষণ বসে থেকে পুলকিত হতো। মেয়েটিকে কত রকম স্বপ্ন দেখাতো ছেলেটি। স্বপ্নগুলো রঙিন ফানুসে প্রজাপতির পাখার মতো উড়ে বেড়াতো। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা নিজেরাই স্বপ্নের রঙিন ফানুসে উড়ে বেড়ায়, জুটি বাধে। স্বপ্নগুলো তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায়। তারপরও এখানকার অনেকে স্বপ্ন দেখে। সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। যে যার মতো করে চলে। কারো যেন সময় নেই কারো দিকে তাকানোর। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

এখানকার সব ছাত্রছাত্রীরা আবাসিক। অনেকগুলো হল এখানে। কিছু দুর পর পর এক একটি হল দাঁড়িয়ে আছে। লাল ইটের গাঁথুনিতে ভারী চমৎকার দেখায় সুউচ্চ ইমারতগুলো। এসব ইমারতের প্রতিটি তলায় ছাত্রছাত্রীদের আবাস। তবে ছাত্রী হলগুলো একপাশে অনেকটা কাছাকাছি। একটি হল বেশ বড়সড়। অনেক ছাত্র থাকতে পারে এ হলটিতে। প্রজাপতির পাখার মত দুটি হল যেন এক সাথে। বেশ সাজানো গুছানো সামনের বৃত্তাকার ফাঁকা জায়গাটুকু। বাহারী গাছের সারি চোখে পড়ে। উপরে উঠলে বুঝা যায় প্রজাপতি যেন তার দুটি পাখা মেলে বসে আছে। হলটির নাম প্রজাপতি হল হলে কেমন হতো। অবশ্য একজন বিখ্যাত লেখক মীর মোশাররফ হোসেনের নামে হলটি। এখানকার প্রতিটি হলই বিখ্যাত সব ব্যক্তিবর্গের নামে। অনেক ছাত্রছাত্রীরা জানে না হলের নামের ব্যক্তিরা কেন এত বিখ্যাত। কি অবদানের জন্য তাদের নামে হলের নামকরন করা হলো। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীদের নামেও হল আছে। ছাত্রছাত্রীদের এসবের জানার কি প্রয়োজন। তারা হলে থাকতে পারলে হলো। নামে কিবা এসে যায়। পড়ালেখার জন্য এসেছে পড়ালেখা শেষে আবার ফিরে যাবে। এখানে কেউ থেকে যেতে আসেনি। তারপরও এসময়টা যে তাদের সোনালী সময় বিশেষ করে হলে থাকাকালীন সময়টা তা তারা পরে বুঝতে পারে। তবে হল থেকে চলে যাওয়ার সময় অনেকের মনটা ভীষন খারাপ হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে ব্যস্ত সময় কাটলেও হলের কারও সাথে দেখা হলে মনে হয় আবার যেন হলে ফিরে আসি। কিন্তু সময়টাতে আর কেউ ফিরে যেতে পারে না।

ছেলেটি মেয়েটির বান্ধবীর কাছ থেকে মোবাইল নম্বর নিয়েছে। সে রাতে মেয়েেিটকে ফোন করে। মেয়েটি রিসিভ করবে কিনা ভেবে দেখে। প্রথমে সে রিসিভ করে না। ছেলেটি একটু পরে আবারও করে। এবার সে রিসিভ করে। হ্যালো বলে চুপচাপ থাকে। হ্যালো শব্দটি শুনে ছেলেটি কি যেন পেয়ে গেছে। এমনভাবে কথা বলতে শুরু করে যেন অনেকদিন থেকে মেয়েটির সাথে পরিচয়। একটির পরে একটি কথা বলে যাচ্ছে। কোন মতে থামছেনা। মেয়েটি শুনছে কিনা সেদিকে তার খেয়াল নেই। মেয়েটি প্রথম দিকে একটু অবাক হয়। অনবরত যেভাবে কথা বলে যাচ্ছে এত করে থামানো যায় কি করে। আবার কথাগুলো ভালও লাগছে। শুনতে ইচ্ছা করছে। কথার মাঝে ছেলেটিকে হলের ছাদে চলে যেতে বলে।সেও নাকি ছাদের উপর থেকে কথা বলছে। মেয়েটি ছেলেটির কথা শুনে মোবাইল কানে ধরে অনেকটা নিজের অজান্তে ছাদে উঠে যায়। এখানে খুব নিরিবিলি কথা বলা যায়। কিছু কিছু মেয়ে থাকলেও যে যার মত ঘুরাঘুরি করে। ছেলেটি জানতে চায় চাঁদ তার কেমন লাগে, আর চাঁদের জ্যোৎস্না। মেয়েটি খুব একটা কথা বলছেনা। শুধু হ্যা, হু করে শুনে যাচ্ছে। ছেলেটি জ্যোৎস্নার চমৎকার বর্ণনা দিয়ে চলছে। চাঁদের আলোতে বড় বড় হলগুলো কেমন করে দাঁড়িয়ে আছে। চার পাশের উঁচু উঁচু গাছ গাছালিতে কিভাবে জ্যোৎস্নার আলো পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে। আশেপাশের ঝোপজাড়, বন বনানী, যেন অবিরাম জ্যোৎস্নার সাথে মিতালী গড়ে তুলেছে। ঐ দুরের বিস্তীর্ন ফসলের মাঠ, উঁচু নিচু টিলাভূমি সবখানে যেন জ্যোৎস্নার প্লাবন বয়ে যাচ্ছে। ছেলেটির কথা শুনে মেয়েটি নির্বাক নয়নে তাকিয়ে দেখে তার আশ পাশে। ধীরে ধীরে দৃষ্টির সীমা নিয়ে যায় ঐ দুরে যেখানে সত্যিই সবকিছু ডুবে আছে। পাখিরাও এসময় কোন শব্দ করছে না। ঝিলের অতিথি পাখি কিংবা গাছের ডালে ডালে লুকিয়ে থাকা পাখিরা সবাই যেন ডাক থামিয়ে নি:শব্দ বসে আছে। এরাও যেন জ্যোৎস্নার অপরূপ দৃশ্য বিভোর হয়ে প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে গিয়েছে। ছেলেটি ফোনে না বললে মেয়েটি ছাদের উপরে উঠে এত সুন্দর জ্যোৎস্না কখনো অনুভব করতে পারতো না। ছেলেটি অনরগল কথা বললেও তার কথাগুলো সুন্দর, খুব একটা বিরক্তিকর নয়। কথার মাঝে বৈচিত্র্য আনতে পারে। তাই শুনতে ভাল লাগে। কথায় মুগ্ধ হলে তারপর সে এত সহজে তার কথা দিবে না। আরও সময় নিবে। ধীরে ধীরে সবকিছু করা ভাল। অনেকে বলে আবার সময় থাকতে করতে হয়। সুযোগ ও সময় বার বার আসে না। সে আবার এসব খুব গুরুত্ব দেয় না।না হলে বা কি। এ হলে যারা আছে সবাই কি এসব করে। হাতেগোনা কিছু কিছু ছেলেমেয়েরা এসবে নিজেদের ব্যস্ত রাখে। ছেলেটি আসলে খারাপ না। তার যথেষ্ট ধৈর্য্য আছে। না হলে এতদিন পিছু লেগে থাকে কেউ। দিনের পর দিন সে যেন এটা নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কখনো এ ব্যাপারে কিছু না বললেও সে অনুমান করতে পারছে যে মেয়েটির একটা সম্মতি আছে। না হলে তার কথায় সে ছাদে এসে এত সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা শুনবে কেন। কথার মাঝে সে মেয়েটিকে জ্যোৎস্নার অপরূপ সৌন্দর্যে কাছে নিয়ে গিয়েছে। চাঁদের আলোতে এ ক্যাম্পাসটাকে সে দেখেছে কিছু ছাদের উপর থেকে দাঁড়িয়ে এত অপূর্ব সুন্দর জ্যোৎস্নার প্লাবন সে আর কখনও দেখেনি। ছেলেটি এবার তাকে বলে হলের একটু দূরে আনন্দ পুকুরের দিকে একটু তাকাতে। পুকুরের জল জ্যোৎস্নার আলোয় কেমন ঝিলমিল করছে যেমন রুপালি চাদের আলোয় ভরে উঠেছে। চাঁদখানি তার সব আলো নিয়ে যেন পুকুরের তলায় নেমে এসেছে। পুকুর জলে জ্যোৎস্নার আলোয় যে এত সুন্দর দেখায় সেটা ভাবা যায় না। ঐ পুকুর পাড়ে কি যাবে? ঐখানেতো জ্যোৎস্নায় সাঁতার কাটা যায়। জ্যোৎস্নার জলে ডুব দেয়া যায়। আবার ভেসে উঠা যায়। মেয়েটি অবাক হয়ে ছেলেটির কথা শুনে। আর জ্যোৎস্নায় পুকুর জলে সাঁতার কাটার স্বপ্নে বিভোর হয়।মনটা যেন কিছুটা নিজের ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। আসলে সেও কি ছেলেটির সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। ছেলেটি সত্যিই তাকে ভালবাসার টানে বের করতে চায়। এখন তার মন এরকম একটি প্রশ্নের মুখোমুখি। নিজের মনের কাছ থেকে এরকম একটি উত্তর খুঁজে বের করতে চায়। যেটি তাকে শুধু আনন্দ আর ভাবনায় ফেলবে না একটি চিন্তারও পথ দেখাবে। সে পথে সে অনেকদুর এগিয়ে যেতে পারবে। তারপরও পথ শেষ হবে না। এরা কেউ জানবে না এ পথের শেষ কোথায়। তারপর পথটি ধরে হাঁটতে মন চাইবে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হওয়ার পরও পথ চলতে চলতে পথের শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। এরপরও এ চলা কখনো থামবে না।

ছেলেটির কথায় মেয়েটির পুকুরটি দেখতে খুব ইচ্ছা করে। পরের দিন বিকেলে সত্যি সত্যি মেয়েটি পুকুর পাড়ে যায়। আনন্দপুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে পানির ভেতর দৃষ্টি মেলে তাকায়। একটু পরে অবাক হয়ে যায়। ওপাড়ের দৃশ্যটি পুকুরের তলায় ভেসে ওঠে। ওখানে ছেলেটি দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেও আর দৃষ্টি ফেরাতে পারেনা। তখন পুকুরের দু’পাড় থেকে দু’জনে পানির ভেতর একে অন্যকে দেখে কি অজানা এক আনন্দে বিভোর হতে থাকে।

x