আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরে উঠুক নববর্ষের উৎসব

বিশ্বজিৎ পাল

বৃহস্পতিবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
158

রুক্ষধূসর প্রকৃতি যেমন বৈশাখী বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে, তেমনি আবালবৃদ্ধবণিতা পহেলা বৈশাখের দিনটির জন্য অপেক্ষা করে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস গড়িয়ে আমাদের মাঝে সেই অপেক্ষার পালা শেষ হয়। বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস বৈশাখ। বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির নববর্ষ। বাঙালির উৎসবের দিন। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিদের জন্য একটি বিশেষ দিন এমনকী সার্বজনীন লোক উৎসব। উৎসব আরও আছে, কিন্তু পহেলা বৈশাখের মতো ধর্মনিরপেক্ষ, ইহজাগতিক, সর্বজনীন উৎসব আর দ্বিতীয়টি নেই। এদিন গ্রাম ও শহর বাংলায় সর্বত্রই সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। প্রকৃতির খরতাপচিহ্নে বাতাসে উষ্ণ ভাপের মাঝে বছর ঘুরে ঋতুচক্রের পালা বদলে ফিরে আসা পহেলা বৈশাখে সকল বাঙালি নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে বিদায়ী বছরের সকল দুঃখবঞ্চনা। সব নাপাওয়ার বেদনা পেছনে ফেলে প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে শুচি ও শুদ্ধ করে তুলতেই আবহমানকাল থেকে বাঙালির জাতীয় জীবনে নতুন বছরের প্রত্যাশায় এই নববর্ষ বারে বারে এসে হাজির হয়। বিগত বছরের যাপিত জীবনের কষ্ট গ্লানি মুছে সংযোজনবিয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা পালন করি পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, সকল অন্যায়, অসাম্য, ধর্মান্ধতা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার নতুন শপথের দিন। বিশেষ করে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংকল্প নেয়ার দিন।এ বৈশাখের নবপ্রভাতেই প্রার্থনা হোকণ্ড যা কিছু ক্লেদাক্ত, গ্লানিময়, যা কিছু জীর্ণশীর্ণদীর্ণ, যা কিছু পুরনোতা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে যেন ছাই হয়ে যায়। পুরনো বছরের সব নিষ্ফল সঞ্চয় উড়ে যাকণ্ডদূরে যাক, যাক দূরদিগন্তে মিলিয়ে। এ দিনে নতুন সূর্যের আলোকচ্ছটায় রাঙা হবে দেশ, নেচে উঠবে মানুষের মন। ঘর ছেড়ে রাস্তায় প্রাঙ্গণে নামবে মানুষ, মেতে উঠবে প্রাণের উৎসবে। এভাবেই আসে বৈশাখ। বৈশাখ মানেই গ্রামবাঙলার চিরায়ত রূপ, হিরম্ময় পৃথিবী। শুধু কি তাই। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে নিমন্ত্রণ পর্ব। এবাড়ি থেকে ওবাড়ি গিয়ে ভোজন। ভোজনরসিক বাঙালি চিরকালই নিমন্ত্রণের কাঙাল। গ্রামবাংলার চৈত্রসংক্রান্তি এখন ঠাঁই করে নিয়েছে শহরেও। নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই দিবসটির আলোড়ন যেভাবে দেখা যায়, অন্য শ্রেণির মধ্যে সেভাবে দেখা যায় না। রাস্তায় এ উপলক্ষে যে বিশাল আকারে অনেক শোভাযাত্রা হয়, সেখানে থাকে মধ্যবিত্ত তরুণতরুণীদের উপস্থিতি। তাতে গরিব ও শ্রমজীবীদের উপস্থিতি দেখা যায় না বললেই চলে। নববর্ষে আমরা যেন ফিরে পাই আমাদের সেই হৃত গৌরব। যেন আবার আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে আন্তরিক প্রসন্নতায়। নববর্ষের উৎসব সত্যের গৌরবে, প্রেমের গৌরবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক এমনটি প্রত্যাশা সকলের। বাংলা নববর্ষ সমগ্র মানুষের কাছে নবজীবনের দ্বার উম্মোচিত করে দিক। নতুন বছর যেন মুষ্টিমেয় ধনীর ভোগ বিলাসের সংকীর্ণ উল্লাসে পরিণত না হয়। দরিদ্র, লাঞ্ছিত, পীড়িত মানুষের নিস্ফল বিলাপে যেন পৃথিবী বিষন্ন না হয়ে উঠে। যুদ্ধদীর্ণ বিশ্বের পাশবশক্তির তান্ডব যেন শান্তির শুভ শক্তির কাছে পরাভূত হয়। বৈশাখের জাদুকরি ভেলকিতে নিরসধূসর জীবন হয়ে উঠুক বর্ণিল ও প্রাঞ্জল এই হোক আমাদের প্রার্থনা। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বিভিন্নভাবে অনুভূতিটুকু ব্যক্ত করেছেন নিচে তা তুলে ধরা হলো।

ডা. জেসমিন আহ্‌মেদ, চিকিৎসক

চক্ষু চিকিৎসক ডা. জেসমিন আহ্‌মেদ খুলশী থানাধীন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি ২০০৩ সাল থেকে পাহাড়তলীস্থ আন্তর্জাতিক চক্ষু হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এক সন্তানের জননী ডা. জেসমিন আহ্‌মেদ এর ছেলে একীন ইলাহী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১১ সালে শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার লাভ করা চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর হোসাইন আহ্‌মেদের মেয়ে ডা. জেসমিন আহ্‌মেদ। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হলে এই চিকিৎসক বলেন, একটি নতুন দিন, একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় উদ্ভাসিত সর্বজনীন উৎসবের দিন বৈশাখ। বৈশাখে আমার অতীতের সেই শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবনের স্বর্ণালী স্মৃতি আমাকে প্রায়ই হানা দেয়। আমার সকল সহপাঠিরা আজ ছিটকে পড়েছে নানা জায়গায়, তবু আত্মার বন্ধনটা এখনো আছে। আমরা এখনো একজন আরেকজনের কাছে এলে ছেলেমানুষের মত স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠি, বাস্তব জীবনের নানা জটিলতা ভুলে যাই নিমিষেই।

বিশেষ করে বৈশাখের প্রথম দিনে অন্যান্য দিনের মত নামাজ পড়বো, কোরআন শরীফ পড়বো। এরপর শুরু হবে আমার বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা। হরেক রকমের পিঠার আয়োজন রয়েছে ঘরে। আমার মা ফরিদা হোসাইন এসব পিঠা বানাতে ভালোবাসেন। ছেলেকে নিয়ে আত্মীয় স্বজনের বাসায় যাব। তারাও আসবে আমাদের বাসায়। বাসায় ইলিশ মাছ আর পান্তা ভাতের আয়োজন থাকছে। বিকেলে নগরীর কয়েকটি আকর্ষণীয় বিনোদন স্থানে যাব। বৈশাখী মেলাতেও যেতে পারি। বান্ধবীদের নিয়ে যেতে পারি সিআরবিতেও। প্রতিবারের মত কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর সন্ধ্যা নেমে এলে বান্ধবীরা সাবাই চলে যায় একে একে। বাসায় ফিরে আসি, ভাবতে থাকি আমার সামনের বাকি জীবন, পুরোনোকে ভুলে নতুন করে শুরু করা জীবন। এই বোধটা আমার মাঝে এক ধরনের স্বস্তির সঞ্চার করে। সবাইকে জানাই বৈশাখের শুভেচ্ছা।

মো. আশরাফুল আলম, সরকারি চাকরীজীবি

সরকারি চাকরীজীবি মো. আশরাফুল আলম। ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল গ্রামের বাসিন্দা তিনি। বর্তমানে থানা শিক্ষা অফিসার চান্দগাঁও, চট্টগ্রামে কর্মরত রয়েছে। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে মহানগরীর আগ্রাবাদে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

পহেলা বৈশাখ কিভাবে উদ্‌যাপন করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরনো বছরের সব গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বেদনা মুছে দিয়ে জীবনে নতুন সম্ভাবনার শিখা জ্বালাতে আবার এসেছে পহেলা বৈশাখ। এ বৈশাখের ছোঁয়ায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জীবন আনন্দে ভরে উঠুুক এমন প্রত্যাশা করছি।

তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে প্রতিবার বৈশাখ উদ্‌যাপন করতাম অনেক অনেক আনন্দে নিজ বাড়িতে। এ আনন্দ বলে শেষ করতে পারবো না। এমন প্রাণের উৎসব আর কোন অনুষ্ঠানে দেখি না। আর এখন চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বসবাস করি। যদিও বৈশাখে গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, কাজের ব্যস্ততার কথা চিন্তা করে এখন পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন করি চট্টগ্রাম শহরেই। চৈত্রের ২০ তারিখের পর থেকে আমার কাছে বৈশাখের আনন্দ বিরাজ করে। এ সময় বিগত দিনের ফেলে আসা অনেক স্মৃতি আমাকে যেমন তাড়া করে তেমনি বৈশাখের আগমন আরো বেশি আনন্দ দেয়। আগে থেকে স্ত্রী, সন্তানদের বৈশাখের পোশাক কিনতে হয়। কেনা থেকে বাদ পড়ি না নিজেও। তাই নিজেও একটি বৈশাখি পাঞ্জাবী ক্রয় করেছি। দিনের এক ভাগে কলাকুশলীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়, স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বৈশাখী মেলায় সময় কাটানো, শিশু পার্কে গিয়ে পরিবারের সকলের সাথে আনন্দের মাধ্যমেই নববর্ষ উদ্‌যাপন করবো।

সুপ্তা চাকমা, আদিবাসী

সুপ্তা চাকমা। রাঙামাটি কলেজ গেইট এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীর অলংকার এলাকায় বাড়া বাসায় বসবাস করেন। তিনি মহানগরীর দেওয়ানহাটস্থ একটি বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। অমর শংকর চাকমা ও মধুবালা চাকমার মেয়ে সুপ্তা চাকমা অনেক আগ থেকে শহরে এসেছেন। বর্তমানে তাঁর এই চাকরি দিয়ে পরিবার পরিজন ও নিজের খরচ অনায়াসে মেটাতে পারেন বলে নিজেকে খুব সুখী মনে করছেন।

পহেলা বৈশাখ কিভাবে উদ্‌যাপন করবেন এমন প্রশ্নে সুপ্তা বলেন, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা নববর্ষ সকল জাতির অন্যতম দিন। এই দিনে পাহাড়িরা নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি উৎসব পালন করে। মেতে উঠে বৈসাবিতে। তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি সম্প্রদায় সবাই বাংলা নববর্ষে মেতে উঠেছে। তিনি বলেন, এমন উৎসবের আগমনে মন কেবল ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। পাহাড়ে বাঙালির ঘরে বৈশাখী উৎসবের সাথে পাহাড়িদের ঘরে ধুম পড়ে বৈসাবী উৎসব পালনের। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান পাহাড়ি অধিবাসীরা ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে থাকে। চাকমারা পালন করে ‘বিজু’ নামে, ত্রিপুরারা ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যারা ‘বিসু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’ নামে। এই চার সম্প্রদায়ের দেওয়া উৎসবের নামগুলো একত্র করে, এখন এর নাম রাখা হয়েছে ‘বৈসাবি’। সুপ্তা বলেন, নববর্ষ উপলক্ষে পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনেছেন। এ দিনে সে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনের পাশাপাশি মন্দির দর্শন করবেন। প্রতিবারের মত মা ভালো ভালো রান্না করবেন, গ্রামের সবার বাড়িতে যাবেন, বৈশাখী শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন বলে জানান।

মো. মোস্তফা কামাল, সংগীত শিল্পী

মো. মোস্তফা কামাল বর্তমানে বায়েজীদ থানাধীন এলাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। তিনি চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীতে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি একাডেমিতে সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী। বাংলাদেশ টেলিভিশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রেরও বিশেষ গ্রেডের শিল্পী ও সংগীত পরিচালক তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ বেতারেরও তিনি সংগীত পরিচালক।

পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনের বিষয়ে ৬২ বছর বয়সী এই শিল্পী বলেন, নববর্ষ বাঙালীর একটি আনন্দের দিন। এই দিনটির জন্য আমরা প্রতিবার অপেক্ষা করে থাকি। আগে থেকে আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখের আনন্দধারা বয়ে যায়। তাই পরিবার পরিজনের জন্য নতুন বৈশাখের পোশাক ক্রয় করেছি। তিনি বলেন, এ দিনের বেশির ভাগ সময় কাটবে আমার শিল্পকলা একাডেমিতে। সকাল ৯টায় র‌্যালী হবে প্রতিবারের মত। সারাদিন নববর্ষের অনুষ্ঠানে নিজেকে ব্যস্ত রাখবো। বৈশাখের আগমনে এখানে হবে দেশীয় সংস্কৃতির অপার আয়োজন। নাচ, গান থেকে শুরু করে হরেক রকম আয়োজন, যাতে আগতদের মাঝে বৈশাখের আনন্দধারা বয়ে যায়। বিকেলে স্ত্রী আর দুই সন্তান মৌটুসি ও মৌমিতাও অনুষ্ঠানে আসবে। এরপর তাদের সাথে অনুষ্ঠানেই বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করবো।

মো. আজাদ ইকবাল পারভেজ, শিক্ষক

পেশায় শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব তোফায়েল আহমদের পুত্র মো. আজাদ ইকবাল পারভেজ মহানগরীর লালখাঁন বাজারের স্থায়ী বাসিন্দা। লালখাঁন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। মজার বিষয় হলেন তিনি এই বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেছেন। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনের বিষয়ে তাঁর মুখোমুখি হলে তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় চেতনার অর্থাৎ বাঙালি সত্তার সঙ্গে পহেলা বৈশাখের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বাঙালির সমাজ সংস্কৃতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বাংলা নববর্ষের মাহাত্ম্য। এ দিনে নতুনের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে উঠে আমার মত সকলের ক্লান্তশ্রান্ত জীবন। অনেক ছোটবেলা থেকে পহেলা বৈশাখের আনন্দে প্রতিবার উদ্ভাসিত হই। এবার আমার নববর্ষ কাটবে আমার কর্মরত বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে। বৈশাখকে বরণ করতে স্কুলকে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকে শুরু হবে অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় প্রোগামের অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানে আমার প্রিয় শিক্ষক/ শিক্ষিকামন্ডলী, কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা বৈশাখী সাজে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে উপস্থিত হবে। সারাবেলা তাদের নিয়ে নাচগান, বৈশাখের অপার আনন্দে হারিয়ে যাব। দুই কন্যা সন্তানের জনক এই শিক্ষক আরো বলেন, বিকেলে স্ত্রী সন্তানদের একটু সময় দেব। পরিশেষে সিআরবিতে এসে অনুষ্ঠান উপভোগ করবো।

মোঃ আমির হোসেন, হোটেল শ্রমিক

চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেডস্থ রুজি হোটেলের শ্রমিক মোঃ আমির হোসেন ভান্ডারী। তিনি দীঘদিন যাবৎ চট্টগ্রাম মহানগরে বসবাস করে আসছেন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। ভেলোমিয়া গ্রামের মুজিব হাওলাদারের পুত্র। বর্তমান ইপিজেড থানাধীন নিউমুরিং রোডে ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

পহেলা বৈশাখকে কিভাবে বরণ করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে এই শ্রমিক জানান, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কাজ থেকে ছুটি নেব। সকাল বেলায় সন্তানদের নতুন পোশাক উপহার দেবো। পরিবারের সকলকে খুশী রাখতে কষ্ট করে হলেও পান্তা ইলিশের আয়োজনতো থাকবেই। স্ত্রী সন্তাদের নিয়ে হয়তো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে অথবা সি আর বি বৈশাখী মেলাতে বেড়াতে যাব। কারণ সারা বছর কর্মব্যস্ততার জন্য ঠিকমত পরিবারকে সময় দিতে পারি না। তিনি আরো জানান, চট্টগ্রাম শ্রমজীবি সমবায় সমিতি বাংলাদেশ লিমিটেডের সভাপতি তিনি। সন্ধ্যায় বিভিন্ন সংস্থাতে চাকুরিজীবি শ্রমিকদের নিয়ে বৈশাখী আড্ডায় মাতবো। সে আড্ডায় নতুন বছরের নতুন দিনেই করবো অঙ্গিকার সুন্দর আগামী প্রজন্ম গড়ার।

রাশেদা আক্তার, গৃহিণী

রাশেদা আক্তার চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর থানাধীন বাসায় পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। তিনি দুই সন্তানের জননী। বড় ছেলে মো. ইফতেজার মিয়া ভিকি বি.এস.সি ইঞ্জিনিয়ারিং ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ আর ছোট ছেলে ইমতেজার মিয়া নিকি বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে বি. এস.সি ইঞ্জিনিয়ারিং ইন ইয়ার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যয়নরত। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের সার্বজনীন উৎসব। এই উৎসবের আগ থেকে আমার প্রস্তুতি থাকে। কেননা এ দিন ভালো ভালো রান্নাই আমার মূল আনন্দ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের বাসায় পহেলা বৈশাখের দুপুরের খাবার হবে। আমাদের আত্মীয় স্বজন সবাই একত্রিত হয়ে এই দুপুরের খাবার খাব।

আমার স্বামীর একান্ত এবং আন্তরিক ইচ্ছায় সবাই মিলে এই আয়োজন করে থাকি। আসলে তেমন কিছু না, তবে এই আনন্দটাই বিরাট ব্যাপার। কেননা বাঙালির সার্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এই প্রস্তুতি কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়েছি। দুপুরের পর স্বামী সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে বের হব। সারাবছর বাসায় থাকি। এদিন ঘুরতে বের হওয়ার আনন্দটা অনেক আগে থেকে বিরাজ করে। মেলায় যাব, নগরের বৈশাখী অনুষ্ঠানগুলো দেখবো। বৈশাখী সাজে সাজবো, সাজবে আমার স্বামী সন্তানরাও। সব মিলিয়ে বৈশাখ একটি প্রাণের উৎসব বলে আমি মনে করি।

আকলিমা মুক্তা, সংগীত শিল্পী

চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহরে বসবাস করেন শিল্পী আকলিমা মুক্তা। আবদুর রউফের স্ত্রী আকলিমা মুক্তার শ্বশুরবাড়ী সীতাকুন্ডে। পিতার বাড়ি সন্দ্বীপে। ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স মাষ্টার্স সমাপ্ত করা এ শিল্পী বাংলাদেশ টেলিভিশনের আধুনিক গানের নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিল্পী। বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রেরও নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিল্পী। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের নজরুলআধুনিক গানের নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিল্পী এবং আধুনিক গানের সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনি যুক্ত রয়েছেন।

পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনের বিষয়ে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,

এসো হে বৈশাখ, এসো হে নতুন’ এই গানটি দিয়েই মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, নববর্ষের আনন্দ বয়ে যাচ্ছে, মনে প্রাণে। আনন্দউৎসব আর উচ্ছ্বাসউষ্ণতায় পুরো জাতি পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে বরণ করে নেবে, এই আনন্দ বিরাজ করছে আগে থেকেই। স্বামী আর সন্তান নওশীন নাওয়ার (রিদি) এর জন্য বৈশাখের পোশাক কেনা হয়েছে। নিজেও বাদ পড়িনি বৈশাখের নতুন শাড়ি থেকে। সকালে নামাজ পড়বো, কোরআন শরীফ পড়বো। এরপর শুরু হবে আনুষ্ঠানিকতা। ঘরে আয়োজন থাকবে ভালো ভালো খাবারের। বিকেল স্বামী সন্তানকে নিয়ে বের হবো। বৈশাখী মেলায় যাব। প্রতিবার সন্তানের আবদার থাকে হরেক রকমের জিনিষ ক্রয় করার। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসবো।

উম্মে শাহনুমা মেহেরুন, শিক্ষার্থী

চট্টগ্রাম মহানগরীর কে.বি..এইচ দোভাষ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সদ্য এস এস সি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে উম্মে শাহনুমা মেহেরুন। গোসাইল ডাঙ্গায় বসবাসরত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান ও অধ্যাপিকা বিবি মরিয়মের কন্যা সে।

পহেলা বৈশাখ কিভাবে উদ্‌যাপন করবে জানতে চাইলে এই মেধাবী শিক্ষার্থী বলে, বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে যত অনুষ্ঠান বছরে আসুক না কেন, তার মধ্যে আমি পহেলা বৈশাখে অপার আনন্দে হারিয়ে যাই। পহেলা বৈশাখ মানে সকলের বুক জুড়ে মিলিত উচ্চারণআমরা সকলেই বাঙালি। বাঙালির চিরকালীন আনন্দউৎসব এই বৈশাখের ছোঁয়ায়। আমি মনে করি এ আনন্দ নিখাদ। বারো মাসে তেরো পার্বণের এ দেশে এর চেয়ে বড়ো উৎসব নেই। তাই বৈশাখ মানে আমার আনন্দ। আমি পহেলা বৈশাখের আগ থেকে নিজে প্রস্তুতি নিই। বৈশাখ আসবে এই আনন্দ বিরাজ করে সর্বক্ষণ। এ সময় লেখা পড়ায় মন বসেনা। বৈশাখের প্রথম দিন আসলেই সেই আনন্দ পরিপূর্ণ রূপ পায়। সকালে আব্বু আম্মুকে সালাম করে আগত বান্ধবীদের সাথে সময় কাটাই। বৈশাখের নতুন সাজে সাজি। পোশাকে থাকে নতুনত্ব। আগেই আব্বু আম্মুর সাথে মার্কেটে গিয়ে বৈশাখের পোশাক, তার সাথে মিলিয়ে জোতা, চুড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী কিনেছি। অন্যদিনের পোশাকগুলো আমার আম্মুর পছন্দের হলেও বৈশাখের পোশাকটি আমার পছন্দ মতে আমাকে কিনে দেয়া হয়েছে। সারাদিন পরিবারের সকল সদস্যদের, আমার বান্ধবীদের সাথে অপার আনন্দে মিলিত হব। বিকেলে মা বাবার সাথে ঘুরতে যাওয়া, মেলায় কিছু কেনাকাটা করা সব মিলিয়ে নিজেকে ওই দিন খাঁটি বাঙালিয়ানা মনে হয়।

মোঃ কেনু মিয়া, রিকশা চালক

একজন রিকসা চালক মোঃ কেনু মিয়া। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার তারাইল থানার শৌলদি গ্রামের মো. জুনু মিয়া পুত্র। বর্তমানে মহানগরীর পতেঙ্গা থানাধীন কাটগড়স্থ মুসলিমাবাদে পারিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার স্ত্রী একজন গার্মেন্টস কর্মী। পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে কেনু মিয়া গত তিন বছর আগে চট্টগ্রামে এসে কোন কাজ না পেয়ে রিকসা চালানোর পেশা বেছে নেন। পহেলা বৈশাখ কিভাবে উদ্‌যাপন করবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী পহেলা বৈশাখ আসলেই বৈশাখি মেলায় বেড়াতে যাওয়ার বায়না ধরে। আসলে পহেলা বৈশাখে আনন্দ করা,পান্তা ইলিশের আয়োজন করা,পরিবারকে সময় দেওয়া,বেড়াতে যাওয়া আমাদের মত গরীবের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বিশ টাকা রোজগার করতে ঘাম ঝরে পড়ে, কিসের আবার বৈশাখের আনন্দ। আমাদের জন্য পহেলা বৈশাখের আনন্দ আসেনি। সাধ থাকলেও আমাদের সাধ্য নেই। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা উপার্জন করি তাতেই সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যায়, সেখানে বিশেষ দিনগুলো আমাদের কাছে স্বপ্নের মত। তবে এবারের পহেলা বৈশাখে দিন সকালে পেটের তাগিদে রিকসা নিয়ে বের হব আর বিকালে স্ত্রী সন্তানদের আমার রিকসায় নিয়ে বৈশাখি মেলায় যাব,সাধ্যের মধ্যে আমার ছেলেকে খেলনা কিনে দেব,স্ত্রীকে খোপার ফুল,কানের দুল আর গলার মালা কিনে দেব,নিজের জন্য একটা লুঙ্গি কিনবো। মেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে,মুড়ির মোয়া,বাতাসা,খই,লাড্ডু কিনে নিয়ে যাব, বাকিটা আল্লাহর হাতে।

ইরফানুল হক নিজামী (প্রিয়াশ), শিক্ষার্থী

খুলশীর রেডিয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজের ৫ম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ইরফানুল হক নিজামী (প্রিয়াশ)। মিরসরাইয়ের চৈতন্যহাট জনার্দ্দনপুরের এরাদুল হক নিজামী ও হাসিনা ইয়াছমিনের বড় পুত্র সে। বর্তমানে ইরফানুল হক নিজামী মাবাবার সাথে খুলশীতে বসবাস করেন।

পহেলা বৈশাখ কিভাবে কাটাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে এই শিশু শিক্ষার্থী বলে, আমার আব্বু আম্মু আমাকে বৈশাখের পোশাক কিনে দিয়েছে। এবার আমার পোশাকটা অনেক সুন্দর। আম্মু বলেছেন, এটা পরলে সুন্দর লাগবে তোমাকে। আমি প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে আমার ভাইয়ের সাথে খেলাধূলা করি। পহেলা বৈশাখে দুই ভাই বাসায় খেলব না। লেখা পড়া করব না সারাদিন। আমার স্যার বলেছেন বৈশাখের আনন্দের দিন লেখাপড়া না করলে চলবে। স্যার অনেক ভাল মানুষ। আমার আব্বু আম্মুর সাথে মেলাতে যাব। মেলায় সুন্দর সুন্দর খেলনা পাওয়া যায়। গত বছরও কিনেছি। আবার আমি আমার বন্ধুদের বাসায় যাব আব্বু আম্মুর সাথে। তাদের সাথে আনন্দ করব। তাই এখন থেকে আমার পড়ায় মন বসছেনা। কখন আসবে বৈশাখ!

সামিনা আকতার, পুলিশ সদস্য

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এর সদস্য সামিনা আকতার সিটি এসবিতে কর্মরত রয়েছেন। কক্সবাজার সদরের পোকখালী ইউনিয়নের উত্তর গোমাতলী গ্রামের ফজল করিম এর কন্যা তিনি। বর্তমান চট্টগ্রাম মহানগরীর পশ্চিম বাকলিয়া চন্দনপুরাস্থ চকবাজার ভাড়াবাসায় পরিবারের সাথে বসবাস করেন। বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের বিষয়ে তাঁর মুখোমুখি হলে তিনি জানান, পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। নববর্ষে নানা আয়োজনে বাঙালিয়ানার ষোলআনা পূর্ণ করতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সাথে মিশে যাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শিক্ষা জীবনে এ আনন্দে যুক্ত হওয়া গেলেও পেশাগত জীবনে এটি আর হয়ে উঠে না। বিগত ৬ বছর নানা স্পটে নববর্ষের আয়োজনে নিরাপত্তার দায়িত্বপালনের সাথেই আনন্দটা উপভোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারও যেখানে দায়িত্ব পড়বে সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি অতিবাহিত করবো। এজন্য ভোরেই তৈরি হয়ে দায়িত্বের স্থানে যাব। এদিন সাধারণ মানুষের মতো বাইরে ঘুরার সুযোগ হয়তো আসবে না। তাই পরিবারের সদস্যদেরও সেখানে নিয়ে গিয়ে আনন্দে অংশিদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পরিশ্রমের বিনিময়ে অনাকাঙ্খিত কোন ঘটনা ছাড়া শান্তিময়ভাবে নববর্ষ উদযাপিত হউক এটাই প্রত্যাশা আমার।

রূপালী বিশ্বাস, নার্স

সিনিয়র স্টাফ নার্স রূপালী বিশ্বাস বি আই টি আই ডিতে কর্মরত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পাস ও বিএসসি নাসিং করে তিনি এই সরকারি চাকুরীতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি বন্দর থানাধীন গোসাইলডাঙ্গা এলাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া অংকিতা দাশগুপ্তা ও কেজি শ্রেণিতে পড়ুয়া অধ্যয়ন দাশগুপ্ত নামে দুই সন্তান রয়েছে তাঁর। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন নিয়ে তার মুখোমুখি হলে তিনি বলেন, যথারীতি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান শেষ করে পূর্জা অর্চ্চনা করবো। পরিবারের শাশুড়ী ও স্বামীকে প্রণাম করে বৈশাখের শুভেচ্ছা জানাবো। পরিবারের সবাই নতুন পোষাক পরে বৈশাখী সাজে সাজবে। প্রতিবেশীদের বাসায় বেড়াতে যাবো, তাদেরকেও আমাদের বাসায় আপ্যায়ন করবো। বাসায় রুচিশীল বিশেষ রান্না করবো, যা আমার স্বামীর পছন্দের আপ্যায়নের জন্য থাকবে বৈশাখী পিঠা পুলির আয়োজন।এরপর আমাদের চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডি সি হিল ও সি আর বি শিরিষ তলায় বৈশাখী অনুষ্ঠান এবং মেলায় ঘুরতে যাবো, সন্তানদের বাংলার সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। সন্তান ও পরিবারের সবার জন্য নানা রকমের কুটির শিল্প, বাচ্চাদের খেলনা, মিষ্টি কিনবো প্রতিবারের মতো, বাসায় নিত্য প্রয়োজনী কাজের জন্য পণ্য সামগ্রীও কিনবেন বলে তিনি জানান।

সজল দাশ, মুদি দোকানদার

চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার থানাধীন দেওয়ান বাজার মৌসুমি মোড়স্থ সুনীল ষ্টোরের প্রোপ্রাইটর সজল দাশ। দোকানের কয়েকগজ দূরে ভাড়া বাসায় মাবাবা, ভাই, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করেন তিনি। গ্রামের বাড়ি আনোয়ারার পাটানী কোটা এলাকায়। প্রতিবার পহেলা বৈশাখের আনন্দ তার এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে।

এবার পহেলা বৈশাখ কিভাবে কাটাবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ মানে আনন্দের উজ্জ্বলতা। ছোট বেলায় গ্রামের বাড়িতে বৈশাখের যে আনন্দ বিরাজ করতো, এখন সেই আনন্দ নিজ প্রতিষ্ঠানে উপভোগ করি আমার ক্রেতা সাধারণের মাঝে। পহেলা বৈশাখ আসার কয়েকদিন আগ থেকে আমি সেই আনন্দে জেগে উঠি। প্রতিবারের মত এবারও ১৪ ও ১৫ এপ্রিল দুইদিনব্যাপী হালখাতা অনুষ্ঠান রয়েছে। এ দিনে পুরাতন বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসেবের খাতা খুলবো। ইতোমধ্যে আমার ক্রেতা সাধারণকে নববর্ষের শুভেচ্ছা সম্বিলিত নিমন্ত্রণ পত্র দিয়ে হালখাতা অনুষ্ঠানের কথা জানান দিয়েছি। এ দুইদিন ক্রেতা সাধারণকে বৈশাখের মিষ্টিমুখ করানো হবে। তাছাড়া সকল আত্মীয় স্বজনদের কাছে মিষ্টি পাঠাবো। এক সন্তানের জনক এই দোকানদার আরো বলেন, স্ত্রী, সন্তান, মা বাবাও দিনের কোন এক ভাগে দোকানে আসবেন।

মো. আবদুল মন্নান, সবজি বিক্রেতা

চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন মোমিন রোডে রিকসা ভ্যানে ১৮ বছর ধরে সবজি বিক্রি করে আসছেন মো. আবদুল মন্নান। গ্রামের বাড়ি আনোয়ারার খুরুশকুল হলেও স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে খলিফা পট্টিতে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। তার এই সবজি ব্যবসায় সহযোগিতা করেন তার ছোট ভাই ওসমান। পহেলা নববর্ষ কিভাবে কাটাবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে মো. আবদুল মন্নান বলেন, ইংরাজী নববর্ষ থেকে বাংলা নববর্ষ আমার অনেক আনন্দ লাগে। পহেলা বৈশাখে দোকান বসাবো না। এরই মধ্যে আমার ভাই, স্ত্রী আর সন্তানদের জন্য সাধ্যের মধ্যে বৈশাখের পোশাক কিনে দিয়েছি। নিজেও একটা বৈশাখের পাঞ্জাবী কিনেছি। সারাটা দিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দ করবো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবজি বিক্রি করার কারণে স্ত্রী সন্তানদের সময় দিতে পারি না। পহেলা বৈশাখে সারাটা দিন তাদের সাথে কাটাবো। সবাইকে নিয়ে বৈশাখী মেলায় যাব। সিআরবি, ডিসি হিলে যাব। মেলাতে স্ত্রী প্রতিবার বায়না ধরে, বাহারি পণ্য ক্রয় করতে। বায়না ধরে সন্তানরা। হরেক রকমের খেলনা কিনতে। তাই আগ থেকে একটু একটু করে টাকা সঞ্চয় করে রেখেছি। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।

x