আনন্দে ভরে উঠুক শিক্ষাজীবন

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
89

পৃথিবীর যেকোন কাজ করার আগে নিজের মধ্যে সেই কাজ করার ইচ্ছা শক্তি, বোধ অত্যন্ত সুন্দর হলেই কেবল কাজটি যথাযথভাবে সমাধান হতে পারে। যেকাজে আনন্দ থাকবে না সেই কাজ শেষ হলেও যথেষ্ট শূন্যতার জায়গা সেখানে থেকে যাবে। শিক্ষার ক্ষেত্রটা এর বাইরে নয়, বরং শিক্ষায় আনন্দ আরো জরুরি। কারণ শিক্ষা গ্রহণের জন্য যারা আসবে তারা, তাদের কচি মন আনন্দ অন্বেষায় নিয়োজিত। তাদের জীবনবোধটাই আনন্দ নির্ভর। কারণ এই শিশুদের কাজ থেকেই একদিন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র চাইবে। তাহলে আনন্দময় শিক্ষাটা কার জন্য? নিশ্চয় আমাদের প্রিয় সন্তানদের জন্য, যারা আগামী দিনের সোনালী মানুষ। প্রিয় শিক্ষার্থীটি প্রথম জীবনে তার মা-বাবার কাছে কাটালেও ৪ বছর বয়সে নতুন একটি পরিবেশে তার শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করবে এখানে প্রথম আনন্দটাই হবে তার শিক্ষককে পাওয়া। শিক্ষক হবেন ঐ মানুষ যিনি মা-বাবার অবস্থানে থেকেই কেবল তার শিক্ষা জীবনের সূচনা ও পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারবেন। প্রশ্ন হল এই শিশু কারা? শিক্ষা বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘শিশু বয়স্ক মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। আমরা অনেকেই শিশুকে বয়স্ক মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসাবে মনে করি। আবার কেউ কেউ ভুল করে শিশুকে মিনি পেস্ট, মিনি ক্যামেরা ও মিনি সাইনিজের মত ‘মিনি মানুষ মনে করি।’ এই বিষয়টি শুধু শিক্ষক নন সমাজের সবাই মনেকরি। আমাদের এই কথাটি ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, শিশু আকারে ছোট হতে পারে তবে তার আবেগ, রাগ, অনুভূতি, ভালবাসা, বোঝার ক্ষমতা, ঈর্ষা ইত্যাদি বয়স্ক মানুষের মত। তাহলে আমার প্রশ্ন আমরা একজন বয়স্ক মানুষের আবেগ, অনুভূতি, দুঃখবোধ ইত্যাদিকে যদি গুরুত্ব দিই, সম্মান করি তাহলে কেন আমরা একজন শিশুর এই বিষয়গুলোকে সম্মান দেখাবো না?’
ইংরেজি Education কথাটির মূল ল্যাটিন অর্থ হল,‘‘ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে অগ্রসর করে নেয়া।’’ শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলেছেন,‘Education is nothing but the gradual and harmonious development of body, soul and mind. যা কিছু শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ করা হয় তাই শিক্ষা। আর শিক্ষা বলতে সু-শিক্ষাকে বুঝায়।’ শিক্ষার সংজ্ঞা যাই হোক না কেন আমাদের দেশে শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষার সুষ্ট পরিবেশের আগে প্রয়োজন একটি শিক্ষানীতি। এই দেশে ব্যবসা নীতি হয়েছে, খাদ্যনীতি হয়েছে, চাকরীনীতি হয়েছে, স্বাস্থ্যনীতি হয়েছে কিন্তু একটি জাতির মানদণ্ড নির্ভর করে তার শিক্ষার উপর। দুর্ভাগ্য এই দেশে শিক্ষার কোন নীতি হয়নি, হচ্ছে না। শিক্ষা-অভিমানীরা অনেক কথা শিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন কিন্তু সমাধান হয়নি। না হওয়ার কারণ কি? কারণ যাই হউক স্বাধীনতার ৪৫ বছরে শিক্ষার জন্য কম সেমিনার হয়নি, আলোচনা হয়নি কিন্তু কাজটা কি হয়েছে ? কিছুই না, কারণ উৎঘাটন করাও যায়নি-যাবেও না।
স্বাধীন দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দেশের মধ্যে অনাদৃত। দেশের মানুষ দেশের শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এই শিক্ষার প্রতি ন্যূনতম আস্থা নাই মানুষের। বিত্তবান শ্রেণির সন্তানরা দেশীয় আমজনতার জন্য চালু শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারে কাছে ও নাই। বিত্তশ্রেণির সন্তানরা দেশ ছাড়ছে ভাল শিক্ষার আশায়। আবার অভিভাবক কিছুটা সঙ্গতি থাকলে দেশের মধ্যে বিদেশী অনুকরণের বা খাস বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থা বেচে নিচ্ছেন। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দশা কারো অজনা নয়। তবে কেন পরিকল্পিতভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে? স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন একটি সময়োপযোগী, দান্দনিক, গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হল না? এই যে অবস্থা এর জন্য অভিভাবককে ঢালাওভাবে দায়ী করা যাবে না। সর্বস্তরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নৈরাজ্য মানুষকে যথার্থ এক অসহায় আবর্তে ফেলেছে-যার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া এককভাবে সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষক-শিক্ষা প্রশাসকরা কম দায়ী নয়।
সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষার এই দশায় চিন্তাশীল মানুষকে বাধ্য করেছে শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণ এবং এ থেকে কার্যকর পরিত্রাণের উপায় বের করতে।
এই অবস্থায় আমাদের হতাশ না হয়ে পারা যায় কি? স্বাধীনতার পর অনেক শিক্ষানীতি হয়েছে, কমিশন হয়েছে। কাজ হয়নি। শিক্ষার দিক-নির্দেশনার জন্য কমিটি বার বার রিপোর্ট দিয়েছে কিন্তু কোন কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। কেন? বার বার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে আমাদের শাসক শ্রেণিকে। ২০০১ সালের পূর্বে আমাদের দেশীয় শিক্ষায় নকলের মহোৎসব চলছিল। বলাবাহুল্য যে, জোট সরকার এই উৎসবের মূল উৎপাটন করেছে। শিক্ষার কিছুটা প্রসারতায় মনোনিবেশ করেছিল সেই সরকার। নকল বন্ধ করার যে মানসিকতা নিয়ে সরকার কাজ করেছে একজন লেখক ও শিক্ষক হিসাবে তার প্রশংসা না করে পারছিনা। কিন্তু নকল বন্ধের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসারতা আনায়ন সম্ভব না। জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রসারতা, শিক্ষার সংস্কার একটি সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, এটি একটি জাতীর শিক্ষানীতির উপরও নির্ভরশীল শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা পন্ডিতরা শিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন, ”Education not only for tomorrow but also for today.’

এখন চলছে কোন রকম বাদ বিচার ছাড়াই এ+ দেয়া এবং পাওয়ার প্রবণতায়। শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে ছেড়ে দিয়ে যেভাবে যা করা যায় তার ষোল কলাই পূর্ণ করছে তথাকথিত এ+ প্রত্যাশী এবং দেয়ার মানসিকতা। এই জাতীয় শিক্ষার ফলে শিক্ষার্থী সারাটা দিনক্ষন কাটাচ্ছে এ+ এর পেছনে। এটি কোন সভ্য জগতের শিক্ষা হতে পারে না, এটি অন্ধকার জগতের তথাকথিত শিক্ষা। এই শিক্ষা না কোন সমাজের হতে পারে না হতে পাওে কোন ব্যক্তির।
বাবা-মায়ের কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি। সময়মত খাওয়া, ঘুম, ঘুম থেকে উঠা, ইবাদত, পড়তে বসা, নিয়ম অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে হাজির থাকা, বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হত একটি নিয়মের মধ্যে। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে অবস্থা? অবস্থাটা বর্ণনা করলাম না, এখন বড় হয়েছি এখনও সেই নিয়মের সাধারণ এদিক-ওদিক হলে বকাঝকা লেগেই থাকে। এতটা শাসনের মধ্যে আমরা কিন্তু আমাদের সন্তানদের রাখিনা, হয়ত রাখতে পারিও না। এখন সময় বদলেছে, নিয়মেরও অনেক খানি পরিবর্তন হয়েছে। অনেকদিন শিক্ষকতা করছি এই কথা এখন সাহস করে বলতে পারি, আমার শিক্ষার্থীরা আমার নিয়ম র্শঙ্খলাকে অনেক বেশি ভালবাসেন, কেউ যদি প্রশ্ন করেন শিক্ষক হিসাবে আপনার অনুভূতি জানান আমি অপকটে বলব আমার শিক্ষার্থীদের আমি অনেক ভালবাসি। কারণ তারা আমার নিয়ম নীতিকে শাসন নয় ভালবেসে গ্রহণ করে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন শিক্ষকরা পড়াতেন পাঠ্যবই। কিন্তু শিক্ষকরা এই কথা কোনদিন হলফ করে বলতে পারেননি তাদের এই কঠিন শ্রম-সাধনা ছিল কিন্তু আমরা কেউ পাঠ্য বইয়ের ধারে-কাছেও ছিলাম না, আমরা বাজারের নোট-গাইড এই সবের উপর নির্ভর করতাম। কে কতটা বড়, নানা গাইড অনুসরণ করে প্রশ্ন উত্তর লিখতে পেরেছি তা ছিল আসল কথা।
জীবনবোধ, দেখে শিখা, নিজে কিছু আবিষ্কার বা তৈরি করার পরিবেশ তখন শিক্ষার ধারে কাছেও ছিল না। আমার এই বক্তব্যের পর তখনকার দিনের শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত মানুষগুলো হয়ত বলবেন, এখন পড়াতে কিছু নাই তখনই ভাল ছিল। কিন্তু মনে করতে হবে এটি জানার ভুল। গাইউ বই প্রণেতাদের দেখিয়ে দেয়া পথটি অনুসরণ করেই আমরা আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ করতাম। আমার খুব মনে আছে, অনার্স ক্লাসে চকবাজারের একটি ফটোকপির দোকানে আমরা আগের ব্যাচের বড়ভাইদের নোট সংগ্রহের জন্য লাইন ধরতাম। আর ঐ নোটগুলো এনে নিজেরা একটু পরিবর্তন করে অনার্স ক্লাসে ন্যূনতম ২য় বিভাগ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে যেতাম। শিক্ষকরাও নোট কারটা কত বড় ও শক্তিশালী হয়েছে তার উপর নির্ভ করে নম্বর দিয়েছেন। আমরাও তা অপকটে মুখস্থ করেছি। ব্রিটিশ আমল থেকে এভাবে চলেছে। এখানে শিক্ষার্থীর মেধা, মনন, আবিষ্কারের দক্ষতার পরীক্ষা হত না, পরীক্ষা হত মুখস্থ করার ক্ষমতার। এই প্রবণতা এখন অন্যরকম দাঁড়িয়েছে পেতে হবে এ+।
তাহলে এবার দেখতে চাই শিক্ষক কারা? শিক্ষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করবেন-শিক্ষককের মন মানস দিয়ে। আর এই কাজটি যিনি নিজ দায়িত্বে করবেন তাঁকে আদর্শ শিক্ষক বলা হবে।’ শিক্ষার্থীর প্রতিভা জাগ্রত করার এই মহান কাজটি শুধু তিনিই করতে পারেন যিনি শিল্পী। শিল্পীর মন ও মানস না থাকলে কখনও এই কাজটি করা সম্ভব নয়। অথচ শিক্ষককে বলা হয় ‘কারিগর’। একজন কারিগর আর একজন শিল্পীর তফাৎ বুঝার সময় এসে গেছে। শিক্ষক কারিগর এই কথা সনাতন। শিক্ষকরা শিল্পী এই কথাই যথার্থ-যুপোযোগী। সুতরাং শিল্পীর বোধ ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন তাঁকে বলা হবে শিক্ষক। আর যিনি এই কাজটি করতে ব্যর্থ হবেন তাকে শিক্ষার্থী গ্রহণ করবে না, প্রকৃত পক্ষে তিনি কারিগর-শিল্পী নন।
(চলবে)

Advertisement