আধুনিক চিত্রকলায় নাজলী লায়লা মনসুর

শিবলু শফি

শুক্রবার , ২ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
51

বাংলাদেশের সার্বিক পারিবারিক, লৈঙ্গিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনীতি ও ধর্মান্ধ বাস্তবতার নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবিসহ অন্যরকম এক জার্নি;- আমরা দেখি শিল্পী মূলত শহুরে মধ্যবিত্তের সংবেদনশীল শিল্পমনন-চোখে বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। তাই শিল্পী নাজলী লায়লার ক্যানভাসে শহুরে জনতার আউটডোর’ ও ইনডোর’ বাস্তবতার পাশাপাশি এসেছে দৈনন্দিন জীবন-যাপনের খুঁটিনাটি অনেক অনুষঙ্গ । এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানুষের বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরের ভাষা বিশেষ করে মধ্য ও নিম্ন বিত্তের উঠা, বসা, দাঁড়ানো, চলাফেরার ভঙ্গী, বিশ্রাম নেওয়ার কায়দা, আবার সব চরিত্রেরই যেন উদাসীনতা আর সংবেদনহারা নিছকই এক একটি চরিত্র। যেন চারপাশে সংগঠিত হওয়া পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্ক্যাম’গুলোর মাঝে শহুরে মানুষগুলোর চরম হতাশার এই এক টিকে থাকা। এতে ৯০’ দশকের দিক থেকে বাংলাদেশের পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রের একইসাথে বেড়ে উঠার সম্মিলিত ও নিউক্লিয়াস প্রতিচ্ছবি তথ্যচিত্রিত হয়। শুধু তাই নয়, নিজেকে যেমন শিল্পী ফোর্স’করে ছড়িয়ে দিয়েছেন ক্যনভাসের অন্যান্য চরিত্র বা অনুষঙ্গের মাঝে তেমনি অনেকটা সৎ ও সমসাময়িকতার সরল প্রেক্ষাপটে রূপান্তর ও বিনির্মাণ ঘটেছে ঐ শিল্প-চিত্রের নব্য বিষয়বস্তু ও ভাষা। মজার ব্যাপার হচ্ছে শিল্পী সেখানেই থেমে থাকেনি; তার সমস্ত মানবিক বিবেক, বোধ আর অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি লড়ছেন। একে একে পরিবার, নগর ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করা ঘুণ- পোকাগুলোকে উন্মোচন বা চাক্ষুস করে তুলছেন। দেখা গেলো তাতে একটি পুরুষবাদী সমাজ ব্যবস্থার পরিবারের ভেতরে যেমন সংকটাপন্ন অবস্থা তেমনি নগর ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটেও চরম বিশৃঙ্খলতার বায়োস্কোপিক ইমেজ’ গ্রন্থণা চলছে। আমাদের মানবিক ও নাগরিক সময়গুলো’কে কে বা কারা রীতিমতো ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে একের পর এক চিত্রপটে এসেছে শিল্পীর নিজের ও পরিবারের অন্দরমহলের খণ্ডচিত্র আর সিনারিও। বিরূপ পরিবেশে প্রেম-স্নেহ,-মমতা, আত্মীয়তা, বিষণ্নতা, ভোগ-উপভোগ, চরম বৈষম্য, বিপন্নতা, বৈপরীত্য, উন্মত্ততা, কদর্যতা, আহত পোড়া-দগ্ধতা, হিংস্রতা, অশ্লীলতা, ধর্মান্ধতা, যুদ্ধ আর চারপাশের পরিবেশের ডিটেল’ বাস্তবতাকে তুলে ধরতে ধরতে দারুণ এক লৈঙ্গিক ফিকশন ছড়িয়ে গড়ে তোলেন শিল্পীর আপন পিকটোরিয়্যাল সারফেস’ বা চিত্রতলের বহি-বুনন।
শিল্পীর অনেক চিত্রপ্লটে কাক ও বিড়াল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে। শহুরে মধ্যবিত্তের নাগরিক পাখি-‘কাক’, আর পারিবারিক কক্ষে একঘেঁয়েমীতায় বিষণ্ন ‘বিড়াল’। সেইসব চিত্রপটের ডিটেল’ আবহ সৃষ্টিতে কাক ও বিড়াল ক্লাস-ফিকশনে’ অদ্ভুত প্যারালাল চরিত্র হয়ে এসেছে। এই প্রাণীগুলোই যেন এই টোটাল চরম বৈরি ও নট-নাগরিক পটে সময়ের নীরব দর্শক। শুধু বিড়াল কিংবা কাক নয়, পেঁচা, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুরসহ নানান জাতের হিংস্র বন্যপ্রাণী-শিল্পী নাজলীর ক্যানভাস কক্ষে কখনো কখনো মানুষের প্রতীক কিংবা রূপকে রূপান্তরিত ফর্মে’ আগ্রাসন, বর্বরতা ও নাটকীয় ফিকশনের অভিনব ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে চলেছে । আনটলারেবল’, ক্ষুব্ধ ও ক্রুব্ধ ইমেজ’-আমেজ নিদারুণভাবে সচেতন করে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের । যেন পুরো রাষ্ট্র ও ধর্ম মিলে চাপিয়ে দেয়া এক বিরূপ পরিস্থিতিতে ক্রমেই শিকার হয়ে চলেছে আমাদের বেঁচে থাকার নির্মল নিসর্গ পরিবেশ ও নতুন প্রজন্ম । বর্তমান ও বাস্তবতার ফিউশন ঘটিয়ে তিনি অভিনব কিছু রূপান্তরের ভেতর দিয়ে টেনে নেন এক স্থবির প্যারালাল’ বোধ ও অনুভবের চূড়ান্ত দিকে। সেখানেই দাঁড়িয়ে যায় দেশ, নগর কিংবা মানুষ মানবতার ভিন্ন ভিন্ন কিছু তথাকথিত নাগরিক শিল্প আখ্যান ।
পশ্চিমা ফিগারেটিভ চিত্রকলা চর্চার প্ল্যাটফর্মে – মার্ক শাগাল, গঁগ্যা, পাবলো পিকাসো’র মতো বিশ্বনন্দিত চিত্র-কারিগরদের শিল্প অনুপ্রেরণা আবার অন্যদিকে সহজাত ভঙ্গীতে স্টিল’ নড়াচড়ার উপায় নেই এমন চেয়ারে বসে থাকা শিল্পী ফ্রিদা কাহলো ‘ হৃদপিণ্ড ও মানব শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গকে শরীরের বাইরে এনে আস্ত সেলাই করে দিতেন মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গের সাথে। এতে শিল্পীর এঙিডেন্ট’ উত্তর শরীর তথা বাস্তব জীবনের উপর বয়ে যাওয়া কষ্ট ও যন্ত্রণার ঝড় আর মনের উপর আসা আঘাত ও ক্ষোভের ঝড় পুরোটাই যেন উগলে দিয়েছেন তাঁর পিকটোরিয়্যাল সারফেসে’। পুরো বিশ্ববাসী বিস্ময়চোখে দেখলো ভয়ঙ্কর শরীরী যন্ত্রণা, শিউরে উঠা আনটলারেবল’ পরিস্থিতির কারাগারে থেকেও টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অদম্য মানবিক অনুপ্রেরণা আর অভিজ্ঞতার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। সহজ করে বলতে গেলে পুরো পশ্চিমী সভ্যতার বিশ্বযুদ্ধোত্তর নারী সমাজের অন্তর্চিত্র ও লৈঙ্গিক রাজনীতির অটো-বায়োগ্রাফিক্যাল’ কথালিপি বুনেছিলেন শিল্পী ফ্রিদা কাহলো ফ্রিদা’র সেই অদম্য লৈঙ্গিকবোধ, মানবিক অনুপ্রেরণার আধার ও উৎস ভাবনার অভিঘাত পশ্চিমী বিশ্ব ছাড়িয়ে উপমহাদেশ’কেও আলোড়িত করেছিল। শুধু মহাদেশ, প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তুর ভাবনা ভিন্ন ফ্রিদা’র মতো শিল্পী স্পিরিট, ভিন্ন লৈঙ্গিক আধার হতে নিজস্বায়িত পরিবার ও রাষ্ট্রের মধ্যকার এক অদ্ভুত টানাপোড়নের অন্তর্কথন ডায়রির মতো বাংলাদেশের মধ্য-নিম্নবিত্ত শহুরেদের প্যারালাল জীবনসংগ্রামের চিত্র এঁকেছেন শিল্পী নাজলী লায়লা। একদিকে বৈরি রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় শিল্পীর আত্ম-মগ্নতার কথোপকথন, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বের ধর্ম-রাজনৈতিক সংকট ও বাস্তবতার স্ফুলিঙ্গময় পরিস্থতিগুলোকে আত্ম-জীবনীর নিরিখেই তুলে আনছেন অনেকটা রূপান্তরিত ফিকশনের ভেতর দিয়ে। একাডেমিক্যালি’ একটু দেরীতে শুরু করলেও শিল্পী রশীদ চৌধুরী ও মর্তুজা বশীরের মতো দেশবরণ্য গুণী শিল্পী ও শিক্ষকদের হাতেই শিল্পী নাজলী’র অগ্রযাত্রার শুরু। ফলে ভিত্তি প্রস্তরটাও হয়েছে অনন্য উচ্চতার। তবে তার সমসাময়িক আরো কিছু বরণ্য ও মেধাবী শিল্পী যেমন হাসি চক্রবর্তী, মনসুর উল করিম, চন্দ্রশেখর দে, এস এম আনসারী, অলকেশ ঘোষ, বণিজুল হক প্রমুখ প্রজন্ম বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা চর্চায় নানান দিক থেকে অবদান রেখেছেন। আর জাতীয়ভাবে নারী শিল্পীদের মধ্যে নাজলীসহ ফরিদা পারভিন, রোকেয়া সুলতানা, কনকচাঁপা চাকমা, দিলারা বেগম জলি প্রমুখদের নাম অগ্রগণ্য ।
৯০’দশকের শুরুর দিক থেকে শিল্পী নাজলী’র যাত্রা শুরু হলেও মূলত ২০০০ সাল পরবর্তী সময় থেকে একের পর এক মৌলিক শিল্পকর্মগুলো রূপ-রস ও স্বাদে, সম্পূর্ণ আলাদা মাত্রায় পরিণত রূপ লাভ করতে থাকে। শিল্পী নাজলীর শিল্পকর্মগুলোকে আমরা কয়েকটি ধাপে বিশ্লেষণ এগিয়ে নিতে পারি । পর্ব-১). শহুরে আউটডোর- ইনডোর’ জনজীবন ও পরিবার, প্রেম বনাম রাজনীতি ও রাষ্ট্র : নাজলীর নিজস্ব শিল্প চর্চার ভিত্তিভূমি রচিত হতে শুরু করে মূলত এ পর্বেই। যা ছিল মূলত স্বৈরাচার ও স্বৈরাচার পরবর্তী বাংলাদেশের হিংসাত্মক রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুমাত্রিক গণ-প্রতিচ্ছবি। ৮০’র দশকের শেষ দিকে “লাইফ এজ্‌ ইট ইজ “মতো স্টাডি বেই্‌জড’ শিল্পকর্ম দিয়েই নাজলীর সমসাময়িক পরিবেশ,পরিস্থিতি কিংবা ‘প্রতিচ্ছবির বিস্তারিত দৃশ্যায়ন’ বিনির্মিত হওয়া শুরু করে। পরিবেশ ও প্রতিচ্ছবির অন্তঃস্রোত ধরে একই চরিত্র বা মুহূর্তের গহবরে গড়ে উঠে বৈচিত্র্যময় রূপকীয় এক গীতল বয়ান। অন্যদিকে রঙ আর কম্পোজিশনের’ বুননকলায় এর ভেতর বাহিরের গভীর সংযোগ অনন্যতর এক সময়োত্তীর্ণ মাত্রায় উন্নীত হয় । ৯২’তে “ঈৎড় িড়হ ঃযব জরপশংযধ“ি শীর্ষক চিত্রকর্মে পুনরারোপণের ভেতর দিয়ে ৯৯’তে “জড়ড়ভ ঝঃড়ৎরবং “ মতো প্রথম দিগ নির্দেশিত চিত্রকর্মে মধ্য ও নিম্ন বিত্তের চরম পারিবারিক বৈষম্যের হাল-হকিকত তুলে আনেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিষয় বস্তু ও পারিপার্শ্বিক অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিজের পরিবার’কেই। শিল্পী পরিবারকেই তুলে এনেছেন পিক্টোরিয়্যাল সারফেসের’ কেন্দ্রীয় চরিত্রে; কিন্তু তারাই মূলত প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্তের এক একটি পারিবারিক বাস্তবতার অন্দর প্রতিচ্ছবি। এই চিত্রে আমরা দেখি নিম্ন-বিত্ত শ্রেণির বাসার কাজের মেয়েটি শুকনো হাসিমুখে বাচ্চা কোলে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আর অন্য দুই ছাদে প্রেমিক-প্রেমিকা প্রেমে ব্যস্ত। এই চিত্রকর্মের সবচেয়ে সিগনিফিক্যান্ট ফ্যাক্ট’ হচ্ছে বাচ্চা নিয়ে কাজের মেয়েটির দাঁড়িয়ে থাকার ধরণে – একই পারিবারিক পরিস্থিতিতে দুই বিশেষ শ্রেণির তুলনামূলক বাস্তবতা । তবে শিল্পীর এই অনুধাবন ও পর্যবেক্ষণে কলোনিয়্যাল সাইকি’রও আভাষ মেলে।
২০০২’ এ দিকের আরেকটি চিত্রকর্ম হচ্ছে “ঙহ ঞযব জড়ড়ভচ । রঙ, ভাষা ও গল্পের সমন্বয়ে আলোছায়ার বাস্তবতায় উত্থাপন এই পেইন্টিংসের মূল উৎস পরিবেশ ও পরিস্থিতির সারবস্তু। ২০০৫-এ করা “ঙহ ঞযব ইবফ ঈঁৎঃধরহচ শীর্ষক চিত্রকর্মটিতে মূলতঃ মধ্যবিত্ত নগর পরিবারটির চলমান জীবনের একঘেঁয়ে যৌথ খণ্ডচিত্রগুলো বিছানার চাদরে প্রতিচিত্রিত হয়েছে এক অনবদ্য রূপান্তরিত ফর্মে। স্পর্শকাতর বাস্তবতা, শিল্প বনাম পরিস্থিতির এক ত্রিমুখী ফিকশন’ চিত্রকর্মগুলোকে অনন্য মর্যাদায় উচ্চকিত করে তোলে। ২০০৮-এ ক্রস-রোমান্টিক’ পরিসর নিয়ে “হঠাৎ হাওয়া”, “লাভ এ্যান্ড ভালচার”, “লাভার্স এন্ড ডেডফিশ”, ও “তালাশ “ -এর মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্রস-রোমান্টিক ফ্যাক্ট’গুলোতে শিল্পীর গভীর ব্যক্তি জীবন নিরিখ থেকেই বয়ান করে চলেছেন – চরমবৈরী নাগরিক বাস্তবতার ডিলেমা। অসংখ্য মরা মাছ ভাসছে কাছের ডাঙ্গায়, এই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি একদল নাগরিক ও আরেক দল প্রাকৃত (বক) একদিকে নির্জন নৌকায় প্রেমিকযুগল পাশাপাশি প্রেম-ভাইব্রেশন’হীন অন্যদিকে বক’ও তার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এ বিকারগ্রস্ত সমাজ-বাস্তব পরিস্থিতি থেকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি-জাতীয়তাবাদী শিল্প-মননবোধের আঁচড় সেখানে ঘুম আর জাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে অন্যরকম আবেদন সৃষ্টি করে “লাভার্স এন্ড ডেড ফিশ” চিত্রকর্মটি। তবে তালাশ/২০০৮’ চিত্রকর্মটি এ ধারায় সবচেয়ে সংবেদনশীল ও প্রতিনিধিত্বমূলক। বিশেষ করে লোককাহিনীগুলোকেও কন্টেম্পোরারি ভিজুয়াল ফর্মে’ রূপান্তর ঘটান অন্যদিকে যেখানে কোনো না কোনো নারী আদলের ভেতর সমগ্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবিই যেন ডিসকোর্স’ করে যাচ্ছেন। মাথায় অগ্নী-কুণ্ডলী নিয়ে নৌকার উপর তালাশ’রত স্বজন ,পাশে ডাঙ্গার জলাশয়ে জাতীয়ফুল শাপলা হাতে প্যাঁচিয়ে শাড়ি পরা এক শোয়া-ভাসমান কিশোরী। সেই তালাশের কেন্দ্রবিন্দুতেই শিল্পী ব্যক্তির অন্ত-চিত্রায়ন ফ্ল্যাশ-ব্যাকের মতো যৌথতায় দৃশ্যাবদ্ধ। যদিও শাহীন আকতারের “তালাশ” উপন্যাস অবলম্বনে অনেকটা পরিণতিহীন জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক কাহিনীর দুই বিশেষ বীরাঙ্গনা চরিত্র অবলম্বনে চিত্রকর্মটি প্রচ্ছদ হিসেবে আঁকা হয়েছিল। হ্যাঁ, ভাসমান কিংবা ডুবে যাওয়া জাতীয় ফুল হাতে সেই বীরাঙ্গনার আরেক নাম বাংলাদেশ।
২০০০,২০০২ ও ২০১০-এ ইধহফধমব ইড়হফধমব (ঈরঃু) বা ব্যান্ডেজ বন্ডেজ (নগর)” শীর্ষক নাজলীর সিরিজ চিত্রকর্মে – নগর জনপদের সার্বিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আরো ঘন ও ডিটেইল’ হওয়া শুরু করেছে। অনেক স্তরে স্যাটায়ারিক্যাল ফ্যাক্ট’ বা ব্যঙ্গাত্মক রূপকেও তিনি ছড়িয়ে পড়তে চেয়েছেন ক্যানভাস জুড়ে। সাদা ব্যান্ডেজের ঐ প্যাঁচানো রূপকে পোড়া আহত অবস্থা মনে হলেও শিল্পী সম্ভবত পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে রূপক অর্থে কিংবা নিজস্ব একাকীত্বের অন্তর্দহন তুলে ধরেছেন এইভাবেই। চরম অবক্ষয়ের মাঝে শিল্পী মূলত ব্যান্ডেজ বন্ডেজ’ চিত্রে নিজের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও ঘরহারা ভাসমান মানুষের নগর-যাপন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, নগর পরিবেশ বিপর্যয়ের বহু নেতি-চালচিত্রসহ ঘরে-বাইরের ক্ষত-আহত-মুমূর্ষু একটি চরম পতিত রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার পরিচয় উন্মোচন করছেন। এই সিরিজের চিত্রকর্মগুলোতে খুব সরলভাবে আক্রান্ত ও বিপন্ন বাস্তবতা যেমন এঁকে চলেছেন তেমনি ক্যানভাস চিত্রকলার ব্যক্তিক ও লৈঙ্গিক পারসেপশনে’ সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভাবনাঋদ্ধ শিল্পী নাজলী লায়লার চিত্র অধিজগৎ। পতিত, শ্রমজীবী নারীদের নগর-জীবন সংগ্রামের বহুমুখী চালচিত্র ও একইসাথে পরিবেশ বিপর্যয়ের নেতি প্রক্রিয়াগুলো শিল্পীর ড্রয়িংরুমের সোফাসেটে মুর্যাল’ এর মতো সুশোভিত হয়ে উঠছে “ঝরঃঃরহম ঙহ ঘধঃঁৎব-্থ১৫ “ চিত্রকর্মে। একদিকে ব্যবহার্য পণ্যের মতোই সোফা, বেডে-কভার কিংবা জানালার পর্দায় নিজের চিত্র-চরিত্রগুলোকে স্যাটায়ার রূপে নিয়ে এসেছেন, অন্যদিকে প্রকৃতি ও বনের রাজ্যে বসবাসকারী হিংস্র জন্তু-জানোয়ারেরা আজকাল তাদের টিকে থাকার স্বীয় পরিবেশ হারিয়ে যেন শো-পিস’ হিসেবে উঠে আসছে নগর ও পরিবারের অন্দরমহলে। কোথাও দেখা যাচ্ছে শিল্পীর পেইন্টিংসের বিশেষ চরিত্র ও বিষয় বস্তু ব্যবহার্য বিছানা চাদর, পর্দা, সোফা ও অন্যান্য ফার্নিচারে’ পুনরারোপিত হচ্ছে। এখানে সমসাময়িক রূপান্তর ও কসমোপলিটন’ প্রবণতা স্তরে স্তরে নাটকীয় টুয়িস্টিং’ ঘটায়। তাছাড়া দুই বিশেষ বাস্তবতা একইসাথে খেলে যায় আমাদের মনন-চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তির সাথে। ড্রয়িং রুমের সোফাসেটে পশুগুলোই হয়তো কসমোপলিটন পুরুষবাদের নির্মম চিত্র। শিল্পী নিজেই যেন এই উদ্ভট পরিস্থিতির আবর্তে শিকার ও ম্রিয়মান প্রতিচ্ছায়া। “ঁংধনষব চধরহঃরহম ( উরহরহম ঞধনষব)-০৯ “ চিত্রকর্মটি প্রকৃতি বনাম বৌদ্ধিক মনন ও বাস্তবতার এক করুণ নিদর্শন। প্রেক্ষাপট নগর ডাইনিং-এ উঠে আসছে প্রকৃতি ভোজনের অনন্যসব আত্মবিধ্বংসী চালচিত্র। ভোজের সেই খাবার টেবিলের সারফেস বা চাদর মূলত ঘাসের মাঠ, প্রকৃতি ও করাৎ বিধ্বংসের নির্মম তথ্যচিত্রের পাশাপাশি গলাকাটা হরিণ, বিলুপ্তির পথে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাদা গাভী ও অন্যদিকে চেয়ারে বসা শান্তির প্রতীকায়িত বুদ্ধ, পুণ্যায়িত করার আলোকদানী, প্রার্থনারত এঞ্জেল- তারই পাশে মুখোমুখি নারী ও পুরুষ। খাবারের প্লেটে ছুরি চামচ নিয়ে অপেক্ষারত পুরুষ অন্যদিকে নারীটি সাদা-গাভীটির সাথেই যেন অন্তরঙ্গ আলাপরত। এতে পরিবারের নারীটিও ডাইনিং’য়ে অন্যান্য ভোগ্য খাবারের মতোই উপস্থাপিত। আধুনিক চিত্রকলার নানান ধারনাগত ফর্ম ও অবজেক্ট’’ গুলোর সাথে মধ্যবিত্ত চরিত্র ও পারিবারিক বাস্তবতার অভিনব সমন্বয়ে “ডাইনিং টেবল” চিত্রকর্মটি পরিবেশবাদী ধারায় সবচেয়ে বৌদ্ধিক ভাবনা ঋদ্ধ ।
২০০২-এ “খঁরং কযধহং উৎবধস (এরৎষ)চ শীর্ষক চিত্রকর্মে সমসাময়িক বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও তার আইনী বাস্তবতার ভর-কেন্দ্রে, শিশু-কিশোরীদের উপর এ নগর-জনপদের যৌন সহিংসতার এক ভয়াল পটভূমি তুলে এনেছেন। জাতীয় সংসদ ভবনের লেক জলে চরম আতংকে ঝাঁপ দিতে যাওয়া এক কিশোরী পেছনে দল বেধে পুরুষরূপী ধর্ষোন্মত্ত হায়েনারা কিশোরীর পিছু ধাওয়া করছে। এ ধারার অন্যান্য সিরিজ’ চিত্রকর্মগুলোতেও নারী ও শিশুর উপর পুরুষবাদী সমাজ ব্যবস্থায় যৌন সহিংসতার নানান প্রেক্ষাপট মূর্তায়িত হয়ে উঠেছে। আর জাতীয় সংসদ ভবনের চারপাশে ঘটিত এই সহিংসচিত্র কলঙ্কিত করে তোলে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে;-এক্ষেত্রে শিল্পীর আঘাত সরাসরি মূলকেন্দ্রে। এছাড়া ‘কেশবতী কন্যার চুল ধরে স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদে প্রবেশ করছে অগণতন্ত্রের চোরাই পথে, এমন হটেনথট’ চিত্রেরও প্রতিফলন দেখি আমরা এই সিরিজে’। ক্যানভাস চিত্রকলা চর্চায় তিনি সর্বদা ব্যক্তিক, সুতীক্ষ্ণ আর তির্যক ঘটনা-রাজনীতি প্রবণ বিষয়বস্তুগুলোকে উপজীব্য করেই এগিয়ে গেছেন। স্বৈরাচার পরবর্তী ৯০’র দশকে গণ আন্দোলনগুলোর গতি-প্রকৃতিতে অনেক পরিবর্তন আসলেও সেই ঝাঁজ, হাওয়া, আবহ শিল্পী নাজলীর চিত্রকর্মকে প্রভাবিত করে এখনো। ভারতে বুদ্ধের জাতক গল্প ও মিথলজির ‘অজন্তা’র গুহা চিত্রাবলী ও মোগল মিনিয়েচারের’ বর্ণনানাত্মক ডিটেইল’, অনেকটা ইতিবাচকভাবেই শিল্পীর চিত্রতলে এনে দিয়েছে অনবদ্য ইতিহাস সমৃদ্ধ উপাদানের নতুন মাত্রা। ফলে বিচিত্র ঐতিহাসিক উপাদান ও সমকালীন শিল্প-বুনন এ দুয়ের সমন্বয়ে চিত্রকর্মগুলো বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার ধারায় দুর্লভ ডকুমেন্ট’ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। আর তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ক্ষমতার রাজনীতি চর্চার প্রেক্ষাপটে একইসাথে ব্যক্তিক ও বুদ্ধিভিত্তিক ক্যানভাস চিত্রকলা চর্চায় যারা সেই সময়ে সবচেয়ে অগ্রগণ্য শিল্পী নাজলী তাদের মধ্যে অন্যতম।
২০১০-এর দিকে “অদ্ভুত উট” শীর্ষক চিত্রকর্মে অনেকটা নতুন মাত্রার প্রেক্ষাপট নিয়ে আসেন, এখানে আবার ধর্ম-রাজনীতির আরেক মেরু ও মেরুকরণ এই দুই অভিঘাতকেই মূলত উত্থাপন করেন বধ্যভূমী, স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার- ল্যান্ডমার্ক’ আর তারই মৃত্তিকাসম শ্যামল সবুজ বাংলার প্রান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নেকাব পরা এক অদ্ভুত আরব্য উট। বাংলার সব সবুজ, চেতনা ও বাংলা সংস্কৃতির উপর বিজাতীয় উদ্ভট চাপানো আরব্য সংস্কৃতির লু-হাওয়ার প্রতীক ঐ ভায়োলেটেড’-উট। হয়তো কবি শামসুর রাহমানের “উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ” কবিতার অনুপ্রেরণায়; বাংলার নারীর প্রতীক হয়ে জাতীয় ফুল শাপলা হাতে নারী সওয়ারী’ (স্বদেশ) নির্জীব চিত্তে উটের উপর বসে আছে । সবদিক দিয়েই বাংলার সাথে বেমানান ঐ উট আর যাত্রীর দিকে তাকালে বুঝা যায় বাংলার সমকালীন সংস্কৃতিতে উদ্ভট আরব্য সংস্কৃতির প্রভাব। শুধু তাই নয়, সেই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যায় আরবদেশ সৌদিতে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের যৌন-দাসী হিসেবে ব্যবহার করার সংবাদ শিরোনাম হওয়া ঘটনাগুলোই সম্ভবত শিল্পীর মনে দাগ কেটেছিল। সেই অদ্ভুত উটের উপর অবৈধ খেলার জকি’ হিসেবে তিনি বাংলার নারীদের প্রতীকায়িতভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলা সংস্কৃতির উপর আরোপিত আরব্য ধর্মের সাথে যৌন সহিংসতার ওতপ্রোত চিত্র নাটকীয় আখ্যান হয়ে ধরা দিয়েছে এ চিত্রকর্মে।
“ইরৎঃয ড়ভ ঋৎববফড়স/১৩” নামক চিত্রকর্মটি মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সৃষ্টি লগ্নের এক অবিস্মরণীয় চেতনা, মনন ও বাস্তবতাকে ঘিরেই। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভুমিষ্ট তথা মাতৃকোড়ের শিশুটি; চারদিকে ঘিরে থাকা হায়েনারূপী রক্তপায়ী জন্তুগুলোর শ্যেণ দৃষ্টি ঐ শিশু ও নারীর দিকে। হায়েনা অধিকৃত তবুও মাতৃকোড় পরম মমতায় রক্ষা করে চলেছে অজস্র জাতীয় ফুলের সিম্বলে আঁকা শিশুটি – এই শিশুটিই বাংলাদেশ নয়কি! রায়ের বাজার বধ্যভূমীর সেই গণহত্যার বিভীষিকাময় বাস্তবতাকে ব্যাকগ্রাউন্ড করে উৎপীড়ন, নির্যাতনের এক আক্রোশি চক্করে মা রূপী শিল্পী পরম মমতায় রক্ষা করে চলেছে ফুল্য-শিশুটিকে। এখানে পুরো রাষ্ট্রের ধর্ম ও রাজনৈতিক দাবানলটা মায়ের শরীরের উপর দিয়েই যেন বয়ে চলেছে। মা-সেখানে সদ্যজাত রাষ্ট্ররূপী সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার আধার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মা কিংবা শিল্পী একাকার হয়ে মিশে গেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির উন্মেষলগ্নের স্যাক্রিফাইস’ ও সংগ্রামী ইতিহাসের সাথে। ঘোর এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার অবিমিশ্র প্রলেপে, সিনিক টোন’- বাংলার নগর ও জনপদের অন্তপুরের কাহিনী-কলা’কেই আবাহন কিংবা মেলে ধরেছেন।
২০১৫’র দিক থেকে শিল্পীর চিত্রতল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দু-পর্বে আমরা দেখি এগিয়ে যেতে। এর একদিকে দেশের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক দাঙ্গা ও অগ্নী-সন্ত্রাস’কাল আরেকদিকে মধ্য-প্রাচ্যের কিছূ আরব দেশ নব্য গণতন্ত্রের বাসন্তী হাওয়ায় উদ্বেলিত হয়ে পড়েছিল যেটি সাম্প্রতিকালের বিশ্ব ইতিহাসে “এ্যারাব স্প্রিং” বা আরব-বসন্ত নামেই খ্যাত। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্র ফেরানোর ঐ মুভমেন্ট’ আদৌও সফল হতে পারেনি। ঘটনাটির ব্যাকগ্রাউন্ড’ বাস্তবতা ছিল রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের বর্বর নিষ্পেষনের বিষ-বাষ্পে মধ্যপ্রাচ্যের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাস্তবতার নিকষ গহ্‌ব্বর থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই প্রজন্মটি হঠাৎ আলোর ঝলকের মতো গণতন্ত্রে ফিরতে চেয়েছিল। শিল্পী তখন বিশেষ সভ্যতার অগ্রদূত হয়ে ; প্রকৃতির অমোঘ বন্ধনীতে বাঘের সাথে হরিণের, সাপের সাথে ব্যাঙের, কুমিরের সাথে গরুর, প্যাঁচার সাথে ইঁদুরের অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সেই চরম অনুপ্রেরণাবাহী মার; শিল্পী “ল্‌ অব নেচার” থেকেই মূলতঃ হিংস্র প্রাণীর হঠাৎ উল্টো শিকারের হাতে মার খাওয়ার রূপকী‘ অবয়বে পুরুষ নিয়ন্ত্রিত ধর্ম ও মানব সভ্যতার কালো-কাহন বয়ান করে গেলেন। আর “প্রে এন্ড প্রিডেটর” সিরিজ’ চিত্রকর্মগুলোতে হিংস্র জীব-জন্তুর রূপকী-রূপান্তরে, শিকারের হঠাৎ আক্রমণে হিংস্র শিকারীর উল্টো কুপোকাতের নাটকীয় পরিস্থিতি’কে তুলে এনেছেন। অন্যদিকে সেই সময়ে বাংলার নগর-রাজপথ জুড়ে একের পর এক ঘটে চলেছিল যাত্রীবাহী চলন্ত বাসে কিংবা গাড়িতে ‘অগ্নী-সন্ত্রাসে’র নামে জীবন্ত মানুষ পুড়ে মারার চরম মানব-অবক্ষয়ী নেতি রাজনৈতিক খেল; কৌতুহলময় সিনেমেটিক ফিকশনে’ রূপান্তর ঘটিয়েছেন “অগ্নীযান/১৫ “নামক সেই চিত্রকর্মে। যাত্রীশুদ্ধ বাস জ্বলছে, পুড়ছে মানুষ অকাতরে; বাসের হেলপার সারা শরীর ব্যান্ডেজে পোড়া আহত, দগ্ধ যাত্রীদের সেই জ্বলন্ত বাসে ডাকছে। ঘটনার অন্তরালের ঘটনা, অভিনব টুয়িস্টিং; অপরদিকে ফুল বিক্রেতার ছদ্মবেশে ফুলের ঝুড়ির তলায় লুকিয়ে রাখা ‘পেট্রোল বোমা ও গ্রেনেড হাতে দাঁড়িয়ে আছে দুই কিশোরী বালিকা। হয়তো শিল্পী স্বয়ং ও ঐ ইনোসেন্ট’ কিশোরীদ্বয় রাজনৈতিক সহিংসতার মৃত্যুদূত ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে আছে। সমাজে এরা পবিত্রতা ও ধার্মিকতার ছদ্মবেশে থাকে বলেই স্বয়ং শিল্পীর কাছেও যেমন উন্মোচিত নয় ওদের স্বরূপ, তেমনি নাগরিকদের কাছেও তারা অদৃশ্য ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আসল কথা হলো, সেই যাত্রীসমেত জ্বলন্ত ও অঙ্গার প্রবণ বাস’টি আসলে সমসাময়িক বাংলাদেশ; ওৎ পেতে থাকা চরম হিংসা ও বিদ্বেষে আক্রান্ত, পোড়া ও দগ্ধতার চরম বর্বর এক রাজনৈতিক আতঙ্কবাদ। সেই অদৃশ্য অশুভ শক্তি আপাতত পিছু হটলেও রক্তে ঘুণে পোকার মতোই লুকিয়ে তাদের বাস। এই ঘুণ-পোকাময় রাষ্ট্রের সমাজচিত্র দৃশ্যায়নে শিল্পীর সাধনা ও মৌলিকত্ব অন্য-মাত্রায় উচ্চকিত হয়ে উঠেছে।
একজন সৎ মানুষ হিসেবে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি এ চিত্র-যাত্রায় শিল্পী নাজলী অভিজ্ঞতা, ঋদ্ধতা ও লৈঙ্গিক অনুসন্ধিৎসার বহুমাত্রিক পর্যায়গুলোকে একত্রিত করে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বিষয় ও ভাবনার অভিনব অভিব্যক্তি ও চিত্রকল্প; যেখানে শিল্পীর সাথে আপামর দর্শকের “সব কিছু খুলে দেখানোর” সংযোগ স্থাপন প্যারালাল’ হয়ে উঠে। তবে টিপিক্যাল নগর মধ্য-বিত্তের ঘরে-বাইরের বিষন্নতা, জটিলতা, ডিটেল ইমোশান ও সেলিব্রেশান’গুলোকে ছুঁতে গিয়ে অধুনা-বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আরেক নাগরিক ধারার খোঁজে তিনি মগ্ন হয়ে ছিলেন হয়তো। এ অঞ্চলের নেশনস্‌ ইন্ডিভিজুয়্যাল’ (এ অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ’ )-এর পিছু নিতে গিয়ে শিল্পী এষণা বৃহদর্থে আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিকতা ও একটা নির্দিষ্ট প্রজন্ম তথা বিশেষ শ্রেণির উপর ভর করায় কখনো কখনো তা লিমিটেড’ তথা আপন কক্ষপথের বাইরে আঁচড় কাটতে প্রায়ই অক্ষম। তবে চিত্রশিল্পে সুশীল ও বুদ্ধিভিত্তিক নব্য (প্রগতির) জাতীয়তাবাদ চর্চার ধারাবাহিকতা কতটুকু ফলপ্রসূ সেটা আলোচনার সময় হয়তো এখনো হয়নি। কারণ সেই প্রজন্মটি বর্তমানে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, শিল্প ও সাহিত্যের মূল ধারায় সবচেয়ে অগ্রণী ও প্রগতিশীলতার ধারায় অনন্যতর প্রভাববিস্তারী ও প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকায় রয়েছে। তাছাড়া নাজলীর বেশিরভাগ চিত্রকর্মের কেন্দ্রিয় চরিত্রে শিল্পী নিজে ভিকটিম কিংবা সহিংসতার রূপকে উ পস্থিতি জানান দিয়ে যায়। এতে বিচিত্র সময়ের ব্যবধানে লৈঙ্গিক ডিসকোর্স’ কোনো ক্ষেত্রে স্ববিরোধীতায় মেতে উঠলেও নগর মধ্যবিত্তের বৌদ্ধিক ও পলিটিক্যাল ডিসকোর্স আবার এ নতুন পথের দিশারী হয়ে উঠে। এক কথায় অসাধারণ ডেডিকেশন’ ও সমসাময়িক এ শিল্প অগ্রযাত্রায় পরিণত শিল্পী নাজলী লায়লা বাংলাদেশের আধুনিকতর চিত্রকলা চর্চার ধারায় (ব্যক্তিক/ লৈঙ্গিক ও রাষ্ট্রের সার্বিক বাস্তবতার)- অত্যন্ত মূল্যবান এই পর্বের পাইওনিয়্যার’ হিসেবে স্ব-মহিমায় আসীন থাকবেন আশারাখি।
বর্তমানে ঢাকা কলা-কেন্দ্রের অন্যতম কর্ণধার শিল্পী ওয়াকিল আহমেদের কিউরেটিং’ দক্ষতায় দেরিতে হলেও নাজলীর এ ৬ষ্ঠ একক প্রদর্শনী চট্টগ্রামে সাড়া ফেলেছে। বৈচিত্রময় ও বহুমাত্রিক পশ্চিমী শিল্প মিডিয়া’র ভিড়ে ম্রিয়মান হয়ে পড়া ক্যানভাস চিত্রকলা চর্চার ধারাবাহিকতায় যেন নতুন রূপে প্রাণ সঞ্চার করেন শিল্পী নাজলী লায়লা। ডকুমেন্টারি’ ধারার এক একটি ডিটেল’ চিত্রকর্ম শিল্পীর হাত ধরে বিনির্মাণ হয়ে উঠতে;- কতো খসড়া ড্রয়িং, ভাবনা ও ভাষার নান্দীপাঠ দাড়িয়ে যায়। শিল্পীর সেইসব প্রোডাকশন’ বা চিন্তন প্রক্রিয়ার খসড়া ড্রয়িং’গুলো ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে গড়ে তুলেছেন মৌলিক চিত্র প্রকল্পটি। এতে একইসাথে ধরা দিয়েছে মূল শিল্পকর্মগুলোর বিনির্মিত হওয়ার পেছনের ইতিহাস; যেটি নাজলীর চিত্রকলা চর্চার আরেক অভিনব অভ্যুদয়। সমকালীন ভাবনার উপস্থাপনী আইডিয়া’ ও কিউরেটিং’য়ের সফল সমন্বয়ে শিল্পী নাজলী লায়লা’র এ টোটাল’-প্রদর্শনীটি সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসে মাইল-ফলক চিত্র প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এবং নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার চর্চার ইতিহাসে একে বিশেষ “নাজলী চিত্রায়ণ” ধারা নামে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। কারণ প্রথমতঃ সেই সময় থেকেই তিনি নারী চিত্রশিল্পী হিসেবে যেমন দুর্লভদের একজন উপরন্তু একজন নারী শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রশিল্পে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির নাগরিক, ঐতিহাসিক কিংবা রাজনৈতিক নব-নির্মাণ অনেকক্ষেত্রেই অব্যর্থ ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে দেখা যায়। চট্টগ্রাম চারুকলা ইন্সস্টিটিউটে’র শিল্পী রশীদ চৌধুরী গ্যালারি’তে শিল্পী নাজলী লায়লার এ প্রদর্শনী, – উপস্থাপনী নিরীক্ষা কিংবা ব্যক্তিক ও রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতাকে উপজীব্য করে বৈচিত্রময় সজীব ও করুণ নগর বাংলার জনারণ্যে ধাবমান । সফল হউক শিল্পী নাজলী লায়লা’র এ চিত্র অভিযাত্রা

x