আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লাঙ্গল

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ২০ মে, ২০১৯ at ৪:২৩ পূর্বাহ্ণ
35

সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা, সোনালী উষায় সোনামুখ তার আমার নয়ন ভরি, লাঙ্গল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি। গ্রাম বাংলার এক সময়কার ঐতিহ্যবাহি নিদর্শন লাঙ্গল নিয়ে কবি জসীম উদ্‌দীনের আবেগঘন এ লেখায় প্রমাণ মিলে এর জনপ্রিয়তার। এক সময় চাষাবাদের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ছিল লাঙ্গল। কিন্তু সময়ের আবর্তে চাষাবাদে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের নিদর্শন হাল বা লাঙ্গল।
জানা যায়, ‘’হাল’ বা লাঙ্গল এক ধরনের যন্ত্র যা সাধারণত কৃষি কাজে ব্যবহার করা হয়। বীজ বপন অথবা চারা রোপণের জন্য জমির মাটি তৈরি করবার ক্ষেত্রে হাল ব্যবহার করা হয়। কৃষি কাজের জন্য ব্যবহৃত এটি অন্যতম পুরাতন যন্ত্র। এটির প্রধান কাজ হলো মাটিকে ওলট-পালট করা এবং মাটির দলাকে ভেঙ্গে দেয়া যাতে করে মাটির নিচের লেয়ারের পুষ্টিগুণ গুলো উপরে উঠে আসতে পারে এবং একই সাথে মাটির উপরের আগাছা ও ফসলের অবশিষ্টাংশ নিচে চাপা পরে জৈব সারে পরিনত হতে পারে। এটি মাটিতে বায়ু চলাচলের পরিমাণ বাড়ায় এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে।
জানা গেছে, এক সময় চাষাবাদের প্রয়োজনীয় এ হাল বা লাঙ্গল বলদ, ষাঁড়, মহিষ অথবা ঘোড়া দ্বারা পরিচালিত হতো। লাঙ্গল দিয়ে হাল-চাষ করতে কমপক্ষে একজন লোক ও একজোড়া গরু অথবা মহিষ প্রয়োজন ছিল। গরু টানা লাঙ্গলের দুটি অংশ থাকে। নিচের অংশটিকে সাধারণত হাল বা লাঙ্গল বলা হয়।আর উপরে গরু বা মহিষের ঘাড়ে লাগানো অন্য অংশটিকে জোয়াল বলা হতো। বর্তমানে আধুনিকতার সাথে সাথে হালের পরিবর্তন এসেছে। ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার টিলার দ্বারা জমি চাষ করার ক্ষেত্রেও হাল একটি গূরত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে।
চাষাবাদের অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে বয়োবৃদ্ধ কৃষক মো.শালু বলেন, লাঙ্গল এক সময় গ্রাম বাংলার চাষাবাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৃষি উপকরণ ছিল। জমি রোপণের মৌসুমে ভোর বেলায় লাঙ্গল,জুয়াল কাঁধে নিয়ে হালের গরু,মহিষ বা বলদ নিয়ে মাঠে ছুটে যেতেন কৃষকরা।
কৃষক মাথায় গামছা বেঁধে হাল জুড়ে লাঙ্গল হাতে ছুটতেন জমির এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিকতার প্রচলনে লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষাবাদে আগ্রহ কমেছে কৃষকদের। এতে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে রয়েছে ঐতিহ্যবাহি এ শিল্পটি।
সীতাকুণ্ড সমিতির সাবেক সভাপতি লায়ন গিয়াস উদ্দিন বলেন,জোড়া হালের গরু ও লাঙ্গল কাঁধে কৃষকের মাঠে ছুটে যাওয়া এবং আপনতালে গান গেয়ে জমিতে লাঙ্গল চালিয়ে চাষাবাদের সেসব দৃশ্য আজ বাস্তবে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। চাষাবাদে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহি এ শিল্পটি বিলুপ্ত প্রায়। এক সময়ের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের নিদর্শন হাল বা লাঙ্গল শিল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতই মনে হবে।

x