আদর্শলিপি

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ৫ জুন, ২০১৮ at ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
59

Everybody knows that the boat is leaking

Everybody knows that the captain lied

Everybody got this broken feeling

Like their father or their dog just died

– leonardcohen

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। পাঁচ মাস আগের কথা। এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছি, এই সময় পুলিশের একটা দল আমাদের সিএনজি থামাল। রাস্তাঘাটে তরুণ দেখলেই প্রতিনিয়ত এভাবে থামিয়ে দেয়া হয়; এতে কেউ কিছু মনে করেন না। ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছেন, তারুণ্য ভয়ংকর! অর্থাৎ এদের কোনও বিশ্বাস নেই।

যা হোক, যথেষ্ট চেকিং হল। আদবকায়দার একটা ক্লাসও হল। আমাদের জিজ্ঞেস করা হল, সালাম দিইনি কেন? তাদের দেখে পা নামাইনি কেন? ইত্যাদি, ইত্যাদি। এর ফাঁকে আমাদের মানিব্যাগ তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। খোঁজার সময় মানিব্যাগের পয়সা, কার্ড এইসব মাটিতে পড়তে লাগল। সেগুলো আবার আমাদেরই তুলতে হল! বাংলাদেশের পুলিশ সমাজ এখন রাস্তাঘাটে গাড়ি থামিয়ে ইয়াবা খুঁজতে পছন্দ করে। কী জন্য জানি না, একজন জিজ্ঞেস করল, ইয়াবা খান না?

আমি হেসে ফেললাম। হাসার অর্থ হল, এখানে ইয়াবা খুঁজলে হবে? এটা তো ইয়াবার রোড না। এরচেয়ে চট্টগ্রাম শহরের মুখে বসুন। এতোটুকু অনেস্টি তো থাকা উচিত। কোথায় কী! শেষ পর্যন্ত আমাদের ছাড়া হল। আমরা বাসায় ফিরে এলাম।

পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের কারো সাথে পরিচয় নেই। থাকলে একটা অনুরোধ করতাম। বলতাম, শুনেন, আপনাদের কলিগদের মধ্যে যারা রাস্তায় টহল দেন, তাদের হয়রানি (আভিধানিক অর্থে ডিউটি) মেনে নিতে রাজি আছি। বাংলাদেশে জন্মেছি, এই সৌভাগ্য মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু বিশ্বাস করেন অভদ্র ভাষা মেনে নিতে রাজি নেই। বাংলা ভাষার জন্য এই জাতি প্রাণ দিয়েছে। আমরা সুন্দর ব্যবহার আশা করি।

আপনারা কি প্লিজ রাস্তায় নামানোর আগে আপনাদের কমপড়াশোনা করা কলিগদের সুন্দর করে কথা বলার ওপর একটা ভাষা শিক্ষা কোর্সের ব্যবস্থা করতে পারেন না? এটা কিন্তু অন্যান্য ট্রেনিংএর মতোই জরুরি। কথাবার্তা সুন্দর হলে চেকিংএ সাহায্য করতে ভালো লাগে, সালাম দিতেও সমস্যা নেই।

সাধারণ মানুষ যুগেযুগে ক্ষমতাবানদের সালাম দিয়ে এসেছে। একসময় জমিদারদের সামনে খালি পায়ে যেতে হতো। আমরা তো তাও জুতা পরতে পারছি। খালি পায়ে থাকতে হচ্ছে না।

এই রোজার শুরুতে দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পর এরকম অভিযান এবারই প্রথম। এটা দেখে অনেকেই খুশিও হয়েছিল। যদিও সেই খুশি মুছে যেতে বেশিক্ষণ লাগে নি। মাদকবিরোধী অভিযান ক্রমেই মানুষবিরোধী অভিযানে পরিণত হয়েছে। আমাদের পত্রপত্রিকায় এসব খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়। আমরাও পড়ছি, বন্দুকযুদ্ধে নিহত অমুক ও তমুক। এই সংখ্যা একশো পেরিয়ে বহুদূর চলে গেছে।

সমস্যা হচ্ছে, এই যুদ্ধে নিহত শত্রুপক্ষের মৃতদেহের সঙ্গে অস্ত্র, ইয়াবা এসব পাওয়া গেলেও মিত্রপক্ষের কেউ আহতনিহত হচ্ছেন না (হলেও সংখ্যা কত?)। শত্রুপক্ষের সঙ্গে থাকা অস্ত্রগুলো যেনো শুধুই শোআপ, তারা হয়তো বাচ্চাদের সাথে যুদ্ধযুদ্ধ খেলার জন্য নিয়েছিল। এই পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এরকম একমুখী সাফল্যের যুদ্ধের গল্প যথেষ্ট কম।

তারপরেও, আমরা যদি সত্যিসত্যিই মাদকবিরোধী অভিযান চেয়ে থাকি, সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, যে অঞ্চল দিয়ে মাদক ঢুকছে, সেই অঞ্চলে প্রশাসনের যারা আছেন, প্রথমেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। যে কোনও পরিচ্ছন্ন অভিযান নিজের ঘর থেকে শুরু করতে হয়। না হলে অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই ক্ষেত্রে তা করা হয় নি। উল্টো, যারা নানাসময় মাদককর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছেন, তারাই অভিযান চালাচ্ছেন। কাজেই, মাদকের প্রবেশপথ বন্ধ না করে চালানো এই অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা।

এই মুহূর্তে পৌর কাউন্সিলর একরামের মৃত্যু (!) নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। সবাই কথা বলছে। এতেও যে বন্দুকযুদ্ধ থামবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। এইজন্য হয়তো আরও অনেক অডিও ক্লিপ লাগবে। একজন তো বলেই ফেলেছেন, দুএকটি ভুল হলেও হতে পারে। কথা হচ্ছে, যেই ভুলে মানুষ মারা যায়, সেটা কেমন ভুল?

মায়ের পেটে যখন একটা ভ্রূণ বড় হয়, দুই মাসে বয়সে তার হাড় হয়, তিন মাসে চামড়া, পাঁচ মাসে ফুসফুস। এত যত্নে তৈরি একটা শরীর কয়েকটা বুলেট খরচ করে মেরে ফেলার কোনও অর্থ নেই। আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যেতে পারি, কিন্তু জীবনের বিরুদ্ধে যেতে পারি না।

আরেকটা ব্যাপার, এইসব অভিযান চালানোর জন্য আরও এগারোটা মাস ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন রোজার মাসেই এই অভিযান? যেই দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সেই দেশে রোজার মাসে এতগুলো মানুষ মারা যাওয়া মানে হচ্ছে, সচেতনভাবে অনেকগুলো পরিবারের ঈদ ও ঈদের আনন্দ নষ্ট করে দেয়া। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি রোজার মাসের পবিত্রতা নষ্ট করে দেয়ার দায় নেবেন?

মনে হয় না। দেশে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকার অনেক সুবিধা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাদার অব হিউম্যানিটি বলা হয়। এখন নোবেলদৌড়ে প্রতিবারই তার নাম আসছে। মাদার অব হিউম্যানিটি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই ধরণের বন্দুকযুদ্ধ বিব্রতকর। মাদক নির্মূল করুন, এটা ঠিক আছে, কিন্তু মানুষ নির্মূল করবেন না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বাড়তি জনসংখ্যা। আমরা চাই না, এইসব ঘটনার কারণে একটা নোবেল হাতছাড়া হয়ে যাক।

x