আত্মহত্যা প্রতিরোধে ফিরিয়ে আনতে হবে সামাজিক বন্ধন

শনিবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
69

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তরুণ চিকিৎসকের আত্মহত্যার ঘটনায় নগরীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কমবেশি ঘটলেও সাধারণ মানুষের কৌতূহল লক্ষ করা হচ্ছে এ ঘটনার নেপথ্যকারণকে কেন্দ্র করে। আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে, এ রকম ঘটনায় সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আত্মহত্যা মানে নিজকে নিজে ধ্বংস করা। নিজ আত্মাকে চরম কষ্ট ও যন্ত্রণা দেওয়া। নিজ হাতে নিজের জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পরিসমাপ্তি ঘটানো। আমাদের বাংলাদেশে তুচ্ছ পারিবারিক কলহ, বিদ্যালয়ের গমনাগমন পথে বখাটেদের উৎপাত, ভালোবাসায় ব্যর্থতা ও প্রতারণা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে তরুণীরা এবং স্বামীর নির্যাতন-অত্যাচার, যৌতুক সমস্যা, স্বামীর অর্থনৈতিক অক্ষমতা, পারিবারিক অশান্তি থেকে বাঁচার পথ হিসেবে অনেক নারী আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছে। আবার অনেক পুরুষ সাংসারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও অক্ষমতার কারণে এ পথ বেছে নেয়। অনেক নারী-পুরুষ জীবন সংগ্রামের পরিবর্তে জীবন থেকে পালিয়ে যাবার জন্য আত্মহত্যার পথে অগ্রসর হয়।
গত বছর প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি আত্মহত্যা করছেন। এসব আত্মহত্যার বেশিরভাগই ফাঁসিতে ঝুলে। এছাড়া বিষপান ও আগুনে পুড়ে আত্মহননের ঘটনা ঘটছে। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেনটিং সুইসাইড: অ্যা সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’-এ বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছুবে। একই প্রকাশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা আরও বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সংকটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করে।
কেন এই আত্মহত্যার প্রবণতা? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘আত্মহত্যার অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে একটি হলো- মানসিক চাপ। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু মানসিক চাপ থাকে। চাপটা বেশি হয়ে গেলে কারও কারও মনে হয়, তিনি আর সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তখন জীবন থেকে পালানো বা আত্মহত্যার পথটাই তার কাছে সহজ মনে হয়।’ তাঁরা বলেন, ‘বিষন্নতায় যারা ভোগেন তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। কারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। ছেলেবেলা থেকে যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করে। তাঁরা বলেন, ‘কারো মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে দ্রুত তাকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে, সব ধরনের সংকট থেকেই বেরিয়ে আসা সম্ভব।’
আত্মহত্যার কারণগুলি সমাজে শ্রেণিভেদ এবং রুচিভেদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এটা মনে রাখা জরুরি, আত্মহত্যা অবশ্যই প্রতিরোধযোগ্য। আত্মহত্যার চেষ্টা রোখার জন্য চারপাশের সাহায্য যেমন দরকার, তেমন মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকানো যেতে পারে। আত্মহত্যার ঘটনা এড়ানোর জন্য সমাজেরও সমানভাবে দায়িত্ব পালন করা উচিত। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একজনের আত্মহত্যা তার চারপাশে থাকা মানুষগুলির ওপর যেমন, পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী প্রমুখকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। আত্মহত্যা নামক কাজটির সম্পর্কেও মানুষের ধারণা জন্মায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমব্যথী হয়ে আন্তরিক আলোচনার মধ্য দিয়েও সমাজে আত্মহত্যার ঘটনা ঠেকানো যায়। এটা বোঝা জরুরি, কীভাবে আত্মহত্যা রোখা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের তরুণ সমাজে। প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে নানা অপতৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটছে এদের। নৈতিকতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আদর্শে মজবুত জায়গাগুলো কেমন যেন ঢিলেঢালা হয়ে পড়ছে। সামাজিক হৃদ্যতা, পারস্পরিক বন্ধন ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ক্রমশ যেন হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে আগের মতো সামাজিক বন্ধন। আত্মহত্যা প্রতিরোধে ওই বন্ধন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা জরুরি। এ ব্যাপারে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।

x