আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা অকপট ছিলেন

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ
132

শেখ রানার জন্ম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তিনি মূলত একজন গীতিকার ও ব্লগার, যিনি শব্দের খোঁজে দেশ-বিদেশ চষে বেড়ান, আর নির্লিপ্তভাবে ভ্রমণ গদ্য লেখেন। সমপ্রতি তার অনুবাদে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছে ফুটবল কিংবদন্তি দিয়া ম্যারাডোনার আত্মজীবনী। এ-উপলক্ষে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন নাজমুস সাকিব রহমান। আসুন, সরাসরি তাদের কথাবার্তার মধ্যে ঢুকে পড়ি-

: রানা ভাই, আপনার প্রথম বইটার নাম ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে।’ বইটা লিরিক ও লিরিকের পেছনের গল্প নিয়ে। এইরকম বই আপনি আরও লিখেছেন। এর মধ্যে ভ্রমণগদ্য আছে, জার্নাল জাতীয় রচনাও আছে। এইবারের ১৯্থ-এর বইমেলায় এসেছে আপনার ষষ্ঠ বই। আমার বলতে ভালো লাগছে এটা একটা অনুবাদের বই, এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র ম্যারাডোনার আত্মজীবনী। আপনি এতদিন নিজের লেখা নিয়েই থাকতেন, হুট করে অনুবাদে আগ্রহী হলেন কীভাবে?

শেখ রানা : আগ্রহী হয়েছি আসলে বইটা পড়তে-পড়তেই। আমি খুব মাপ-জোক করে, অনেক দিন ভেবে-চিন্তে কিছু করি না আসলে। ম্যারাডোনার ভক্ত তো অনেক আগে থেকেই। আত্মজীবনীটা পড়তে-পড়তে মনে হচ্ছিল, এটার অনুবাদ করলে কেমন হয়? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করা আর কী! আর একটা ভাবনা কিন্তু আমার মাথায় ছিল। আমার মনে হয়েছে, এই বইটা যদি সত্যি সত্যি বের হয়, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্যও এটা যোগবোধক হবে। আমি ফুটবল নিয়ে কাজ করতে চাই। এখানে ক্রিকেট নিয়ে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব নেই, কিন্তু ফুটবলে এখনো অনেক কিছুর দরকার আছে।

বাংলা ভাষায় ম্যারাডোনার আত্মজীবনী প্রথম আপনিই এনে দিচ্ছেন, কাজটা করার সময় এটা মাথায় ছিল?

উঁহু, ছিল না সেভাবে। শেষ করার তাগিদ ছিল। লম্বা সময় ধরে কাজটা করতে হয়েছে আমাকে। শেষদিকে ক্লান্তি চেপে ধরেছে খানিক। তবে, শেষ করে এরকম মনে হয়েছে যে বাংলা ভাষায় ম্যারাডোনার অনুবাদ এর আগে তো হয়নি! ভালোই হলো তাহলে। এ রকম আর কী!

আমি আপনার ভ্রমণগদ্য ‘রোল টানা খাতা’ পড়ছিলাম। সেখানে দেখলাম, আপনি পাঠককে একটা ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন যে, আপনি একটা বই পেয়েছেন। বইটা আপনাকে আলোড়িত করছে। যদিও কিছুই খুলে বলেননি।

হা-হা। তুমি মনোযোগী পাঠক সাকিব। হ্যাঁ, আমি আসলে নিজেই রোমাঞ্চিত ছিলাম। এর সঙ্গে শেষ করতে পারবো কিনা সেই ভীতিও ছিল। সব মিলে-মিশে একটা উত্তেজনা। রোল টানা খাতায় তারই খানিকটা পাঠকের সাথে ভাগ করেছি। ঐ একটা লাইনই বোধহয় ছিল।

হ্যাঁ, একটা লাইনই ছিল। আপনি ম্যারাডোনার প্রতি আগ্রহী কেন বলবেন?

আসলে ম্যারাডোনার উত্থান-পতন খুব আবছা করে জানতাম। কতটুকুই বা জেনেছি তখন! ‘ক্রীড়াজগত’ পড়তাম খুব, আর কোলকাতা থেকে আসতো ‘খেলা।’ এর বাইরে আসলে জানার সুযোগ ছিল কম।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ম্যারাডোনা যখন আর্জেন্টিনা দলে খেলছেন, ওই সময় বাংলাদেশে টিভি-এভেইলবল হওয়া শুরু করেছে। সম্ভবত এ কারণেই তিনি এখানে এতো জনপ্রিয়।
শোনো, আমাদের দেশে ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো ৮৬্থ বিশ্বকাপ। এটা দিয়েই আমরা প্রথম টিভিতে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পাই। সেটা একটা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা ছিল। আর্জেন্টিনা কাপ জিতল। ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঝ-মাঠ থেকে বল নিয়ে গোল করলেন। একটা অপূর্ব আখ্যান আসলে। তিনি ফুটবলের অনন্য এক বর্ণময় চরিত্র।

রানা ভাই, আপনি একসময় উরাধুরা জীবন কাটিয়েছেন। এই জায়গা থেকে ম্যারাডোনা কি আপনাকে টেনেছে?

হ্যাঁ, টেনেছে। কিন্তু ম্যারাডোনার আত্মজীবনী পড়ে আমার মনে হয়েছে, উরাধুরার রেশ যদি ম্যারাডোনা একটু হলেও টেনে ধরতে পারতেন, বা আবেগকে খানিকটা বশে রাখতে পারতেন, ফুটবল বিশ্ব হয়তো আরো অনেকটা সময় আনন্দ পেত। কিন্তু এইসব খুব হাইপোথেটিকাল কথাবার্তা। সত্যি হলো, এই যে উরাধুরা জীবন, এটা নিয়ে আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা অকপট ছিলেন। তিনি নিজেকে গ্লোরিফাই করে জীবনের গল্প সাজান নাই। এই ব্যাপারটাই আমাকে বেশী টেনেছে।

কিন্তু ম্যারাডোনা তার আত্মজীবনীতে খেলার দিন/তারিখ যে পরিমাণ ডিটেলের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, এটা কি অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার না? ড্রাগ তো স্মৃতি শক্তি খারাপ করে দেয়।

বিশ্বাস করো, বইটা পড়তে যেয়ে আমি নিজেও খুব বিস্মিত হয়েছি। এমনও হয়েছে, আমি পড়া থামিয়ে ভেবেছি। একটা মানুষ একটা খেলার প্রতি ঠিক কতটুকু ভালোবাসা ধরলে এরকম হতে পারে, তা ভেবেছি। এটা সত্যি উল্লেখ করার মতো একটা ব্যাপার। প্রসঙ্গত আর একটা কথা বলি। বইটা বেশ দীর্ঘ তো। দিন/তারিখ/বার, স্টেডিয়ামের নাম-এইসব বারবার আসাতে মাঝে-মাঝে একটু গতি ছেদ হয়। আমি অনুবাদের সময় ভেবেছিলাম একবার নিজের মতো করে ব্যাপারগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখব। পরে ভেবে দেখলাম, এর কোনো দরকার নাই আসলে। যে পড়বার এভাবেই একাত্ম হবে। এটাই ম্যারাডোনা। আমি সঙ্গত কারণে বাংলা ভাষায় মূল বই এর নির্যাসটাই ধরার চেষ্টা করেছি। নিজ থেকে আরোপিত কিছু করিনি।

এখানে অনুবাদক হিসাবে আপনার তো গ্রহণ/বর্জনের একটা ব্যাপার আছে। আপনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করছেন। এই ভাষার একটা চাওয়া নিজ থেকেই চলে আসে। এই জায়গাটা আপনি কীভাবে ডিল করেছেন?

যেহেতু ম্যারাডোনা ম্যারাডোনার মতই ছিল, সেক্ষেত্রে আমাকে অনেক স্ল্যাং বাদ দিতে হয়েছে। কারণ এই বইটা তো সবার জন্য। তাছাড়া আমার মধ্যে কঠিন বা দুর্বোধ্য শব্দচয়নের তাগিদ কম। অনুবাদেও আমি আমার মতই থেকেছি।

আপনার প্রিয় অনুবাদক কারা বাংলাদেশে?

কী সর্বনাশের কথা! আমি তো সেভাবে অনুবাদ পড়ি নাই। আলাদা করে কারো নাম বলা খুব মুশকিল। কাফকা পড়েছি। মাশরুর আরেফিনের। এই নামটা বলতে পারি। আমার খুব ভালো লেগেছে।

আচ্ছা, ম্যারাডোনার ড্রাগ লাইফ নিয়ে আপনার উপলব্ধি কি?

মূলত স্পেনের বার্সিলোনায় খেলতে যেয়ে এই সর্বনাশের শুরু। পরে এর ডাল-পালা মেলেছে নেপোলিতে গিয়ে। মাফিয়ার কবল থেকে রক্ষা করা, বিশেষ করে ম্যারাডোনার মত একটা চরিত্রকে, একটু মুশকিল ছিল বটে। কিন্তু ভুল তো ভুল। সেটা স্বীকার করে নেয়াটাই ভালো। ড্রাগ লাইফ আর ইনজুরি ম্যারাডোনাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে বহুবার। ক্যানিজিয়ার সাথে বন্ধুত্ব এবং এই ড্রাগকেন্দ্রিক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এক সময় ক্যানিজিয়ার বউ পর্যন্ত ম্যারাডোনাকে দুষেছে। ম্যারাডোনা ক্যারিয়ারের ওই সময়টায় একদম ভেঙ্গে পড়েছিল। ক্যানিজিয়াকে নিজের ভাইয়ের মত ভালোবাসতো ম্যারাডু। আর্জেন্টিনাবাসী ম্যারাডোনাকে আদর করে এই নামে ডাকতো। ম্যারাডু।

রানা ভাই, ম্যারাডু তার আত্মজীবনীতে অনেক প্লেয়ারকে নিয়ে তার মতামত দিয়েছেন। ডেভিড ব্যাকহ্যামকে নিয়ে তার মতামত কি? আমি এই ব্যাপারে জানতে বিশেষ আগ্রহী। লেখালেখিতে আসার আগে আমি যখন ফুটবল খেলতাম, ফ্রি-কিক করার সময় আমার নিজেকে ডেভিড ব্যাকহ্যামের মনে হতো।

খুবই ভালো। ডেভিড ব্যাকহ্যামের স্কিল নিয়ে ম্যারাডোনার উৎসাহী মতামত চোখে পড়ার মত। একই-সাথে স্পাইস গার্ল নিয়ে এত সময় না-দিলে ব্যাকহাম আরো ভালো করতেন বলেই ম্যারাডোনা বিশ্বাস করে। হা-হা। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পেলে। আমরা জানতাম, ম্যারাডোনা আর পেলে দুইজন শত্রু। কিন্তু বাস্তবে একদম উল্টো।

আইয়ুব বাচ্চু আর জেমসের মত, তাই না?

হ্যাঁ, প্রায় ওরকমই!

ম্যারাডুর এই বইটাসহ আপনার চারটা বইয়ের প্রচ্ছদ মুরাদ হোসেনের করা। এই জুটিটা কীভাবে গড়ে উঠল?

মুরাদ আর আমি একসাথেই গ্রে’তে কাজ করতাম। ক্রিয়েটিভ টিমে। মুরাদ আমাকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, আমি যদি কোনোদিন বই করি ও প্রচ্ছদ করবে। আমার মাথায় ছিল কথাটা। মুরাদকে আমি বিশেষ পছন্দ করি। ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করি। ও খুব গুণী একজন চিত্রকর। এই নামেই আমি ওকে ডাকতাম আগে, চিত্রকর। ওর মত বাউল স্বভাব আছে খানিক। আমার মতন। মুরাদ ভালো গানও গায়। এই তো!

আমি কিছুদিন আগে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, আমি কোথায় লিখতে চাই? অনেক ভেবে যে উত্তরটা নিজের জন্য পেলাম, তা হল, আমি ব্লগে লিখতে চাই। মানে, যেখানে শুরু হয়েছিল, আবারো সেখানেই ফিরে যেতে চাই। আমি ব্লগ জীবন খুব মিস করি। আপনার লেখার সঙ্গেও আমার পরিচয় ব্লগ থেকেই। আপনার কি এইরকম কোনও চাওয়া আছে?

সামহোয়ার ইন ব্লগে আমার নয় বছর এক মাস হয়ে গেছে। আমি বারোয়ারি ফেসবুকে লিখতে একদম চাই না। আমি কিন্তু ব্লগেই গদ্য লেখা শুরু করেছি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে প্রাণপণে চাইছি পুরানো সবাই ব্লগে ফিরে আসুক। আমি ছবি, ট্রল আর সেলফির বাইরে শুধু লেখার প্ল্যাটফর্মে লিখতে চাই। আমি চতুর্মাত্রিকেও খুব নিয়মিত ছিলাম। নস্টালজিককে ভীষণ মিস করি। এই লোকটা ভালো ছিল। মানুষের ভালোবাসা আসলে অগ্রাহ্য করা কঠিন। আমি বা নস্টালজিক কেউ তা পারিনি!

নস্টালজিকের কথা যখন আসল, আপনার লেখা থেকে কোট করছি … ‘বেশ হাঁটাহাঁটি করায় ক্লান্তি ভর করেছে বেশ। ঘুমানোর আগে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। হান্টলি ঘুম শহর। দূর নিয়নের আলোয় অদ্ভুত একটা হলুদাভ আচ্ছন্নতা। দুচোখ ভরে ঘুম নেমে আসে আর মনে হতে থাকে আমি আব্বা আম্মার সাথে দাদাবাড়িতে যাচ্ছি।’ এই নির্লিপ্ত স্টাইলটা আপনি কীভাবে পেলেন?

জানি না আসলে। আমি আমার কথাই বলে গেছি আলগোছে। লিরিকে, কবিতায়, গদ্যে। কখনও তা খুব মূর্ত, কখনও বিমূর্ত। স্টাইল বা সচেতনভাবে নিজের লেখার আলাদা সত্তা দাঁড়াবে- এরকম আসলে ভাবি নাই। ফুরসতই তো পাইনি ভাবার। আমি ঘোরের মধ্যে থাকি লেখার সময়। জানি না কথাটা কেমন শোনায়, কিন্তু এই কথাটা সত্য। আমার নৈঃশব্দের জগৎ অপার্থিব সুন্দর। এটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না।

x