আত্নোন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা

সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব

রিজোয়ান রাজন

শনিবার , ২৩ জুন, ২০১৮ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
89

ক্যারিয়ার ক্লাব শব্দ দুটো ব্যাপক অর্থবোধক। সাধারণভাবে শব্দ দুটোকে ব্যাখ্যা করলে যা দাঁড়ায় তা হলো জীবিকা গড়ার সংঘ। মানুষ স্বভাবগত কারণে সঙ্গপ্রিয়। এই সঙ্গপ্রিয়তাই তাকে সংঘবদ্ধ করে। সংঘবদ্ধতা নানা কারণে তৈরি হতে পারে। ক্যারিয়ার ক্লাব হলো কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে সামষ্ঠিক উন্নয়ন সাধন। সম্প্রতি সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব। ক্লাব গঠনে সাদার্ন ইউনিভার্সিটির স্বপ্নবান নয়জন শিক্ষার্থী অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন বিভাগ ও বর্ষের এই শিক্ষার্থীরা হলেন মো. ফয়সাল, জাবেদুল ইসলাম, মুক্তা মজুমদার, ফাবিহা আইন, সোমা কর, সাহেদা ইরিন, শিহাবুর রশিদ, জাফর ইমাম ও দিপন বড়ুয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ার ক্লাবএর গুরুত্ব নিজেরা যেমন অনুধাবন করেছেন তেমনি সহপাঠীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন এই ক্লাবের সদস্য হয়ে কাঙিক্ষত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে। উদ্যোগী এই শিক্ষার্থীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ক্লাবটি যাত্রা শুরু করেছে প্রায় পঞ্চাশ জন শিক্ষার্থী নিয়ে।

সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব ৩টি বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়।

এক. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যোগ্যতা অর্জন

দুই. জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে আত্মনিয়োগ।

তিন. পারস্পরিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার আকাঙক্ষা।

এই বিষয়গুলো একজন শিক্ষার্থীকে অনুশীলন ও অনুধাবনের মধ্য দিয়ে একজন সম্পূর্ণ ও সফল মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে। উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যোগ্যতা অর্জন : এই বাক্যটি খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। যে কোন পরিস্থিতিতে খাপখাইয়ে চলা কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী চলতে পারা অর্থাৎ আরো স্পষ্ট করে এইভাবে বলা যায় তাহলো Be Smart. বর্তমান সময়ে Smart হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

. জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে আত্মনিয়োগ : এই বাক্যটির ব্যাপকতা বিশাল। প্রথমত নিজের উন্নয়নে নিজেকে সচেতন হতে হবে। স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ মানে হলো জীবনের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিতে আস্থা রাখা। অর্থাৎ ব্যক্তির সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা যায়– “এমন কাজই বেছে নাও, যা তুমি পছন্দ করো। তাহলে জীবনে একদিনও কাজ করতে হবে না।”

. পারস্পরিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হওয়ার আকাঙক্ষা : এই বাক্যটি চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেছে। এই বাক্যের দুটো অংশ। একটি হলো উন্নয়ন আর একটি হল মানবিকতা। একটি অর্জন করতে হয় আর একটি হল সহজাত। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। একজন শিক্ষার্থী তথা মানুষ তার কাঙিক্ষত উন্নয়নে অপরের সহযোগিতা নেবে এবং একই সাথে সহানুভূতিশীল থাকবে অপরের প্রতি। মানবিকতা মনুষ্যত্বের একটি বড় গুণ। এর মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবী জয় করা যায়। আজকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে মানবিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য। সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব উপরোক্ত তিনটি বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি আরো তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলো হলো Connecting Supporting এবং Empowering. মূলতঃ এই তিনটি শব্দ সমষ্টিই হলো সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাবের স্তম্ভস্বরূপ। এগুলো শুধু তিনটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ব্যাপকতা অনেক। শব্দ তিনটি পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত অর্থাৎ একে অপরের পরিপূরক। এগুলো ব্যাখ্যা করলে যা দাঁড়ায় তাহলো

এক. Connecting : কানেক্টিং হলো মূলতঃ নেটওয়ার্কিং। নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে সম্ভাবনাও বেশি হবে। নিত্য নতুন কানেকশনের মধ্য দিয়ে এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়।

দুই. Supporting : সাপোর্টিং হলো সহযোগিতা নেওয়া এবং প্রয়োজনবোধে সহযোগিতা দেওয়া। এই দেওয়ানেওয়ার মধ্য দিয়েই বৃহত্তর ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

তিন. Empowering : এমপাওয়ারিং হলো উপরোক্ত দুটি স্তম্ভের সহযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করা। সক্ষমতা অর্জন দৃষ্টান্ত স্বরূপ। এমপাওয়ারমেন্টই হচ্ছে একজন মানুষের পরিচয়ের অন্যতম দিক। একজন মানুষের সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো তার এমপাওয়ারিং ক্ষমতা।

উপরোক্ত বিষয় ও ভাবনাগুলোকে ধারণ করেই সাদার্ন ক্যরিয়ার ক্লাব গঠিত হয়েছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এর কাজগুলো কী কিংবা ক্লাবটি কীভাবে কাজ করবে পরিষ্কার উত্তর হলো শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নই ক্লাবের প্রধানতম কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যে পড়াশোনা করছে তা কি অপর্যাপ্ত? আসলে ঠিক তা নয়। জ্ঞান অর্জনের জন্য যেমন পাঠ্য বইয়ের বাইরেও নানাবিধ বিষয় অধ্যয়ন করতে হয় তেমনি বর্তমান বৈশ্বিক বাজারেও নিজেকে প্রস্তুতের জন্য নানাবিধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ক্যারিয়ার ক্লাব হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া একজন শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল ও কর্ম উপযোগী করে তুলবে। অর্থাৎ পেশাগত দক্ষতা তৈরি করবে। এই কাজগুলো সাংগঠনিকভাবে ক্যারিয়ার ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাই আয়োজন করবেন এবং নিজেরাই সেই আয়োজনের অংশগ্রহণকারী হবেন। এভাবেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে কাঙিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবেন তারা। আর একটা বিষয় প্রশ্ন আকারে দেখা যেতে পারে তাহলো কেন সংগঠন করবেন তারা? সহজ উত্তর “দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ”। আসলে সংগঠন করার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক দক্ষতা তৈরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। একটি সংগঠনের সাফল্য তখনই আসে যখন এর সদস্যদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা দেখা দেয় যেখানে সে আশ্রিত না হয়ে আশ্রয় দিতে পারার ক্ষমতাধারী হয়। যদি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করা হয় তোমরা কেন সংগঠন কর? মতামতে তারা বলবে সমাজের জন্য, মানুষের কাছে নিজের দায়বদ্ধতার জন্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, ভাল কিছু করার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সব মতামতের ভিড়ে যেটি আমার কাছে সবচাইতে যৌক্তিক মনে হবে তা হলো, “আমি সংগঠন করি নিজের জন্য।” সবকিছুর ঊর্ধ্বে আনন্দ নিয়ে কাজ করার মধ্যেই একটি সফল সংগঠকের সাফল্য জড়িত। আর সেই আনন্দ আসবে মতপ্রকাশের ও প্রয়োগের স্বাধীনতা, সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর ব্যক্তি স্বার্থ পরিত্যাগ করে সর্বোপরি একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি সংগঠনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মধ্যে। কারণ আমি যদি প্রশ্ন করি একটি সংগঠন করে কী পাওয়া যায়। ভাল করে চিন্তা করলে কিছু আনন্দময় স্মৃতি ছাড়া আর কিছু পাওয়ার থাকে না। কিন্তু নীরবে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় তা পৃথিবীর আর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তোমাকে দেবে বল? এখানেই একজন শিক্ষার্থীর আগামীর কারিগর হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে। এখানেই সে সহনশীলতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্নতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাথমিক পাঠ পেয়ে থাকে। আর এ ক্ষেত্রে যদি তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেই পরিবেশ নিশ্চিত করে তাহলে তো আর কথাই নেই। সাদার্ন ইউনিভার্সিটি ট্রাস্ট, শিক্ষকমণ্ডলী এবং শিক্ষার্থীদের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানে রয়েছে আবৃত্তি, বিতর্কসহ নানা রকম সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন, আবার ফুটবলক্রিকেটে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় সমৃদ্ধ দল ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দেশেবিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং দেশের সুনাম বয়ে আনছে তারা।

সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাবের কথায় ফিরে আসি। ক্লাবটি গত ৩১ মে যাত্রা শুরু করেছে। সদস্যদের হাসিমাখা মুখে স্বপ্নের ঝিলিক বয়ে যাচ্ছে। এই ঘুম ভাঙা স্বপ্ন তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে নিজেকে পাল্টাতে, দেশকে পাল্টাতে। তারা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন একদিন তারা স্বপ্নজয়ী হবেনই। আর এভাবেই সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব শিক্ষার্থীদের মানস গঠনে ভূমিকা রেখে যাবে দিনের পর দিন। জয়তু সাদার্ন ক্যারিয়ার ক্লাব।

লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট

সেন্টার, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

x