আটকে আছে লাখ লাখ পাসপোর্ট

ই-পাসপোর্টের আশায় আমদানি হয়নি এমআরপি সংকট কাটাতে আনা হচ্ছে দুই লাখ

হাসান আকবর

বুধবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
438

ই-পাসপোর্ট চালু হবে, তাই এমআরপি পাসপোর্টের বই আনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় নির্দিষ্ট সময়ে ই-পাসপোর্ট চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপর্যয় দেখা দেয় পাসপোর্ট সেবা খাতে। এমআরপির পাসপোর্ট ইস্যু করার মতো বই হাতে না থাকায় সারা দেশে আটকে আছে লাখ লাখ পাসপোর্ট। নবায়নের মতো সাধারণ পাসপোর্টও গত তিন মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে দুই লাখ পাসপোর্ট বই আনা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাকরি, অধ্যয়ন, চিকিৎসা, পর্যটন যেকোনো প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে হলে পাসপোর্ট নিতে হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মানুষের হাতে পাসপোর্ট রয়েছে। এর বাইরে প্রতিদিন প্রায় বিশ হাজার মানুষ নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে।
চট্টগ্রামে দুটি অফিস মিলে প্রতিদিন গড়ে ৯০০ পাসপোর্টের আবেদন জমা পড়ে। একসময় হাতে লেখা পাসপোর্ট দিয়ে ভ্রমণ করার সুযোগ ছিল। ১৯৮০ সালের পর উন্নত বিশ্বে চালু হয় মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা এমআরপি। বাংলাদেশে এমআরপি চালু হয় ২০১০ সালে। দেশে যখন এমআরপি চালু হচ্ছে তখন উন্নত বিশ্বে ইলেকট্রনিক্স পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট চালু হয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে ২০০৮ সাল থেকে ই-পাসপোর্ট চলে আসছে। বর্তমানে ১১৮টি দেশে ই-পাসপোর্ট চালু করা হয়েছে। ১১৯তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট চালু করার জন্য ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ওই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জেএমবিএইচের সঙ্গে ই-পাসপোর্ট চালুর ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে চুক্তি হয়। তারা গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু করবে বলে কথা দিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে জার্মানি থেকে বিশ লাখ ই-পাসপোর্ট ছাপিয়ে আনার পর বাকিগুলো ঢাকার উত্তরায় ছাপানোর কথা।
জার্মানি থেকে ই-পাসপোর্টের গেটসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে ডিসেম্বরের পরিবর্তে গত জানুয়ারিতে ই-পাসপোর্ট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। তা-ও ব্যর্থ হওয়ার পর বলা হয় জুন মাসে চালু হবে। এরপর বলা হয়, জুলাইয়ে ই-পাসপোর্টের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। কিন্তু হয়নি।
এখন বলা হচ্ছে চলতি বছরের মধ্যে চালু হবে। তবে শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। দেশে পাসপোর্টের বই ছাপানো হয় না। ডে লা রো নামের কোম্পানি ছাপিয়ে বাংলাদেশে রপ্তানি করে। বিদেশ থেকে আসা বইয়ে প্রয়োজনীয় নাম-ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য ছাপিয়ে পাসপোর্ট দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে।
ই-পাসপোর্ট চালুর আশায় এমআরপি পাসপোর্টের বই আমদানি বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ পাসপোর্ট বই লাগে। অথচ সর্বশেষ বইয়ের চালান এসেছে কয়েক মাস আগে। জুলাইয়ে ই-পাসপোর্ট চালু হলে এমআরপি বই নষ্ট হয়ে যাবে, তাই অর্ডার দেয়া হয়নি। এতে করে এমআরপির সংকট চলছে। নতুন পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না, নবায়নের পাসপোর্টও পাচ্ছেন না।
হালিশহরের শেখ আবদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি বলেছেন, তিন মাস আগে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আবেদন করেছি। জরুরি ফি-ও পরিশোধ করেছি। কিন্তু এখনো পাইনি।
সীতাকুণ্ডের সৌদি আরব প্রবাসী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, তিনি দেশে এসে পাসপোর্ট নবায়ন করতে দিয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। এখনো পাননি। আর কয়েকদিন গেলে সমস্যায় পড়বেন তিনি।
সংকটের কথা স্বীকার করে চট্টগ্রামে পাসপোর্টের একজন কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম থেকে পাসপোর্ট দেয়া হলেও মূলত পাসপোর্ট তৈরি হয় ঢাকায়। সারা দেশের সব পাসপোর্ট ছাপা হয় ঢাকায়। বই সংকটে বেশ কিছুদিন ধরে প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, সীমিতভাবে জরুরি পাসপোর্টগুলো দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অপর একজন কর্মকর্তা জানান, ই-পাসপোর্ট চালু না করা সম্ভব না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে দুই লাখ বই আনা হচ্ছে। তা দিয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটানো হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানান, ই-পাসপোর্ট চালু না হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট সাময়িক। ই-পাসপোর্ট চালু হলে সংকট থাকবে না। তিনি জানান, ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমআরপি প্রদান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। মেয়াদ থাকা পর্যন্ত এমআরপি নিয়ে বিদেশ যাওয়া যাবে। তবে এমআরপির মেয়াদ শেষ হলে নবায়ন করার সময় ই-পাসপোর্টই নিতে হবে।
জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জার্মানির প্রযুক্তি নিয়ে জিটুজি পর্যায়ে ই-পাসপোর্ট চালু করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সেবার মান বাড়বে। পাসপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি করা সম্ভব হবে না। ই-পাসপোর্টের জন্য দেশের প্রতিটি ইমিগ্রেশন পয়েন্টে বিশেষ ধরনের ই-গেট স্থাপিত হবে। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু হবে। ই-গেট স্থাপন পুরোপুরি সম্ভব না হওয়ায় পাসপোর্ট চালু করতে বাড়তি সময় লাগছে বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, ৪৮ পাতার পাসপোর্টে অধিকাংশ পাতা ব্যবহার হওয়ার আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এতে মানুষের টাকার অপচয় হয়। নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকা। তাই ই-পাসপোর্টে দুই ধরনের মেয়াদ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিশু থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৫ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট দেয়ার বিষয়টি আলোচনা করা হয়। অন্যদের ১০ বছর মেয়াদের। ৫ বছর মেয়াদের জন্য তিন হাজার ৫শ টাকায় সাধারণ (২১ দিন), জরুরি ৫ হাজার ৫শ টাকা (সাত দিন) ও অতি জরুরি ৭ হাজার ৫শ টাকা (এক দিন) নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ১০ বছর মেয়াদের ই-পাসপোর্টের জন্য ফি জমা দিতে হবে ৫ হাজার টাকা (২১ দিন), জরুরি জমা ৭ হাজার টাকা (৭ দিন) এবং অতি জরুরি জমা ৯ হাজার টাকা (এক দিন) নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে গতকাল পর্যন্ত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে সরকার কোনো সার্কুলার জারি করেনি। আয়োজন চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের পরই বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে অপর একজন কর্মকর্তা জানান।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ই-পাসপোর্টেও এমআরপির মতো বই থাকবে। তবে এমআরপি পাসপোর্টের শুরুতে ব্যক্তির তথ্য সংবলিত যে দুটি পাতা আছে তা ই-পাসপোর্টে থাকবে না। সেখানে পলিমারের তৈরি বিশেষ একটি কার্ড থাকবে। ওই কার্ডে একটি এমবেডেড ইলেকট্রনিক মাইক্রো প্রসেসর চিপ থাকবে। এই চিপে পাসপোর্টধারীর বায়োগ্রাফিক ও বায়োমেট্রিক (ছবি, আঙুলের ছাপ ও চোখের মণি) তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ই-পাসপোর্টের সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে পাবলিক কি ডাইরেক্টরিতে (পিকেডি) সংরক্ষিত থাকবে।
পিকেডিতে আন্তর্জাতিক এই তথ্যভাণ্ডার পরিচালনা করে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও)। ইন্টারপোলসহ বিশ্বের সব বিমান ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের এই তথ্যভাণ্ডারে ঢুকে তথ্য যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। ফলে ই-পাসপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি সম্ভব হবে না। এমআরপিতে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য আছে ৩৮টি। ই-পাসপোর্টে থাকছে ৪২টি।

x