আঞ্চলিক বাণিজ্যে সম্ভাবনার বিকাশে বাধা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ চাই

শুক্রবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ
66

বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের আকার এখন প্রায় ৮৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এ বাণিজ্যের সামান্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংগঠিত হচ্ছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। যদিও তা ১৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। অর্থাৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যে সম্ভাবনার ৬০ শতাংশই কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি দেশের একাধিক দৈনিক সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে ‘এ গ্লাস হাফ ফুল: দ্য প্রমিজ অব রিজিওন্যাল ট্রেড ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৬৫২ কোটি ২০ লাখ ডলার। এটি ১ হাজার ৬৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে দুই দেশ ৯৯১ কোটি ১০ লাখ ডলারের বাণিজ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে ১৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বাণিজ্যের সুযোগ থাকলেও দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য হচ্ছে মাত্র ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের। দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি দেশ শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের আবার ১৫ কোটি ডলার। যদিও তা ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। আঞ্চলিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ার নানা কারণও অনুসন্ধান করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার ধরনের বাধার কারণে বাণিজ্য বাড়ছে না। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ শুল্ক, আধা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, কানেকটিভিটি ব্যয় ও সীমান্তে আস্থার সংকট। এছাড়া সম্পুরক শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্কের মতো প্যারা শুল্ক ও আস্থার সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ছে না। এসব বাধা দূর করতে পারলে এ অঞ্চলের বাণিজ্য বর্তমানের তিন গুণে উন্নীত করা সম্ভব।
দেখা যাচ্ছে, বিশ্বব্যাংক মনে করছে, উচ্চ শুল্ক, আধা শুল্ক, অশুল্ক বাধা, কানেকটিভিটি খরচ ও সীমান্ত আস্থার সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ছে না। সংস্থাটির মতে, গত ২৫ বছরে বিশ্বের মোট বাণিজ্যে এ অঞ্চলের অবদান বেড়েই চলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বাধাগুলো দূর করতে পারলে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর বাণিজ্য ১৮ দশমিক ৯ বিলিয়নে উন্নীত করা সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃবাণিজ্যে খরচ অনেক বেশি। বিশ্বের গড় শুল্কের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার শুল্ক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমদানি সংরক্ষিত। এসব দেশে অনেক উচ্চ হারে নির্ধারিত শুল্ক হারের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা আছে। রয়েছে স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা, যা দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বাইরে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশ থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে, তার ৪৬ শতাংশ স্পর্শকাতর তালিকায়।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যে এগিয়ে থাকা বড় অর্থনীতির দেশ ভারতে শুল্কের তালিকায় অশুল্ক বাধা বেশি। অশুল্ক বাধা দূরীকরণে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের মান নির্ধারণকারী সংস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমান্ত হাট চালুর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বল্প আকারে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ছে। ফলে সম্পর্কেরও উন্নতি হচ্ছে। সীমান্তের মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হচ্ছে। তাই সীমান্ত হাটের অভিজ্ঞতা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নীতিনির্ধারকদের মাঝে বাণিজ্য ও বিশ্বাস বাড়াতে আরো উদ্যোগ নিতে হবে। সার্কের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যের যে বিপুল সুযোগ রয়েছে, তার সঠিক ব্যবহারে দেশগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসা দরকার। এছাড়াও সম্ভাবনার নিরিখে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য’ ও ‘বহুপক্ষীয় বাণিজ্যে’র উদ্যোগ নিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাফটা চুক্তি রয়েছে। তাই কোন শুল্কই থাকার কথা নয়। অথচ এই অঞ্চলেই বেশি শুল্ক রয়েছে। এ অঞ্চলের বাণিজ্যে ট্যারিফ ১৩ দশমিক ৩ ও প্যারাটারিফ ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা রয়েছে ৩ শতাংশ পর্যন্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা উত্তরণে আরো বেশি বাণিজ্য, আরো বেশি আস্থা ও বিশ্বাস এবং বেশি করে মানুষে মানুষে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদারিত্ব বাড়াতে বাস্তবধর্মী গবেষণা দরকার। এ অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়াবে। পাশাপাশি লাখ লাখ লোক দারিদ্র্য পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসবে। এতে পুরো অঞ্চলই সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, যা বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে এ অঞ্চলের উন্নয়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এখন খুবই প্রয়োজন। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় মনোমালিন্যের অবসান না ঘটায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি হয় নি। আসিয়ান বা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে সাফল্যের মুখ দেখেছে, সার্ক তার শতাংশের একাংশও করতে পারে নি। আমরা চাই, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে সব দেশ আরো সক্রিয় হোক, রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ আরো বেশি গুরুত্ব পাক। সেক্ষেত্রে সার্ক হতে পারে একটি গুরুত্ববাহী বাণিজ্যিক মঞ্চ। এই বাণিজ্যিক মঞ্চ থেকে স্বতন্ত্র ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বাণিজ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যেন প্রভাব ফেলতে না পারে, সে দিকটাতেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা, আঞ্চলিক বাণিজ্যে বর্তমানে যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে সেটা দূর করতে সব দেশ সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

x