আজাদী সংবাদ-সংস্কৃতিমনস্ক পত্রিকা

আহমদ রফিক

বুধবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
75

সংবাদপত্র, বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকা রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির দর্শন, প্রতিদিনের খবর পরিবেশনে, পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণে এবং তা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায় সংবাদ ও পরিস্থিতি মূল্যায়নের নিরপেক্ষতায়। পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদকপরিচালকের রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস যেন পত্রিকাকে প্রভাবিত না করেচতুর্থ এস্টেট বলে কথা। সংবাদপত্রের জন্য এটি এক গৌরবজনক অভিধা।

তাই সে কোনো দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ বা মতামতের একদেশদর্শি প্রতিনিধিত্ব করবে না, দল নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দেবে না। মানবিক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করবে, মানবিক সত্যের নীতিতে অটল থাকবে, ব্যক্তিক, সমষ্টি বা জাতিগত বা আন্তর্জাতিক যুক্তিসঙ্গত দাবির পক্ষে সোচ্চার হবেদৈনিক পত্রিকার এ জাতীয় মতাদর্শকে সঠিক বিবেচনা করি।

চতুর্থ এস্টেট বলে সংবাদপত্র ‘মিডিয়া সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে, বিশেষ করে আপন স্বার্থে, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে, এটাও সঠিক মনে করি না। সে সমর্থন করবে মানবিক জীবনবোধকে, যা বৃদ্ধি করবে বিশ্বজনীন চরিত্রের।

দুই

বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে/পূর্ব পাকিস্তানে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল হাতে গোনাগোটা দুই ইংরেজি ভাষায়, বাকি গুটি কয় বাংলায়, সঙ্গে কয়েকটি সাপ্তাহিক, এবং তা তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায়। সংবাদপত্র যুক্তিসঙ্গত কারণেই সাধারণত রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। একটি রাষ্ট্রের বা প্রদেশের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সমৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে সংবাদপত্রের সংখ্যা। এদিক থেকে পরিস্থিতি আমাদের খুব একটা অনুকূলে ছিল না।

আরো একটি অপ্রিয় সত্য হলো রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদপত্রে আঞ্চলিক সংবাদটি ততটা গুরুত্ব পায় না, যতটা পাওয়া উচিত। বিশেষত দূর অঞ্চল বিশেষে। এমন বিবেচনায় আঞ্চলিক সাংবাদপত্রের গুরুত্ব অনস্বীকার্যযেমন সেকালে বা একালে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, শ্রীহট্টের মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলে। এসব দিক থেকে বাণিজ্যবন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্বাধীনতা তথা আজাদী’র প্রেরণা নিয়ে ষাটের দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত ‘দৈনিক আজাদী’ একটি অসাধারণ স্থানিক প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছিল। আজ ২০১৮ সালে পত্রিকাটির ৫৮ বছর পূর্ণ হওয়ার শুভলগ্নে এর মূল প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন পরিচালক ও সাংবাদিকদের অভিনন্দন জানাতে হয়।

তার চেয়েও বড় কথা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পরিচালিত একটি দৈনিক সংবাদপত্রকে ৫৮ বছর পর্যন্ত ধরে রাখা সোজা কথা নয়। বিশেষ করে সে দৈনিকটি যদি কেবলমাত্র আঞ্চলিক পত্রিকা না হয়ে একটি সর্বজনীন জাতীয় চরিত্রের পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হবার যোগ্যতা অর্জন করে। বর্তমান সময়কার রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক ঢাউস দৈনিকগুলোর তুলনায় কিছুটা শীর্ণ হয়েও ‘দৈনিক আজাদী’ যে সুস্বাস্থ্য বহন করছে এটাও শুভ সংবাদ।

দৈনিক আজাদী’র এ স্বাস্থ্য যেমন সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ের, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েরএককথায়, ‘আজাদী’কে জাতীয় দৈনিকের পর্যায়ে গণ্য করা যায়, যেখানে রয়েছে আঞ্চলিক তথা স্থানীয় সংবাদ ও সমস্যাদির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ। রয়েছে সেইসঙ্গে সাহিত্যসংস্কৃতির চাহিদা পূরণ। এর সাহিত্য পাতাও গুরুত্বহীন নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহরের সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনীতি চর্চার কারণে। এখানে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একাধিক উচ্চ শিক্ষায়তন। স্বভাবতই সাহিত্যসংস্কৃতিচর্চাও মানসম্মত।

দৈনিক আজাদী’ এসবের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে একটি সংবাদসংস্কৃতিমনস্ক পত্রিকা হিসেবে। পারে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে ও পাঠকদের অনুসন্ধিৎসা মেটাতে।

আজাদী’র সঙ্গে আমার যোগাযোগ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কলকাতায় তাদেরই একজন লেখকসাংবাদিকের সঙ্গে পরিচয়ের ভিত্তিতে। তিনি হলেন সাহিত্য সম্পাদক অরুণ দাশগুপ্ত। সেটা কয়েক দশক আগে। সম্ভবত সে সময় এক আধটা লেখাও সেখানে ছাপা হয়ে থাকতে পারে, ঠিক মনে নেই। তবে এবারের যোগাযোগটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে চট্টগ্রামে সফরে যাওয়া এবং আজাদী অফিসে কিছু সময় কাটানো উপলক্ষে। সে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব অবশ্য পত্রিকাটিরই বলে মনে করি।

যাই হোক, পত্রিকাটির ৫৮ বছর পূর্তি এদেশের সাংবাদিকতার ঐতিহ্য বিচারে অসাধারণ ঘটনা বলে মনে করি। এর ভবিষ্যৎ যাত্রা শুভ হোক, এর সংবাদপত্র সুলভ সত্তার মনে আরো সমৃদ্ধ হোক, এর পাঠকপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধিপাক, মনেপ্রাণে তাই কামনা করি।

লেখক : গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

x