আজকের ঝড়: প্রসঙ্গ শাড়ি

সালমা বিনতে শফিক

শনিবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
182

সাপ্তাহিক ছুটি শেষে অন্যসব রবিবারের মতো কাজে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। সকালে মনে হল বৃষ্টি নামবে। আগের রাতে ভ্যাপসা গরম ছিল। ভাদ্রের হঠাৎ বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে যাতে শ্রেণিকক্ষে যেতে না হয়, তাই প্রতিদিনের মতো সুতি শাড়ি বাদ দিয়ে একটা জর্জেট বেছে নিলাম। বাদলাদিনের জন্য তোলা আছে আমার ডজনখানেক শাড়ি। কোনটার বয়স পাঁচ, কোনটার দশ আবার কোন-কোনটার তিরিশ বছরেরও বেশি। বলাবাহুল্য বেশিরভাগই উপহার হিসেবে পাওয়া, আর বাকী সব আম্মার আলমারি থেকে মেরে দেওয়া।
স্নানাহার শেষে তৈরি তিন দশক আগের মায়ের পুরনো একটা জর্জেট শাড়িতে। আমার আটপৌরে মা দক্ষিণ গোলার্ধের অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে চল্লিশ দিনের সফর শেষে গতকালই বাড়ি ফিরেছেন। সেইসব কথা ভাবতে ভাবতে মিনিট তিনেকের মাথায় শাড়ি পরা সারা। হাতে এখনও কয়েক মিনিট সময় আছে। চোখ বুলাই মুঠোফোনে। খবর দেখার আগেই চোখ পড়ে যায় সহকর্মীর পাঠানো এক সূত্রে (লিংক)। বাঙালি মেয়ের চিরদিনের পোশাক শাড়ি নিয়ে স্বনামধন্য গুণীজন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এক প্রবন্ধ নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
আর এক সেকেন্ড সময়ও নেই হাতে। ছুটতে হবে গলির মোড়ে, শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গামী বাস ধরার জন্য। এমন সময় জরুরি বার্তা- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ শাটল ট্রেন চলছে না। চলবে না শিক্ষক বাসও। অনির্ধারিত ছুটি মিলে গেল! কি আর করা! আমার কর্মক্ষেত্র এমনই, ছাত্ররা চাইলেই পরিবহন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে আমাদের ছুটি মঞ্জুর করতে পারে। ওদের নিজেদের তাতে ক্ষতি হচ্ছে কিনা সেটা বিবেচনা করার ফুরসতই নেই।
ফিরে যাই সহকর্মীর পাঠানো সেই লিংকে। মনে হল, বাজ পড়েছে মাথায়। এসব কি লিখেছেন তিনি ! সত্যিই কি তিনি লিখেছেন! আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নামে অন্য কোন লেখক কি আছেন আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে! তাঁর নামের আগে সবসময় ‘অধ্যাপক’ লেখা থাকে। প্রথম আলো’র শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকি ‘অন্য আলো’ তে প্রকাশিত ‘শাড়ি’ নামক এই নিবন্ধে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নামের আগে ‘অধ্যাপক’ লেখা নেই। নিজেকে প্রবোধ দিতে চাই- ইনি তিনি নন।
শাড়ি’ প্রবন্ধে কি লেখা আছে তা নিয়ে বোধ করি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। একরাতে হাজার মানুষ এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পাঠক মাত্রই মর্মাহত হয়েছেন ‘আলোকিত মানুষ তৈরির কারিগর’, ‘আমাদের বাতিঘর’, ‘কথার যাদুকর’, লক্ষ কোটি তরুণের জীবনাদর্শ, জিয়নকাঠির কলম থেকে অবলীলায় অনর্গল বের হয়ে আসা অশ্লীল শব্দ আর বাক্যের পাহাড় দেখে।
‘সারাবাংলা ডট নেট’ এর একটি সূত্রও পাঠিয়েছেন আমার সেই সহকর্মী, যেখানে দেশের চারজন বিশিষ্ট নারীর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। মূল প্রবন্ধ আর প্রতিক্রিয়া দেখে লেখককে আর যাই হোক, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলা চলে না। গতানুগতিক পুরুষদের মতো তিনিও নারীর শারীরিক সৌন্দর্যকেই বড় করে দেখেছেন। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা। আমার মতো শাড়িই যাদের নিত্যদিনের কাজের পোশাক, প্রতি সকালে শাড়ি পরার সময় তাদের একবারও কি মনে হবে না- রাস্তায়, গাড়িতে কর্মক্ষেত্রে সবাই কেমন কেমন করে দেখবে আমায়! যাকে এতদিন পরিচ্ছন্ন মনের মানুষ হিসেবে জেনে আসছি তিনি এখন সাধারণ এক রক্ত মাংসের পুরুষের মতোই নারীদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে অশ্লীল ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, যা কিনা ছাপানো হয়েছে দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকে! আমার কাছে শাড়ি তো কেবল বারো হাত কাপড়ের এক বস্ত্রখণ্ড নয়। সব শাড়ির সঙ্গে মিশে আছে গল্প, অনেক স্মৃতিকথা, ইতিহাস। শাড়ি আমার পরিচয়।
আরও ভাবছি আমার মেয়েকে কি বলব। সে-তো জানে এই ‘বাতিঘর’ আমার কাছে কতটা শ্রদ্ধার, ভালোবাসার। ওর বয়স যখন সাত কি আট, তখন একবার তাঁকে মুখোমুখি দেখার সুযোগ হয়েছিল; বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাসযোগ্য শহর মেলবোর্নে, এক বাংলা সাহিত্য সন্ধ্যায়। মেয়ে দেখেছে মায়ের আবেগ ! শীত আসি-আসি করছিল তখন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছিল সকাল হতে। অনেক দূরের পথ। দু’বার বাস বদল করতে হবে। তাতে কি, শাড়িই তো পরবো, থাকনা ওপরে ভারী ভারী জাম্পার, জ্যাকেট। পায়ের মোজাও খোলার উপায় নেই। সেই বৃষ্টি, কনকনে ঝোড়ো হাওয়া মাথায় নিয়ে ঘণ্টা খানেক দূরের অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে যাই সবার আগে। সেদিনের গল্প, মুগ্ধতা আর ভাবনা নিয়ে লিখেছিলাম একখানা গদ্য, ‘আলোর ঝর্নাধারা’ নাম দিয়ে। ছাপাও হয়েছিল তা জাতীয় দৈনিকের শনিবারের ক্রোড়পত্রে। অনেকে নাম করেছে। সযত্নে সংরক্ষণ করে চলেছি মেয়ে ও মেয়ের বাবাকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে তোলা ছবিটা। সেদিন তিনি বলেছিলেন, আলো আসবেই। আগেই জানতাম ফিরে আসব। তাঁর কথায় নতুন করে ভরসা পেলাম। ফিরে এলাম মাটির কোলে, মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে, তবে কাঁদিয়ে।
সাত বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে মানিয়ে চলার এই যুদ্ধে তাঁর কথা ও লেখা বড় শক্তি আর সাহস যোগায় আমায়। তিনি আমাদের পরিবারে সারাক্ষণ উচ্চারিত। চায়ের আসরে, খাবার টেবিলে এমনকি আম্মার কাছে গেলেও সাধারণ আলাপচারিতায় তিনি চলে আসেন ক্ষণে ক্ষণে। ‘আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সমগ্র ৬’ ছিল এবারে আমার মায়ের সফরসঙ্গী। সঙ্গে অ্যানা ফ্রাঙ্কের দিনলিপির বঙ্গানুবাদ।
বছর পাঁচেক আগের মেলবোর্নের সেই সাহিত্য সন্ধ্যা আমায় অনেক কিছু দিয়েছিল। তাঁকে একবার চোখের দেখা ছিল স্বপ্ন পূরণের মতো। সেইসঙ্গে নতুন কিছু মানুষকে পেয়ে যাই জীবনে, যারা আজও আমার পরমাত্মীয়। তাঁদের দু’একজনের সঙ্গে ইতোমধ্যে মতবিনিময় হয়েছে। তাঁরাও মর্মাহত, বজ্রাহত। আমাদের নাগরিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে সমস্যার অন্ত নেই। গাঁও-গেরামে, নগরে-বন্দরে, সড়কে, জলেতে, কারখানায়, শিক্ষালয়ে, চিকিৎসালয়ে দুর্ভোগ, যাতনা বিরামহীন। পায়ে পায়ে ঘোরে মৃত্যু, বিভীষিকা। মেয়েদের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গিন। আমরা চাতকের মতো বসে থাকি বাতিঘর হতে নেমে আসবে আলোর ঝর্ণাধারা, আসবে দিক নির্দেশনা। কত বিষয় নিয়ে কথা বলার আছে তাঁর! শ্রদ্ধা ভালোবাসার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকে তিনি এসব কি লিখলেন! লেখার হাত সুন্দর যার, তার কলম দিয়ে অসুন্দর লেখা বের হলে, তাকে কি বলা যায় ভেবে পাই না। শুধু কি মেয়ে? ছাত্র ছাত্রীদেরকে কথায় কথায় বলা হয় তাঁর কথা। বক্তৃতা ভাষণে তাঁর থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ফেলি যখন-তখন।
এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গ- দিন কয়েক আগে অন্তর্জাল মারফত জানতে পারি, মাদার তেরেসা নাকি মানবতাবাদী ছিলেননা। মৃত্যুশয্যায় রোগীদের ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত করতেন। মরণাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হতোনা, যদিও তিনি নিজের চিকিৎসা করিয়েছিলেন ইউরোপের নামীদামী হাসপাতালে। বিশ্বের নামকরা দাতা সংস্থার দান করা অর্থ দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় না করে দারিদ্র ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে প্রচার করতেন। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য কলকাতায় স্থাপিত তাঁর দাতব্য প্রতিষ্ঠান নাকি অনেক দরিদ্র শিশুকে বিক্রি করার কাজে নিয়োজিত ছিল। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সব কথা হয়তো সত্য নয়।
আমি ভাবছি কার কাছে যাবো আমরা! মাদার তেরেসা’র কথাও বড় মুখ করে বলি মেয়েকে। ওর বাংলা পাঠ্য বইয়ে তাঁকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধের অচেনা বাংলা শব্দগুলো ভাল করে বুঝিয়ে মা-মেয়েতে মিলে প্রশ্নোত্তর তৈরি করেছিলাম মাস দুয়েক আগে। এমনি করে আমাদের পরম বিশ্বাস, ভালোবাসা, নির্ভরতার স্তম্ভগুলো নড়বড়ে হয়ে গেলে আমরা কার কাছে যাবো? আমাদের সন্তানদের কার গল্প শোনাবো? আলো তবে কি আসবে না আমাদের ভূপৃষ্ঠে?
শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x