আজও হাতছানি দেয় পিকাসো

আহছানুল কবির রিটন

বৃহস্পতিবার , ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
13

১৯৮৪ সাল। জামালখানে বন্ধু খানের বাড়ির ছাদে বৈকালিক আড্ডায় সৈয়দ তারেক আলম (বর্তমানে কানাডায়), কায়সার মোহাম্মদ ইসলাম (মিউজিক কম্পোজার), সৈয়দ কামরুল হাবীব (বর্তমানে সাংবাদিক), গিটার হাতে বিকেলটা মাতিয়ে রাখতেন। কোলকাতার মহীনের ঘোড়াগুলোর গান, সোলস আর ইংরেজি গানই ছিল মূলত: তাদের প্রিয়। সে সময় চট্টগ্রামে খুব বেশি ব্যান্ডও ছিল না। ছিল না পর্যাপ্ত বাদ্যযন্ত্র। টেবিল চাপড়িয়ে অ্যাকোস্টিক গিটারের সুরে এই তিন তরুণ স্বপ্ন দেখতেন ব্যান্ড করার। মূলত: সঙ্গীত পরিবারের সদস্য হওয়ায় এদের হাতে সব বাদ্যযন্ত্রই সুর তুলতো। উচ্ছ্বল ছাত্র জীবনের সেই স্বপ্ন নিয়ে গঠিত হলো ‘অ্যালার্ম ব্যান্ড’। তিনজনই লিখেছেন গান তবে সুর করতেন কায়সার। কায়সার ঝানু গিটার ও পিয়ানো বাদক। ‘অ্যালার্ম’ বাদ্যযন্ত্রের অভাবে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৮৯ সালে কামরুলের সাথে পরিচয় হয় কাতালগঞ্জের মিন্টুর। মিন্টুর ছিল একটি পুরাতন ড্রামস্‌ সেট। সেই ড্রামস্‌ সেট দেখতে মিন্টু কামরুলকে নিয়ে যান মিন্টুর বাসায়। কামরুল ড্রামস্‌ সেটটি সেটিং করে বাজালে মিন্টু প্রস্তাব দেয় ব্যান্ড করার। মূলত পাঁচলাইশ পুরাতন পাসপোর্ট অফিসের সামনে মিন্টুর ছাদে জন্ম নেয় ‘পিকাসো’ ব্যান্ড। নামটি রাখেন কামরুল। ‘পিকাসো’ গঠনে যুক্ত হন বাংলাদেশ বেতারের সুরকার হাসান ও ব্যান্ড ম্যানেজার বাবুল। পরে ভোকালে আসেন তরুণ বয়সের নাজিম ও কিশোর ডিউক। কি বোর্ডে লাভলু, লিট গিটারে নিম্মু ও আজাদ। বেস গিটারে টুটুল। প্র্যাক্টিসের জন্য কাতালগঞ্জের একটি রুমের ব্যবস্থা করেন মিন্টু। পুরাতন বাদ্যযন্ত্র দিয়ে নিয়মিত প্র্যাক্টিসে পিকাসো খুব অল্প সময়ে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। পরে অরফিয়াস ব্যান্ডের সাউন্ড সিস্টেম কিনে পিকাসোর অনুশীলন সুনিপুণ হয় এবং খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। মূলত: মেলোডি নির্ভর ও রিদমিক গান নিয়ে পিকাসো শ্রোতাদের মন ভরিয়ে তোলে। ইংরেজি গানের জন্য কায়সার অতিথি শিল্পী হয়ে আসতেন। লিড গিটারিস্ট নিম্মু বড়ুয়া নিয়মিত ইংরেজি গান করতেন। এছাড়া নজরুলও অনেকদিন ইংরেজি গান করেছেন পিকাসোতে। আজম খানের গান অবিকল গাইতেন নূর-ই-আকবর। ফলে পিকাসো তখন রোমাঞ্চকর একটি দল। নগর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পিকাসোর অনুষ্ঠানের তখন দারুণ কদর।
পিকাসো ব্যান্ডে যারা বাজিয়েছেন তাদের তালিকা দীর্ঘ। কারণ ১৯৯০-৯১ সালে পিকাসো ব্যস্ত ব্যান্ড। ব্যান্ডের সদস্যরা ছাত্র হওয়ায় শো করা সকলের পক্ষে সম্ভব হতো না। প্রায় সময় পিকাসোর সাথে বাজিয়েছেন লিট গিটারিস্ট সাচ্চু (প্রয়াত), কি বোর্ডিস্ট টিঙ্কু, বেসিস্ট চঞ্চল, বার্মার গিটারিস্ট চয়, রোকন, বিটুসহ আরো অনেকে। পিকাসোর মূল আকর্ষণ ছিল ড্রামস। কামরুল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভিন্ন মাত্রার ড্রামিং করে মাতিয়ে তুলতেন দর্শকদের। এলআরবির ড্রামার রোমেলের হাতেখড়ি কামরুলের হাতে। বন্ধু বিষুর অনুরোধে ভাগ্নে রোমেলকে ড্রামস বাজানো শেখান কামরুল পিকাসোর প্র্যাকটিস রুমে। লাকি আখন্দ, আজম খান, মাইল্‌স, সোলস্‌, ফিডব্যাক, ডিফর‌্যান্ট টাচ ব্যান্ডের জনপ্রিয় গান ছাড়াও পিকাসোর পরিবেশনায় ছিল মান্না দে, শিবাজির বেশ কিছু গান। ঈগলস, বিটলস, বব্‌ মার্লে, কেনি রজার্স, ক্লিফ রিচার্ড, এরিক ক্লিপটন, স্টিভি ওয়ান্ডার, ক্রিস ডি বার্গ, ডায়ার স্ট্রেজ সহ পাশ্চাত্যোর টপ চার্টের সব গানই পিকাসো পরিবেশন করেছে থার্টি ফাস্ট নাইটের অনুষ্ঠান সহ অভিজাত অনুষ্ঠানে। গহিরা কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠানটি ছিল পিকাসোর স্মরণযোগ্য কনসার্ট। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়াও রাজনৈতিক অভিষেক অনুষ্ঠানে পিকাসো দর্শক মাতিয়েছে। নিজেদের বেশ কিছু গান কম্পোজ হলেও তা শেষ পর্যন্ত অ্যালবাম আকারে প্রকাশিত হয়নি। দুরন্ত জীবনের এক ঝাঁক তরুণ কেবল সংগীতকে ভালবেসে দর্শকদের মন কেড়েছিল তা এখনও স্মৃতি হয়ে আছে। পিকাসোর সোনালী অতীত নিয়ে ব্যান্ডের অন্যতম উদ্যোক্তা ও ড্রামার কামরুল বললেন, সঙ্গীত রক্তের সাথে মিশে আছে। আমরা যখন মিউজিক নিয়ে কাজ করেছি তখন এখনকার মত ফোকাস হওয়ার সহজ মাধ্যম ছিল না। ফলে অনেক প্রতিভা বিকশিত হতে পারেনি।
পিকাসো পুনর্গঠন করবেন কি না জানতে চাইলে এই ব্যান্ড সদস্য বললেন, ব্যস্ত জীবনে এখনও মিউজিক কাছে টানে। পিকাসোর সদস্যরা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গেছে। তবুও চট্টগ্রামে যারা আছে তাদের নিয়ে আবারও শো করার ইচ্ছা আছে কোন একদিন।

Advertisement