আগুনের পরশমণি

কাঞ্চনা চক্রবর্তী

সোমবার , ২৬ মার্চ, ২০১৮ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ
110

ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।

তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) আমাদের স্বাধীনতা গৌরব মাখা অনেক কষ্টের আর ত্যাগের এক ইতিহাস। এ দেশে জন্মেছি বলে আমি গর্বে মাথা তুলে পৃথিবীর বুকে দাঁড়াতে পারি।আমার জাতীয় সংগীত আর পতাকা আমার অহংকার ও গর্ব। লালসবুজ রং মিশে আছে আমার অস্তিত্বে। এই ভালবাসার সাথে কোন কিছুর তুলনা হয় না। জাতীয় সংগীত মাতৃদুগ্ধ সমতুল্য। আমি সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে বলতে পারি, দেখ আমার রয়েছে সুধামাখা একটি জাতীয় সংগীত। লালসবুজের পতাকা বুকে জড়িয়ে বলতে পারি, এই পতাকা শুধু আমার। আমাদের গৌরবের অনন্য প্রতীক আমাদের জাতীয় পতাকা। আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর হাত ধরেই মূলতঃ এই উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে গেছে।একাত্তরের সংগ্রাম ছিল মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। অন্যায়, অবিচার,অনাচার, জুলুম আর নির্যাতন অর্থাৎ অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ মূলতঃ হয়েছিল অন্যায় আর অসত্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে। সেই মুক্তি সামাজিক, রাজনৈতিক আর ধর্মীয় চেতনার মুক্তি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলসাম্য,মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার।মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অন্যতম প্রেরণা অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ। ১৯৭১ সালে বাঙালির সম্মিলিত জাগরণে মুছে গিয়েছিল উঁচুনিচু, ধনীদরিদ্র, হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা এই চেতনাবোধকে শুধু আঘাত করেনি তাকে বারে বারে ক্ষত বিক্ষত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা হল গণতান্ত্রিক চেতনা। শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক একটি দেশই ছিল সকলের কাম্য। যা অর্জিত হয় সেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং উদিত হয় কাঙিক্ষত সূর্য। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী কালে এখনও পর্যন্ত আমরা গণতান্ত্রিক চেতনায় বার বার হোঁচট খেয়েছি। তবুও আমরা নিরাশ হইনি।প্রতিটি সংগ্রাম একাত্তরের পথ ধরে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে চলার শক্তি ও প্রেরণা দান করেছে। স্বাধীন দেশে নারীর জাগরণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতার চেতনাজাত। নারীরা আজ শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু যেদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পীকার নারী সেদেশে নারী নির্যাতনের নিত্য নতুন রূপ আমাদেরকে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? মার্চ মাস বাঙালি জাতির জন্য বহুমাত্রিক গুরুত্বের মাস।অগ্নিঝরা এই মাস বাঙালি জাতিকে তার নিজস্ব অধিকার থেকে বঞ্চিত করার, প্রতিবাদ করার ও অধিকার আদায়ের একটি মাস।এই মাসেই আমাদের জাতির পিতার জন্ম। এই মাসেই তাঁর বজ্রকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হয়েছিল স্বাধীনতার। আর ২৬শে মার্চ শুরু হয়েছিল শৃঙ্খল ভাঙ্গার লড়াই। ৭ই মার্চের একটি ভাষণই সমগ্র বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। এই ঐতিহাসিক ভাষণ আজ শুধু আমাদের একার নয়। সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য প্রেরণার এক চিরন্তনী উৎস হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা বাঙালি জাতি শুধু ভাগ্যবানই নই।আমরা বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পুষ্ট। তাইতো তিনি সকল অপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আর তাঁর ক্ষমাকে অভাগা জাতি দুর্বলতা ভেবে নিজ পিতাকেই হত্যা করতে একটুও দ্বিধা করেনি।এর সাথে সাথে রচিত হল ইতিহাসের এক কলংকময় অধ্যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মত সাহসী আর সংগ্রামের ইতিহাসকে কেন আমরা এখনও সঠিকভাবে লালন করতে পারিনি? স্বাধীনতার চেতনা কথাটি আজ বহুল ব্যবহারে ক্ষত বিক্ষত। সভা সমিতি ও সেমিনারে যারাই এই চেতনা নিয়ে বক্তৃতা দেন তারাই তাদের কর্মকাণ্ডে বিপরীত স্রোতে সাঁতার কাটে। ফেব্রুয়ারির পরে যখনই মার্চ আসে তখনই তাদের চেহারা বদলে যায়। আর মার্চ শেষে দেখা যায় তাদের উল্টো চরিত্র। তাইতো স্বাধীনতার এতটা বছর পরেও আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আমরা এখনও তুলে ধরতে পারিনি।এই ব্যর্থতা আমাদের সকলের। ইতিহাস আমাদের কখনও ক্ষমা করবে না।কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয়, এই ব্যর্থতা বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদেরকে কেন পীড়িত করে না? এরই কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। অথচ যে ধারণ স্রোতস্বিনী নদীর মত কলকল করে বয়ে যাওয়ার কথা। আমাদের মেধা ও মননকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য পাকীরা যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করেছিল তার প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত। আমরা ক্রমশঃ মেধাশূন্য হয়ে পড়ছি। নতুন প্রজন্ম জ্ঞান চর্চার চাইতে নিজেকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাদের কাছে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস ও চেতনাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি বলে তাদের মধ্যে কোন দেশপ্রেম কাজ করে না। কিন্তু তাদের রক্ত দেশপ্রেমে টগবগ করে ফুটার কথা। তারা কিসের পিছনে ছুটে চলছে তা নিজেরাই জানে না! নতুন প্রজন্ম অভিভাবকহীনভাবে কোন দিক নির্দশনা ছাড়াই জীবনের পথে এগিয়ে চলছে। শৈশবের ভালবাসা আর যৌবনের ভালবাসা আজ তাদের কাছে মূল্যহীন। আবেগ, মায়া মমতা আর ভালবাসার বাঁধনে যে জাতি থাকার কথা আজ যেন তারা জীবন্মুত।

একটি দেশের স্বাধীনতা সর্বাপেক্ষা সাধনার ধন। আর আমাদের সবচেয়ে দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার এতটা বছর পরও আমরা স্বাধীনতার পক্ষে দ্বিধাবিভক্ত। ৭১ এর বজ্রকণ্ঠে সকল বাঙালি এক হলেও কোন অশুভ শক্তির গোপন ইশারায় এমন করে নির্লজ্জ হয়ে গেলাম।মনে রাখতে হবে, লালসবুজ আমাদের অহংকার আর এর চেতনা সকল অপশক্তিকে ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু কেন আজ আমরা এতটা বুদ্ধিজ্ঞানহীন অসার জাতিতে পরিণত হচ্ছি? বাঙালি জাতি তার মূল স্রোত ধারণ থেকে কতদূরে সরে যাচ্ছে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এমনিতেই হুজুকে বাঙালি। যা পাই তা নিয়ে কিছুদিন হৈ চৈ করি। আবার নতুন কোন বিষয় নিয়ে মেতে উঠি। একটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির চেয়ে কলংকিত আর কিছুই হতে পারে না। এই বিকৃতি আমাদেরকে প্রজন্মান্তরে বহন করতে হবে।আর তার ফলাফল কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা বর্তমান যুব সমাজকে দেখলেই অনুমেয়। আমাদের দেশে আজ স্বাধীনতাকে নিয়েও বাণিজ্য চলছে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের জীবনে সার্বিক স্বাধীনতার মূল্য অসীম। দেশের প্রতিটি মানুষ বিশেষত উপজাতি ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী জনগণ যখন নিজেদের স্বাধীন বলে মনে করবে তখনই দেশের স্বাধীনতার মূল্যায়ন যথার্থ হবে। মানুষ যখন নিজ মাতৃভূমিতেই অনিরাপদ ও ভীত সন্ত্রস্ত হয় তখন নির্যাতিত জনগোষ্ঠী কিভাবে এদেশে স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করবে? আইনি শাসন শিথিলতার কারণে, সুশাসনের অভাব আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদেরকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দুগ্ধপোষ্য কন্যাশিশু যখন পিতাসম নরপশু দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন সত্যিই ভাবিত করে এসব কিসের ফল? এর থেকে উদ্ধারের উপায়ই বা কি? স্কুল কলেজগামী কোমলমতি সন্তানরা যাদের নিত্যসঙ্গী হওয়ার কথা ছিল বই। যেই বই থেকে সে খুঁজে নিবে আনন্দ সুধা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বার বার পরিবর্তিত ও পরীক্ষিত হওয়াতে কোমলমতি শিশুরা শিক্ষার আনন্দ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা আজ তাদের কাছে পরীক্ষা পাসের চ্যালেঞ্জ। এটি আমাদের জন্য বিপদ সংকেত। প্রতিদিনই নিত্য নতুন কিশোর অপরাধের খবর পাচ্ছি ও শংকিত হচ্ছি। এই মহান মাসেই যদি এমন অপরাধ ঘটে তাতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, সামাজিক মূল্যবোধ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে?

সবকিছুর পরেও আশার আলো উদ্ভাসিত হয়। সেই আলো আমাদের স্বাধীনতার বই মেলা। স্বাধীনতার চেতনা আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি দান করেছে। তার প্রমাণ আমাদের স্বাধীনতার বই মেলা। স্বাধীনতার বই মেলা বাঙালির সার্বজনীন আনন্দোৎসব। এই মেলা আজ দেশের সকল বিভাগীয় শহরে এনেছে প্রাণের স্পন্দন। ছুটে চলা ব্যস্তময় নাগরিক জীবনে বই মেলা মানুষকে পরস্পরের সাথে সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আমােেদর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অবিনাশী চেতনাকে ধারণ করতে হবে। অগ্নিঝরা মার্চ মাসেই আবার জ্বলে উঠুক স্বাধীনতার চেতনার অনির্বাণ শিখা। সকলের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে গড়ে উঠুক নতুন এক জাতি। যে জাতি গড়বে এক মানবিক বোধ সম্পন্ন নতুন সমাজ ও জীবন ব্যবস্থা। সংস্কৃতির হাত ধরে এগিয়ে চলুক শিক্ষা ব্যবস্থা। এক নিরাপদ সমাজে নারী, নারী শিশু ও শিশুরা পাক নিরাপত্তা। স্বাধীনতার প্রদীপ্ত শিখা জ্বলুক সকল প্রাণে। সাম্প্রদায়িকতার বিনাশ ঘটুক মন ও মননে আগুনের এই পরশমণি ছুঁয়ে যাক সকল প্রাণ।আর এই চেতনাতে পুঁড়ে শুদ্ধ হোক সমগ্র বাঙালি জাতি। অবশেষে বলি—-

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।

এ জীবন পুণ্য করো দহন দানে।।’’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

লেখক : প্রাবন্ধিক ও প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, নিজামপুর কলেজ।

x