আকর্ষণের শেষ নেই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ
24

হাসান আজিজুল হক গল্প বলেন, গল্প বলতে ভালোবাসেন, চমৎকারভাবে গল্প বলতে জানেন। তাঁর এই গুণের কথা তাঁরা সবাই জানেন যাঁদের সৌভাগ্য হয়েছে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জানবার। যেমনটা আমার হয়েছে। কিন্তু তাঁর ওই গুণের খবর তাঁর পাঠকরা বিলক্ষণ রাখেন। যে জন্য তাঁর প্রতি তাদের আকর্ষণের শেষ নেই। তাঁর লেখা খুব সহজে কাছে টেনে নেয়, কৌতূহল ধরে রাখে, এবং তাতেই শেষ হয় না, ওই সঙ্গে ভাবিয়ে তোলে, চিন্তিত করে। গল্প তিনি জীবন থেকে সংগ্রহ করেন, বোঝা যায় তাঁর কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা সব সময়ে সজাগ; কিন্তু এই গল্পগুলো কেবল গল্প নয়, এদের প্রত্যেকটিতে উপাদান থাকে চিন্তার। তিনি চিন্তা করেন, চিন্তা করে লেখেন, অভিজ্ঞতাকে সজীব করেন কল্পনার সাহায্যে, তাকে গভীর করেন চিন্তা দিয়ে। কোনো সাহিত্যই মহৎ হয় না যদি তার ভেতর ওই চিন্তাটা না থাকে। হাসান আজিজুল হক জীবন ও জগৎ সম্পর্কে গভীর ভাবে ভাবেন; লেখায় তাঁর ভাবনাগুলো একেবারেই স্বাভাবিক রূপে চলে আসে। তিনি নিজে বোঝেন, পাঠককে বুঝতে সাহায্য করেন। হাসান আজিজুল হক দর্শন অধ্যয়ন করেছেন, অধ্যাপনা করেছেন দর্শন বিষয়ে এবং তাঁর কাজ একজন সাহিত্যিকের, তাঁর লেখায় দর্শনের সঙ্গে সাহিত্যের যোগটা ঘটেছে একেবারে ভেতর থেকেই।
তাঁর বলবার ধরনটা সম্পূর্ণ নিজস্ব। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় তাঁর ভাষার। পড়তে শুরু করলেই বোঝা যায়, এভাষা অন্য কারো নয়। কেবল কথাসাহিত্যে নয়, তাঁর প্রবন্ধেও ওই বলবার ধরন এবং ভাষার ব্যবহার বলে দেয় যে তিনি তাঁর নিজের মতোই। সবসময়ে।
আর দেখি সংযম। তড়িঘড়ি করে লেখেন না, যা লেখেন অত্যন্ত যত্ন করে লেখেন। পরিশ্রম থাকে নিশ্চয়ই, কিন্তু পরিশ্রমের ছাপ থাকে না, শিল্পের কারণে। তাঁর লেখা প্রবন্ধের ভেতরেও ওই সংযমটা দেখি। আড়ম্বর থাকে না, থাকে না অতিরেক, আর সে জন্যই অনেক দিন মনে থাকে, পড়বার পরে।
সংযম দেখি আরও একটা জায়গাতে। তিনি রাজধানীমুখী নন। রাজধানীকেই বরং নিয়ে যেতে চান রাজশাহীতে। রাজশাহী তাঁর কর্মক্ষেত্র, কিন্তু নিতান্ত বাধ্য হয়েই সেখানে ছিলেন, কর্মজীবন শেষ হয়ে যাওয়া মাত্র ঢাকায় ছুটতে হবে, এমন কোনো অস্থিরতা তাঁর মধ্যে ছিল না। না-থাকায় ঢাকার ক্ষতি হয়েছে, লাভ হয়েছে রাজশাহীর। রাজশাহী আমার কৈশোরের শহর। এখন গেলে চিনতে পারি না, কারণ পদ্মা নদী আর নেই। কৈশোরে দেখতাম ওই শহরের একটা সাংস্কৃতিক জীবন আছে; পদ্মা শুকালেও ওই জীবনটা কিন্তু শুকায় নি, এবং তাকে সজীব রাখার কাজে হাসান আজিজুল হক যে ভাবে দায়িত্বপালন করেন সে জন্য তাঁকে অতিরিক্ত অভিনন্দন।
সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে বেদনা থাকে। হাসান আজিজুল হকের লেখার ভেতরে যেমন লেখার পেছনেও তেমনি গভীর বেদনা যে আছে সেটি টের পাই। ব্যক্তিগত বেদনা সকলেরই থাকে, থাকবেই; তবে আমাদের সমষ্টিগত বেদনার বিশেষ ক্ষেত্র দু’টি। একটি সাতচল্লিশের, অপরটি একাত্তরের। সাতচল্লিশের ঘটনা তাঁকে শরণার্থী করে ওপার থেকে এপারে নিয়ে এসেছিল, একাত্তরে এপারেই সবাই আমরা উৎপাটিত হবো এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ওই দুই ক্ষতিকে আমরা নানাভাবে ধারণ করে চলেছি; হাসান আজিজুল হক ধারণ করেছেন তাঁর সৃষ্টিশীলতার ভেতরে। একাজ সৃষ্টিশীলরাই শুধু পারেন।
ব্যক্তিগত কথা বলি। হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর লেখার মধ্য দিয়েই। অনেককাল আগের কথা; কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে। আমি তখন যুক্ত ছিলাম মাসিক পত্রিকা পরিক্রমের সম্পাদনার কাজের সঙ্গে। সম্পাদকদের জন্য সবচেয়ে বড় পাওনা নতুন লেখকের সন্ধান পাওয়া। ডাকে একটি গল্প এসেছিল, নাম ‘আত্মজা ও একটি কবরী গাছ।’ প্রথমে গল্পের নামটি পড়ে, এবং তারপরেই প্রথম বাক্যটির ওপর চোখ রেখেই নিশ্চিত হয়েছিলাম একজন বড় মাপের লেখকের আগমন ঘটেছে। এরপরে তাঁর অন্য লেখা যত পড়েছি ততই নিশ্চিন্ত হয়েছি আমার ওই প্রথম প্রতিক্রিয়ার নির্ভুলতার ব্যাপারে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি আরও একটি আছে। আমার স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী মারা যান ১৯৮৯তে। তখন ওই গভীর বেদনার সময়ে অনেকেই চিঠি লিখেছেন। ফোন করেছেন; টেলিগ্রাম পেয়েছি, বাসায় এসেছেন তো বটেই। রাজশাহী থেকে হাসান আজিজুল হক যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সেই পরিচিত হস্তাক্ষরে ও ভাষায় সেটির কথা এখনও মনে পড়ে।
তাঁর সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত থাকুক, এটাই কামনা; অন্য সবার যেমন, তেমনি আমারও। তাঁর লেখার প্রতি আমার আকর্ষণের শেষ নেই, শেষ থাকবেও না।

x