আকণ্ঠ স্ব্বপ্নে…

কান্তা তাজরিন

মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
9

একটা স্বপ্ন প্রায়ই দেখি।

আ জার্নি বাই রিঙা।

সরু রাস্তা, অনেকটা যেন আলপথের মতো, দুপাশে জলাভূমি শস্যহীন জনমানবহীন। সময়টা খুব ভোর অথবা সন্ধ্যের আগ মুহূর্ত ঠিক বোঝা যায় না কি সময় সেটা। ভুলে যাওয়া, আধো মনে আসা এক বন্ধুর খোঁজ করি। রিঙাওয়ালার চেহারা কেমন মনে নাই। শুধু সে ক্লান্ত হয়ে আলপথ পেরিয়ে যখন একটা ব্রিজের উপর রিঙা রেখে ঘাম মুছে নেয়, তখন মনে হতে থাকে কী অমানবিক এই কাজ, মানুষ হয়ে মানুষকে টেনে চলা। যুক্তি স্বপ্নে কাজ করে না। আর বাস্তবে যুক্তির ঠুলি মনেমগজে এমনই চেপে থেকে যে এইসব আবেগী কথা মনে ভাসে না। জানিই তো রিঙাওয়ালারা পেডেলের রিঙা চালায়। তাদের শ্রমের দাম নিজেই ঠিক করে, মতে না মিললে বেয়াদবিও। স্বপ্নে সেসব মনে আসে না। যা আসে মনে, তা লজ্জা। এত যে ভাবলাম তার কথা, তাকে পারিশ্রমিক দেই কি না দিই মনে নাই। সম্ভবত দিই না। চলতে থাকি উদ্দেশ্যহীন। ঠিক উদ্দেশ্যহীন যে বলছি তা তো নয়। উদ্দেশ্য, ভুলে যাওয়া মনে আসিআসি এক বন্ধুর খোঁজ।

হাঁটতে হাঁটতে একটা বিরাট চৌরাস্তায় থামি, এখানে দৃশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত, মানুষ আর মানুষ। কেউ কাউকে দেখছে না। সবার খুব তাড়া। এবং টের পাই, এখানেও আমার মতো প্রত্যেকেই একা। মনে উঁকি দেয় একটা কথা হঠাৎ যদি দুর্ঘটনা ঘটে, কেউ কি এগিয়ে আসবে সাহায্যে, একেঅন্যের? কী যে হয়, ভাবনাই স্বপ্নকে চালিত করে বোধহয়। আমি এখন হাসপাতালের করিডোরে। আমার বন্ধুটা কি ভাল আছে? সুস্থ? আমার মনে না পড়া সেই বন্ধুর জন্য মন কেমন যে করতে থাকে! ঘুমের মাঝে অস্থিরতায় পাশ ফিরি হয়তো। শিশুর গন্ধ নাকে লাগে। আমি স্থির হই। স্বপ্নে আমার কোলে শিশু। সে আমার বাস্তবের সন্তান নয়! কিন্তু এত পরিচিত আমরা এখানে এই স্বপ্নে, যে এই কথাটা মনেই আসে না যে আমরা আমাদের কে হই। আমার গলা জড়িয়ে থাকে সে, আমি হাঁটতে থাকি। কোনো কথা হয় না আমাদের। শিশুটা তার হাত ইশারায় পথ দেখিয়ে দেয়, আমি সেপথ ধরে হাঁটি। শহুরে পথঘাট, সহজসোজাঢালু। চলতে চলতে যেখানে এসে থামি সেটা ইস্কুল, বাসাবাড়ির মতো দেখতে। ইস্কুল বলছি কারণ এখানে অনেক শিশু, তাদের কারু পিঠে স্কুলব্যাগ, কারু গলায় পানির ফাক্সঝুলছে। আমার শিশুটা কোল থেকে নামে কি নামে না মনে নাই, শুধু একা হয়ে যাওয়া টের পাই। কেমন যে করে উঠে মন! ওকে হারাতে চাইনি তো, কোল থেকেও নামাতে চাইনি…!

আবার কি পাশ ফিরি ঘুমে? নাকে কই গন্ধ লাগে না তো শিশুর! স্বপ্নে এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি। ইস্কুলটার ক্লাসরুমেরুমে শিশুটিকে খুঁজি। বেনীদুলানো বাচ্চা একটা মেয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়, ছবি আঁকার ঘরে। অনেক রঙ্গিন কাগজ, রঙের কৌটো, রঙ পেন্সিল, ঝিলমিল জরির গুঁড়ো, আর বিশাল বিশাল ছবির খাতা, আঁকার পাতা, অনেক শিশুহঠাৎ একা। কেউ নাই, বেনীদুলানো মেয়েটাও কোথাও নাই। দেখি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, বাড়িটার বাইরে। স্বপ্নে সময় কোনো বিষয় না, অপেক্ষাও। অপেক্ষা যতক্ষণ করার ততক্ষণই যেন করেছি। যেযে যারযার বাড়ি চলে গেল। আমার শিশুটি ওখান থেকে বেরিয়ে আসেনি। যেন স্বপ্নের কাছেও ওর অস্তিত্ব নাই, শুধু যেন আমার মনে মনেই সে ছিল, আছে। হতাশ আমি হাঁটতে থাকি। ভুলে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজি ফের। মনে মনে স্বপ্নকে এড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে শিশুটিকেও।

এখন একটা দিঘির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, হতচ্ছাড়া দিঘি একটা। পাড় বাঁধানো নাই কোনো পাড়েই। একটু যেন পথ করে রাখা হয়েছে, জলের কাছে যাবার। জলে যাই, জলটুকু ছোঁয়ার ইচ্ছায়। পা ভিজাই, হাতে নিই আঁজলা ভরে, মুখ ভিজাই, আর তর সয় না, জলে নেমে গা ভিজাই। সময় তখনও তা, না সকাল না সন্ধ্যা অদৃশ্য সূর্যালোক আর একলা আমি। জলের ভেতর কিছু কি দেখতে পাই, দেখি কি কিছু? মনে নাই। শুধু তলিয়ে যাবার অনুভূতি, ফাঁকাভোঁতাবোবা অনুভূতি। স্বপ্নেই জানি এটা স্বপ্ন, ছেড়ে দেই নিজেকে স্বপ্নের হাতেই। শুধু খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছেটা যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে স্বপ্নের দিকে, আমার দিকে। খুঁজে পাব তো ওদের? তখন হয়তো জেগেই যাই। জেগে হয়তো ঠিক করে দেই আত্মজার এলোমেলো শুয়ে থাকা ঘুমে কাদা শরীরটা। জেগে উঠেও অপূর্ণতার অস্বস্তিবোধ অস্থির করে, যেন জোর করেই ঘুম যাই , স্বপ্নের খোঁজেস্বপ্নের সেই তাদের খোঁজে। আবার সেই আল পথ, সেই রিকশাওয়ালা, দুই পাশে জলাভূমি শস্যহীন জনমানবহীন। সুর্যহীন আলোয় নাভোর নাসন্ধ্যা সময়। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালার ক্লান্তি জুড়িয়ে নেয়া, ঘাম মুছে ফেলার দৃশ্য এবং আবার আমার সামনে হাঁটতে থাকা, ভুলে যাওয়া মনে আসিআসি বন্ধুর খোঁজে আর স্বপ্নকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাওয়া শিশুটির খোঁজে

x