আঁরার আজাদী

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
30

বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা শহর থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ফেসবুকের কল্যাণে দেশের বিভিন্ন জেলায় আমার বন্ধু রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে আমি এদের অনেককে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, তাদের শহর থেকে প্রকাশিত হওয়া পত্রিকাগুলোর নাম কী। দুয়েকজন ছাড়া কেউই চট করে বলতে পারেননি। কেউ কেউ খোঁজখবর করে কয়েকদিন পরে জানিয়েছেন। এরা সকলেই মূলত ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকায় পড়ে থাকেন।
কিন্তু চট্টগ্রামের অধিবাসীদের বেলায় ব্যাপারটি অন্যরকম। এ-শহর থেকে বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। কিন্তু যে পত্রিকাটি এই শহরকে সারাদেশে এক নিমিষে প্রতিনিধিত্ব করে তার নাম ‘আজাদী’। এই পত্রিকা কেবল এই শহরের নয় এই অঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচটি জেলাসহ আশে পাশের আরও কয়েকটি জেলারও প্রতিনিধিত্ব করে ‘আজাদী’ অন লাইনে প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সারাদেশে চট্টগ্রামের পত্রিকা হিসেবে পরিচিত ছিল। অন লাইনে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সারা বাংলাদেশে তো বটেই বিদেশেও আজাদী পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন আগ্রহী পাঠকেরা।
আর দশটি জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামের অনেক পার্থক্য আছে। এই শহরের এবং এই অঞ্চলের একেবারে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
তার ভাষা, খাবার, পোশাক, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার, বৈবাহিক রীতিনীতি এমনকি এ অঞ্চলের ঘরবাড়ি নির্মাণ রীতি ও আকার প্রকার সব কিছুতে সুস্পষ্ট নিজস্বতা রয়েছে। চট্টগ্রামের ভাষা বিশ্বের ৬৯তম মৌলিক ভাষা হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে।
চট্টগ্রামের ভাষা, খাবার ও অন্যান্য ঐতিহ্যের মতোই আজাদী পত্রিকাও চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্য। এই পত্রিকার প্রতি প্রতিটি চাটগাঁইয়ার রয়েছে আলাদা একটা মমত্ববোধ ও ভালোবাসা। অনেককেই বলতে শুনেছি ‘আঁরার আজাদী’।
আজাদী নিছক একটি দৈনিক পত্রিকা হয়ে থেমে থাকেনি। এতদঅঞ্চলের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে তার নিয়ত সম্পৃক্ততা। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। কয়েকটি অবশ্যই দেওয়া উচিৎ। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর সবাই শোকে-আনন্দে বিহ্বল। কিন্তু সেই সন্ধিক্ষণে আজাদী দায়বদ্ধতার ও আনন্দ প্রকাশের মোক্ষম কাজটি করে এক পৃষ্ঠার বিশেষ সংস্করণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করে। পত্রিকাটি সেদিন ছাপা হয় লাল কালিতে। সেদিনের সেই প্রত্যুৎপন্নমতিতা আজাদীকে ঐতিহাসিক একটি মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকার সম্মান এনে দিয়েছে আজাদীকে। দ্বিতীয় কাজ-‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম।’ অসাধারণ এই আকর গ্রন্থটি প্রকাশ আজাদীর সামাজিক কর্তব্য সম্পাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। চট্টগ্রাম সংক্রান্ত যে কোনো গবেষণা যে কোনো তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনে এটি একটি অপরিহার্য বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরশীল আকরগ্রন্থ। তৃতীয় উদাহরণটি সাম্প্রতিক। চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান এলাকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাসের ম্যুরাল ও বিভিন্ন মনীষীর দেয়ালচিত্র স্থাপন করা হয়েছে সেই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক নিদর্শন স্থাপনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করেছে দৈনিক আজাদী। আমি প্রায় প্রতিদিনই দেখি খাস্তগীর স্কুল ও সেন্ট মেরীস গির্জার দেওয়ালের এসব স্থাপনাচিত্র অনেক মানুষ সময় নিয়ে পড়ছেন, দেখছেন এবং ছবি তুলছেন। এসব মানুষের বেশীরভাগই তরুণ। তাছাড়া এই অঞ্চলটা স্কুল কলেজের সম্মিলনে গড়ে ওঠা একটা শিক্ষা অঞ্চল। এখানে প্রচুর শিক্ষার্থীর দিবারাত্রির আনাগোনা। ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাদের ইতিহাসকে জানার এটি একটি সহজ পথচলতি সুযোগ। এই বড় কাজটির জন্যে জামালখান ওয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ও দৈনিক আজাদী অবশ্যই ধন্যবাদার্হ।
একসময় চট্টগ্রামের পুরোনো বটতলী স্টেশনের সামনে আজাদীর একটা বড় বিলবোর্ড ছিল যাতে বিশাল এক গোলাপের নীচে লেখা ছিল ‘আইয়ুন জে’,স্বাগতম ‘বিষ পড়সব্থএখন এটি নেই। ‘আইয়ুন জে’ চট্টগ্রামের সম্ভাষণ যা আজাদীতে ব্যবহার করে সবসময়। এই তিনটি সম্ভাষন স্থায়ীভাবে আজাদীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিমান বন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, চট্টগ্রামের প্রবেশ দ্বার মীরসরাইয়ের শুরুতে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মুখে কর্ণফুলীর মোহনায় স্থাপন করলে ভালো হয়।
দৈনিক আজাদী একটি পত্রিকা বিশেষ নয় মোটেই। এটি লেখক ও সাংবাদিক নির্মাণের বড় প্ল্যাটফর্ম। বলা ভালো কারখানা। চট্টগ্রামেরতো বটেই বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকার অনেক প্রথিতযশা সংবাদশিল্পী বা সাংবাদিক দৈনিক আজাদীতে নানাভাবে সাংবাদিকতা করে গেছেন। তেমনি আজাদীতে আজীবন কিংবা দীর্ঘদিন কাজ করে গেছেন অনেক অগ্রজ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক যাঁদের অনেকে এক্ষেত্রে কিংবদন্তী।
তেমনি প্রচুর কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যেকের আঁতুড়ঘর দৈনিক আজাদী। যাঁদের প্রায় সকলেই দেশজোড়া খ্যাতিমান। আমার মতো একজন অকিঞ্চিতের কথাই বলি। আজাদীতে কলাম লেখার কারণে আজকের এই সামান্য পথটুকু পর্যন্ত পৌঁছা। আজাদীর পাঠক আমি খুঁজে পেয়েছি বেনাপোলে, সিলেটে খুলনায় এমনকি কলকাতায়, শিলিগুড়িতে। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে যাদের পেয়েছি তারা চট্টগ্রাম থেকে গেছেন। এখানে থাকাকালীন আজাদী পড়েছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পরেও চট্টগ্রাম যেমন মনে রেখেছেন তেমনি ভোলেননি আজাদীকে। দেশের বাইরে যারা আজাদীর কথা জিজ্ঞেস করেছেন তাঁরা বেশীরভাগই চট্টগ্রামের লোক বটে, তবে অনেকেই যারা চট্টগ্রামের নন তারা চট্টগ্রামের সূত্রে আজাদীর কথা জেনেছেন। অর্থাৎ চট্টগ্রাম আর আজাদী যেন সমার্থক দুটি নাম।
আমার পিঠে সীলমোহর পড়ে গেছে আমি আজাদীর লেখক। আজাদীর আগে অন্য পত্রিকায় লিখতাম। আজাদীর পাশাপাশি অন্যান্য পত্র-পত্রিকায়ও লিখি। কিন্তু আমার বেশীরভাগ লেখা প্রকাশিত হয়েছে আজাদীতে। কোনো একটা লেখা লিখে চেতনে অবচেতনে ছুটে যাই আজাদীতে। এখানে লিখছি ১৯৮৬ সাল থেকে। এরকমও হয়েছে, অন্য পত্রিকার জন্যে লেখা কোনো প্রবন্ধ আমি ভুল করে আজাদীতে জমা দিয়ে এসেছি এবং তা ছাপা হয়ে গেছে। সেই পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক তা দেখে বলেছেন, ‘ও আপনিতো আজাদীর লেখক।’ অনেক ঋণ আজাদীর কাছে। সেই ঋণ শোধ করতেও চাই না। রয়েছে আরও অনেক স্মৃতি। সেটা আজাদীর ৬১ বছর পূর্তিতে লেখার ইচ্ছে রইলো।
৬০ বছর পূর্তিতে অনেক ভালোবাসা আজাদীর জন্য। একটি পত্রিকার ৬০ বছর অবিরাম চলা, এ-এক আত্মশ্লাঘার বিষয়। আশীর্বাদ ও শুভকামনা, আজাদী নিরবচ্ছিন্নভাবে শতবর্ষ অতিক্রম করে আরও এগিয়ে যাক।

x