অহেতুক ভয়?

ডা. প্রবীর রঞ্জন বড়ুয়া

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
71

ভয় বা ফোবিয়া হচ্ছে হুমকি ও বিপদের প্রতি এক ধরনের আবেগ তাড়িত সাড়া। জীবনে কখনোই ভয় পাননি, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ভয় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এই ভয়ই যদি স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করে তীব্র আকার ধারণ করে অথবা ভয়টি হয় অহেতুক, তখন তা রোগ হিসেবে পরিগণিত হয়। সাধারণত একে ফোবিয়া বা ফোবিক ডিস অর্ডার বা অহেতুক ভীতি রোগ বলা হয়।

অহেতুক ভীতির লক্ষণ বা উপসর্গ

ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি পরিবেশ পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় ভীত হয়ে পড়ে। ব্যক্তির অহেতুক ভীতির কারণে তার ব্যক্তিজীবন, শিক্ষাজীবন বা কর্মজীবনের ব্যাঘাত ঘটে। ব্যক্তি বুঝতে পারে যে, তার ভীতিটি অহেতুক বা অতিরিক্ত কিন্তু ভয়টা যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না । যে বিষয় বা পরিস্থিতির ভয়ের সৃষ্টি করে, ব্যক্তি তা এড়িয়ে চলে অথবা তার মুখোমুখি হলে অতিরিক্ত উদ্বেগের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দেয়। ফোবিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি ভীতির উদ্রেককারী বিষয় বা পরিস্থির মুখোমুখি হলে যেসব শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, তার মধ্যে রয়েছে যথাবুক ধড়ফড় করা, শ্বাস কষ্ট, দমবন্ধ ভাব, বুকের মাঝে চাপ অনুভব, ব্যথা, হাত পা কাঁপা, মুখ শুকিয়ে আসা, মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘুরানো বা ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, ক্লান্তি, শরীর টান টান হয়ে ওঠা, পেটের মাঝে অস্বস্তিবোধ, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া। ভয়ের কারণে ঘরে বসে থাকা, ভুক্তভোগী প্রচণ্ড উদ্বেগ ও নিয়ন্ত্রণহীন আতংকে ভুগতে পারে। একা দূরে কোথাও যেতে পারে না, কেউ কেউ লাশ, দুর্ঘটনা দেখতে পারে না বলে টেলিভিশন বন্ধ রাখে।

কিভাবে শুরু হয়

কবরস্থান বা শ্মশান, মৃত ব্যক্তি, দুর্ঘটনার খবর, রোগী, হাসপাতাল, রক্ত ইত্যাদির ভয়। নিকট আত্মীয় কেউ হার্টের অসুখে মারা গেছে তার পর থেকেও ভয় শুরু হতে পারে। শিক্ষকদের বেতের অথবা মারের ভয়, বিমানে উঠতে ভয় ও পরীক্ষার আগে ভয়। অফিসে বসের ভয়, পোকামাকড়ের ভয় ইত্যাদি।

অহেতুক ভীতির কারণ

ভীতি মানব মনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ভীতি কেন জন্মায় মানুষের মনে এই নিয়ে নানা গবেষনা করেছেন, বিভিন্ন থিওরি দিয়েছে। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী ব্যাচম্যান ভীতি উদ্রেকের পেছনে ৩ (তিন) টি কারন চিহ্নিত করেছেন :

. ডাইরেক্ট কন্ডিশনিং

কোন ব্যক্তি যদি বাস দুর্ঘটনার শিকার হন সেক্ষেত্রে তার মধ্যে বাস সম্পর্কে ভীতি জন্মাতে পারে। এই রকম কোনো বস্তু বা বিষয় আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজে ভয় পেলে পরবর্তীতে সেই বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে ভীতি থেকে যেতে পারে। একে ডাইরেক্ট কন্ডিশনিং বলে।

. ভিকারিয়াস একুইজিশন

ভীতিজনক অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে বা কোন পরিস্থিতিতে অন্যকে ভীতিজনক আচরণ করতে দেখে ব্যক্তির মনে ভীতি জন্মাতে পারে। যেমন মাকে আরশোলা দেখে ভীতিজনক আচরণ করতে দেখলে শিশুও আরশোলায় ভয় পেতে শেখে।

. ইনফরমেশনাল এন্ড ইন্সট্রাকশনাল পাথওয়ে

কোনো বিষয়ে ভীতিজনক তথ্য বা সাবধানী শুনে শুনেও ভীতি জন্মাতে পারে। যেমন, প্রতিনিয়ত পত্রিকায়টিভিতে বাস দুর্ঘটনার খবর পড়তেশুনতে থাকলে ব্যক্তি বাসে চড়তে ভয় পেতে পারে। বাবামা শিশুকে উঁচু স্থানে চড়ার বিপদ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সাবধান করতে থাকলে শিশুর উঁচু স্থান সম্পর্কে ভীতি জন্মাতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী মতামত

স্যালিগম্যানের মতো আরেক দল বিজ্ঞানী বলেন, এই তিন ভাবেই যে সব ভয়ের সৃষ্টি হয় তা নয়। কিছু ভয় আছে, যা পাওয়ার জন্য মানুষ জন্মগতভাবেই তৈরি হয়ে আসে। প্রকৃত বা স্বাভাবিক ভীতি যেমন জন্ম নেয় উপরোক্ত পদ্ধতিতে, তেমনি অহেতুক ভীতিও জন্মাতে পারে একই পন্থায়। যেমনঅহেতুক ভীতি রোগে আক্রান্ত বাবামা বা আত্মীয়স্বজনকে দেখে একই বিষয়ের প্রতি ব্যক্তির অহেতুক ভীতি জন্মাতে পারে বা কোনো বিষয়ে নিয়মিত ভুল তথ্য বা সাবধানবানী দিয়েও অতিরিক্ত ভীতির সৃষ্টি করা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা অহেতুক ভীতির পেছনে আরো অনেক কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এই রোগে বংশগতির প্রভাব রয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এছাড়া শৈশব থেকে শিশুর মানসিক বিকাশে ত্রুটি, অভিভাবকের প্রতিপালনে ও ভালোবাসায় ত্রুটি, বিশৃংখলা পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশের অভাব, দারিদ্র্য, শৈশবে প্রিয় কারো মৃত্যু রোগ ঝুঁকি বাড়ায়। রোগীর ব্যক্তিত্বের ত্রুটিপূর্ণ ধরণও রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিভিন্ন প্রকার মনোসামাজিক চাপ, মাদকাসক্তি প্রভৃতির কারণে রোগঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির মাঝে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের সূচনা হতে দেখা যায়। জীবজন্তু, রক্ত, ঝড় প্রভৃতির ভয় শুরু হতে দেখা যায় শিশুকাল থেকেই। উচ্চতার ভয় হতে দেখা যায় সাধারণত কৈশোরের প্রারম্ভে আর কৈশোরের শেষ দিক থেকে যৌবনের শুরুর দিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ভীতির উদ্রেক ঘটে। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের অহেতুক ভীতি রোগে ভুগতে দেখা যায়।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা

স্পেসিফিক ফোবিয়ার চিকিৎসায় “সিস্টেমেটিক ডিসেনসিটাইজেশন’ নামের এক ধরনের মনোস্তত্ত্বিক বিহেভিয়ার থেরাপির ব্যবহার করা হয়। তবে প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রিলাক্সেশন বা শিথিলায়ন পদ্ধতি শেখানো হয়। এরপর ব্যক্তির ভীতির বিষয়টিকে কম উদ্বেগ সৃষ্টিকারী থেকে অধিক উদ্বেগ সৃষ্টিকারীএভাবে পর্যায়ক্রমে ভাগ করা হয়। যেমনধরা যাক, কোনো ব্যক্তির কুকুরের প্রতি অহেতুক ও অতিরিক্ত ভীতি রয়েছে। এক্ষেত্রে, ধরি, কুকুর সম্পর্কীয় আলোচনায় তার উদ্বেগ হয়, কিন্তু কুকুর সংক্রান্ত উদ্বেগের মধ্যে এর মাত্রা সবচেয়ে কম। কুকুরের স্থিরচিত্র দেখা হয়তো তার জন্য এর চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করে কুকুরের সচল চিত্র বা মুভি দেখলে এইভাবে বাড়তে বাড়তে কুকুরের ঠিক পাশে তাকে দাঁড় করিয়ে দিলে উদ্বেগ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। কুকুর সংক্রান্ত ভীতিকে এইভাবে অল্পমাত্রা থেকে বেশি মাত্রা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ভাগ করে প্রথমে সবচেয়ে কম মাত্রার উদ্বেগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। এই সময় উদ্বেগ তৈরি হলে রোগীকে আগে থেকে শেখানো রিলাক্সেশন পদ্ধতিতে নিজেকে শিথিলায়ন করতে উৎসাহিত করা হয়। কয়েকবারের চর্চায় রোগী, ঐ পরিস্থিতির উদ্বেগাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে। এর পর পরবর্তী ধাপের উদ্বেগের পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে গিয়ে আবারো রিলাঙেশন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এইভাবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কম, মাত্রা থেকে বেশি মাত্রার উদ্বেগের পরিস্থিতিতে রিলাক্সেশন কমিয়ে ব্যক্তির অহেতুক ও অতিরিক্ত ভীতি দূর করা বা কমিয়ে আনা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্বেগের শারীরিক মানসিক উপসর্গ কমাতে ওষুধ ব্যবহারেরও প্রয়োজন হতে পারে। অহেতুক ভীতি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের সমস্যাটা বুঝতে পারলেও অনেক সময় লোকলজ্জায় তা প্রকাশ করে না। ফলে জীবন কাটে যন্ত্রণায়। অনেকের ব্যক্তি জীবন, শিক্ষা ক্ষেত্রে বা কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

বিজ্ঞানী চিকিৎসক হ্যানেম্যান মানুষের মনস্তত্ত্বের ওপর জোর দিয়েছেন বেশি। কারণ মনের কোন হেরফের হলেই শরীরের প্রভাব পড়ে বেশি। মনস্তত্ত্বকে বাদ দিয়ে হোমিওপ্যাথিতে মানসিক রোগীকে সুস্থ করে তোলা কঠিন। ভয় বা ফোবিয়া নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অনেক ফলদায়ক ওষুধ আছে। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা– () একোনাইট, () এলুমিনা, () এপিস, () আর্জেন্ট নাইট্রিকাম, () আর্সেনিকাম, () বোরাঙ, () ব্রায়োনিয়া, () বেলেডোনা, () ক্যালকেরিয়া, (১০) কার্বোভেজ, (১১) ক্যামোমিলা, (১২) কলচিকাম, (১৩) ডিজিটেলিস, (১৪) সিকিউটা, (১৫) ড্রসেরা, (১৬) হাইওসাইয়েমাস, (১৭) গ্রাফাইটিস, (১৮) ইগ্নেসিয়া, (১৯) কেলি কার্ব, (২০) ল্যাকেসিস, (২১) লিনিয়াম টিগ, (২২) লাইকোপোডিয়াম, (২৩) নেট্রাম মিউর, (২৪) ওপিয়াম, (২৫) প্লাটিনাম, (২৬) ফসফরাস, (২৭) পালসেটিলা, (২৮) রুটা, (২৯) স্ট্র্যামোনিয়াম, (৩০) জিংকাম, (৩১) ভিরেট্রাম এল্বাম, (৩২) সালফার উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

কাঁধের জয়েন্ট বা সংযোগস্থল শক্ত হয়ে গেলে এ অবস্থাকে বলা হয় ফ্রোজেন শোল্ডার। এ অবস্থায় জয়েন্টের মধ্যকার সাইনোভিয়াল ফু্লইড নামের এক ধরনের তরল পদার্থ কমে যেতে থাকে, ফলে শোল্ডার জয়েন্ট ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যেতে থাকে। এই রোগ সাধারণত ৪০৬০ বছর বয়সে এবং নারীদের মধ্যে বেশি হয়ে থাকে। তবে এখন ফ্রোজেন শোল্ডার ব্যথার ক্ষেত্রে বয়স কোনো ব্যাপার না, যে কোনো বয়সে যে কোনো সময় হতে পারে। যেকোনো ইনজুরি বা খেলাধুলার সময়ও হতে পারে এবং কোনো দুর্ঘটনায়ও এই ধরনের ব্যথার উৎপত্তি হতে পারে। তবে প্রায় দেখা যায় ঘুম থেকে উঠার পর সোল্ডার নাড়াতে পারছে না, এমনও অনেক মানুষ দেখা যায়।

উপসর্গগুলো

হাতের সঙ্গে ঘাড়ের জয়েন্ট ব্যথা, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, জয়েন্ট নাড়ানোর ক্ষমতা কমে যাওয়া, আক্রান্ত পাশে শুতে না পারা, হাতে দুর্বলতা চলে আসা ইত্যাদি। এই সমস্যাগুলো হঠাৎ একদিনে শুরু হতে পারে আবার কাঁধে সামান্য ব্যথা পাওয়ার পরও শুরু হতে পারে। শুরুটা যে কারনেই হোক না কেন, সমস্যা তার যাই থাকুক রোগীকে সাধারনত তীব্র ব্যথা নিয়েই চিকিৎকের কাছে আসতে দেখা যায়।

ফ্রোজেন শোল্ডার যে কারণে হয়

এই রোগের প্রধান কারণ এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। যেমনডায়াবেটিস মেলাটিস, ঘাড়ের জয়েন্টে আঘাত পেলে, কোনো কারনে জয়েন্ট অনেকদিন নাড়ানো না হলে, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ডের বা হাতের অপারেশনের পরবর্তী অবস্থায় থাইরয়েড রোগ হলে। ইনজুরিতে আঘাত, ঘুম থেকে উঠার পর ইত্যাদি।

চিকিৎসা

x