অহনা সিঁড়ি ভেঙে নামে

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ
74

অহনা বড়ো গলায় বলে,-মাঝরাতে মোবাইলে কবিতা না লিখলে হয়না? দেখেছ শরীরের কিযে অবস্থা!
বালিশে মাথাটা রেখেছে মাত্র। কোমর বালিশকে জড়িয়ে চোখ বুজে প্রসনজিৎ। অহনা সব সময় এভাবেই বলে।কানে তোলে না জিৎ।
অতি সাধারণ সে। বাসায় সারাদিন লুঙ্গি পরে থাকে। কোনো সাহিত্য অনুষ্ঠানে যাবার সময় যে কোনও প্যান্ট-শার্ট পরে বেরুয়। তা’তেও অহনার রাগ।
আজকাল চুলে পাক ধরেছে। চোখের ভ্রুতেও। গায়ের চামড়া ঢিলে। টানটান নয়।দীর্ঘ তিরিশ বছর ডাইবেটিকস রোগ ধরে রেখেছে আদরে।অনেক সময় মনেমনে বলে,- যাবার সময়তো হলো। বাবা বেঁচেছিলেন আটষট্টি বছর।ষাটতো পেরুলুম। আর কতো!
রাত বারটার শেষে ঘড়ির কাঁটা একটায় পা রাখে।আবারও অহনার কথা,-
-অতো রাত জাগবেনা। শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে ক্রমশ।
– কি করবো বলো! কবিতা কিলবিল করে মনে।
না লিখলে, -ফুড়ুত! আর হবেনা লেখা।তাই!
-কি হবে লিখে! রবীন্দ্রনাথতো হবে না!
কিছুক্ষণ চুপ থাকে জিৎ। ভাবে
অহনা ভালো, মিষ্টি মেয়ে। স্বামীর ভালোর জন্যই বলে। কিন্তু সে কবিতা, গল্পের কি বুঝে! পড়ে কোনদিন? পত্রিকা পড়বে। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যনত্ম। কুটিনাটি সব বিষয়।
জিৎ বলে,
-রবীন্দ্রনাথ হওয়া কি সম্ভব। এতো সোজা। পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ একজনই।দ্বিতীয় কেউ হবেনা।
-জানি জানি। যদি ইচ্ছে হয় কথাটি রাখবে। এবার ঘুমাও।
দরজার বাইরে থেকে ডাকে,
-দাদু,দরজা খোলো!
নারিতা ডাকে। এটা ওর নিয়ম। বিছানায় যাবার আগে একবার দাদুর কাছে আসবে।খেলবে।তারপরে ঘুমুবে।
অহনা দরজা খোলে। নারিতা বিছানায় উঠে দাদুর পাশে শোয়।টিভি দেখে।বলে,-
-দাদু, কার্টুন দেখবো।
দাদু কার্টুনে দেয়। নারিতা দেখে। ফাঁকে দাদু ঘুমায়।
নারিতার মা আসে। নারিতাকে ডাকে,
-চল মা,ঘুমাবি।
ততক্ষণে জিৎ ঘুমিয়ে পড়ে।
এতেও অহনা রাগ করে। জেগে থাকতে বলে,
-কেমন স্বামী আমার! রাতে শুয়েশুয়ে কখনো স্বামীর সাথে কথা হলোনা।
-তোমাকে কি এখনও কম ভালোবাসি? জিৎ অহনার কথার উত্তর দেয়।
একটু থেমে জিৎ আবারো বলে,
-এখনো ইচ্ছে করে বিয়ের পরপর সময়ে ফিরে যাই। জানি,সেটা সম্ভব নয়। জানো,সেইদিন কতো আনন্দের ছিলো। মা,বাবা!আমি আর তুমি।
কি আনন্দ! চাকরি-ঘুরা।বন্ধে দূরে কোথায় যাওয়া!চাইনিজ খাওয়া।
একদিন অনুপম আসে। তোমার কি আনন্দ উলস্নাস। সারাক্ষণ শুধু অনুপম! জীবন থেকে যেন সবকিছু পাল্টে গেলো।
অহনা ফেলে আসার কথা কানে নেয়না। সে ভাবে বর্তমান নিয়ে। এখন কিভাবে সংসার চলবে। নারিতাকে ইশকুলে দেবে। নারিতা এখনো অ আ ১,২, অ ই পড়া শুরু করেনি।
জিতের ছেলে অনুপম বলে,
-মা ভেবো না, নারিতার বয়স মাত্র তিন বছর দু’মাস। কদিন পরে পড়া শুরু করবে।
অনুপম ছেলেটি বড্ডো সরল। সবাইকে পছন্দ করে। ভালোবাসে। যে কারো কাজে রাতেদিনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আবার ধর্মানুরাগীও বটে। মন্দিরে কম যায়। ঘরের মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো মানুষকে ভালোবাসে। কারো ক্ষতি কামনা করেনা। বিপদে উপকার করে।
রাতে বাবাকে ব্যস্তা দেখে প্রশ্ন করে,
-বাবা কোথায় যাবেন?
-হ্যাঁরে,কাল সকালে আর কে কে তে যাবো। আমি প্রার্থনা পরিচালনা করবো।
-বাবা আমারও যেতে ইচ্ছে করে। যাবো একদিন।
-যাবে, নিশ্চয়ই যাবে। এটা একটি বোধিসত্বজীবন চর্চা কেন্দ্র। এবং গৃহী ধর্মীয়সংগঠন। নিজে নিজে ধর্মের চর্চা করা।
-বাবা,বোধিসত্ব জীবন কি?
-ওমা সেটা জানো না! বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের আগে পাঁচশত পঞ্চাশবার বোধিসত্ব জীবন লাভ করেছিলেন।
-ও তাই! বাবা বোধিসত্বটা কি?
-বোধিসত্ব জীবন হলো, প্রত্যেক বুদ্ধ ও শ্রাবক বুদ্ধের জীবন প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন। বোধিসত্বজীবন অনুশীলনের প্রক্রিয়া হলো, নিজেকে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হতে মুক্ত করতে পারলে তাতেই সন্তুষ্ট না থেকে অন্যকে উদ্ধার করার জন্য কার্যসাধন করা। তাই ষষ্ঠ পারমির পুরো শিড়্গাই হলো অন্যকে উদ্ধার করার প্রক্রিয়া। আর ঐ ষষ্ঠপারমির শিড়্গায় বোধিসত্ব জীবন চর্চা। ছয়টি পারমি হলো যেমন,
দান,-মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক দিক থেকে মানুষের জন্য, পৃথিবীর কল্যাণে সেবাদান।
শীল, -বুদ্ধ কর্তৃক নির্দেশিত পঞ্চশীল প্রতিপালন, দশকুশল কর্ম সম্পাদন।
ড়্গানিত্ম, -অন্যের প্রতি বিনয়ী হওয়া। সকল সমস্যায় ধৈর্যশীল হওয়া।
প্রচেষ্টা,-অনাকাঙিক্ষত বিষয়ে মনকে বিচলিত না করা। এবং মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষযে মুহূর্তের জন্য ও পথভ্রষ্ট নাহয়ে শেষ অবধি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
অধিষ্ঠান, -যাই ঘটুক না কেন তাকে বিভ্রানত্ম না হয়ে, সত্য ধর্মে মনকে স্‌িহর রাখা।
প্রজ্ঞা,-সকল বিষয় বসত্মু ও ঘটনার সত্যিকার আকৃতিকে দর্শন করার শক্তি অর্জন।
চেষ্টা করলে সবাই পারবে। কঠিন কিছু নয়।
-বাবা,বলেছেন সোজা। পালন করতে খুবই কঠিন মনে হয়। অনুপম বলে।
-পৃথিবীতে কঠিন কিছু নয়। চেষ্টাই বড়ো কথা।
প্রসনজিৎ ধর্ম এবং সাহিত্য নিয়ে সময় কাটে।সংসারের ধার ধারে না। অহনা রাগে! বলে,
-এই সংসার শুধু কি আমার? সবকিছুতে মাথাব্যথা একার!
-তুমি ঘরের কাজ করো, এটা মেয়েদের কাজে পড়ে। বাইরের কাজ করি আমি আর অনুপম।রাগ করারতো কিছু নেই।
অহনা চুপ থাকে।
সন্ধ্যের পর জিৎ বেরুবে। ইনসুলিন নিতে হবে।
অনুপম বাবার রুমে আসে। বাবাকে বলে,
-বাবা ইনজেকসান কিনতে যাবেন না!
-হ্যাঁ, এইতো বেরুচ্ছি।
-ডাইবেটিকসতো! ওটা দিতে ভুলবেন না।
জিৎ বেরুবার মুখে অহনা বলে,
-শৈলীতে যাচ্ছো! যাও, তাড়াতাড়ি ফিরো।
প্রথমে ইনজেকশান নেয় জিৎ। ঔষধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটু ভাবে, কোথায় যাবে! মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের সামনে বইমেলায় যাবে? না শৈলীতে?
সিদ্বানেত্ম পৌঁছুতেই পারেনা। এধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে জিৎ মনের কাছে ছেড়ে দেয়। মন বলে, শৈলীতে যাও। শৈলীর দিকে পা বাড়ায় জিৎ।
শৈলীতে পৌঁছুতেই দেখা হয় ইফতখার মারুফ, তহিদ, তসলিম খাঁর সাথে। তহিদ রেগে আছে জিৎ এর উপর। বলে, দাদা গতকাল আসেননি কেন? আসবেন বলেছেন!
পরপরে আসে কানিজ ফাতেমা। সাথে ওর জামাই, উৎপল, বাসুদেব, কেশব জিপসি, একটু পরে সবার প্রিয়জন আজিজ রাহমান, কামালভাই।
আজ শুধু আনন্দের খবর। বই বেরুল বাসুদেবের ও কেশব জিপসির কিশোর কবিতা গ্রন্থ। একরাশ আনন্দের ভিড়ে হারিয়ে যায় সবাই। সাথে ঝালমিষ্টি- চা’।রাত ন’টা তখন।জিৎ বলে,
-এবার যেতে হবে দাদা।
-আমরাও যাবো। একটু পরে। রাশেদভাই বলেন। নাথেমে আবারও বলেন ,দাদা আপনার গল্পটা একুশের বিশেষ সংখ্যায় যাচ্ছেনা। পরের শুক্রবারে যাবে।
জিৎ ভেবেছিলো বিশেষ সংখ্যায় যাবে। রাত জেগে কতো কষ্ট করে গল্পটা লিখেছিলো! মনে মনে বলে,-ক্ষতি কি! প্রকাশতো হচ্ছে। বিশেষ সংখ্যায় নাইবা গেলো।
জিৎ-এর কোনো আড়্গেপ নেই। পুরস্কার পাবার! বই বের করার। ভালো লেখার চেষ্টা করে শুধু।তার উপরে আর্থিক একটা ব্যাপার আছেতো! নিজের কোনও আয় নেই এখন। ঘর-বসা।
জিৎ বাসায় ফেরে দশটা বাজার আগে। কাপড় ছেড়ে মুখহাত ধুয়ে সোফায় বসে টিভি অন করে। অহনা ও পাশে বসে।
জিৎ আড়চোখে অহনাকে দেখে। ভাবে,ব্যাপার কি!এরকম অসময়ে অহনার বসার কারণওবা কি?
এইসবতো কখন হারিয়ে গেছে। অনেক বছর আগে এইসব চলতো। এখন সব যেন ফিকে!
অহনা মুখ খুলে,
-আগামী বৃহস্পতিবার বান্দরবন যেতে চাচ্ছি। আপনকুটিরে। ভাবনার কোর্স দশদিনের। আমার খুব ইচ্ছে, বসি।তুমি অনুমতি দিলে যাবো। জীবনটাতো শেষের দিকে। এবার একটু ধর্মকর্ম করি!
জিৎ নিজের পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। অহনার কথায়। দীর্ঘ আটত্রিশ বছরে এধরনের লম্বা সময় অহনাকে ছাড়া জিৎ কোনওদিনই থাকেনি। জিতের মনের ভেতর কি রকম করে। শ্বাস বড়ো হয়। কতোনা ভাবে, না, না তা কিভাবে হয়!অহনা গালমন্দ যতো করুক, তাতে কি? যখন ইচ্ছে তখনতো দেখে। বিশেষ করে অহনার গায়ের গন্ধটা জিতের ভীষণ প্রিয়। বাইরে অহনা যাবে নয়তো জিৎ যাবে, ফিরলে কথা হয়। পরিবারের ভালো-মন্দ বিষয়ে।
তা’ছাড়া কোনদিনও অহনা ছাড়া বিদেশ যায়নি জিত। কি কলিকাতা, ব্যাংকক, নেপাল,
জাপান।
জিৎকে চুপ দেখে অহনা বলে,
-তা’হলে তুমি রাজী না। যেতে দেবেনা?
-না,তা নয়। নিশ্চয়ই যাবে,যাবেতো!
জিৎ ঐ পর্যনত্ম বলে অন্যঘরে চলে যায়।
অহনার কষ্ট হয় জিতের এইভাব দেখে। ছি:ছি:!এই বয়সে জিতকে রেখে দূরে যাওয়াটা কি ঠিক!
রাতের বিছানায় অহনা-জিত।
জিৎ শুয়েছে অনেক আগে। চোখে ঘুম নেই।ঘরের লাইট অফ করে অহনা শোয়। কালকে বান্দরবনে যাবার কাপড়, বিছানা,বালিশ
গুছিয়ে নিয়েছে আগে। সকালে গাড়ি আসবে।ভাগ্নে ভনেত্ম পাঠাবে। সঙ্গে আত্মীয় যাচ্ছে অনেক।
অহনা জিতের চোখে হাত রাখে। উষ্ণ জল টলমল করে।অস্পষ্ট গলায় অহনা বলে,
-তোমার চোখে জল!ছিঃছিঃ! ওসব কি!
এখনও ছেলেমি করার বয়স আছে!
জিৎ অহনার কথার উত্তর দেয়না।আরো দূরে সরে যায়।
সকালে যাবার জন্য অহনা তৈরি হয়।জিৎ শোবার ঘরের সোফায় বসে অহনার যাওয়ার
ছবি দেখে। অহনা বলে,
-শানত্মা, বিজয়াদি, আমার ব্যাগ,বিছানা,পাটি,
বালিশ নীচে নিয়ে যাও। আমি আসছি। অহনা
জিৎকে প্রণাম করে বলে, শরীরের যত্ন নেবে।
সময়মতো ইনজেকশান দেবে, খাবে।
জিত অহনার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলে,
-সাবধানে যাবে। বড্ডো ঠান্ডা বান্দরবনে।ভালো থেকো।
-অনুপম টাকা দিয়েছে। তুমি দিচ্ছো কেন? তোমার লাগবে। অহনা বলে।
-রাখোইনা। ইচ্ছে হলো, দিলাম।
-ঠিক আছে,আসি!
-এসো।
শানত্মা,বিজয়া আগে, পেছনে অহনা সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামে।
জিৎ, বিনয় চোখে অহনাকে নামতে দেখে।
ভাবে,এটাই সত্যিকারের জীবন। কেউ না কাউকেতো এভাবে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে একদিন।

x