অস্থির পরিবহন সেক্টর

শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টাতে হয়রানির অভিযোগ কেন?

সোহেল মারমা

মঙ্গলবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
231

পরিবহন সেক্টর নিয়ে যাত্রী সাধারণের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার এই সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ মনোযোগ দেয়। সংস্কার করে সড়ক পরিবহন আইন। যাত্রীপথচারীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গ্রহণ করে নানা উদ্যোগ। চালকসহকারীদের আরো সতর্ক করতে জোরদার করা হয় লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা কার্যক্রম। এজন্য বিআরটিএ চট্টগ্রাম অফিসে দু’জন ম্যাজিস্ট্র্রেটও নিয়োগ দেয়া হয়। ইতোমধ্যে তারা অভিযানও শুরু করেছেন। তবে বরাবরের মত এবারও অভিযান নিয়ে অসন্তুষ্ট চালকমালিকরা। তারা ফিটনেস ও পারমিট নবায়নে হয়রানির অভিযোগ তুলে তা বন্ধসহ ৬ দফা দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তাদের দাবি মানা না হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে পরিবহন ধর্মঘটের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

তবে তাদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিআরটিএ চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, বৈধ কাগজপত্র বিহীন যানবাহনের চালকমালিকরাই অভিযানের ফলে বেকায়দায় পড়ায় তা বন্ধে এমন অভিযোগ তুলছেন।

ধর্মঘটের হুমকি : গতকাল ৬ দফা দাবি আদায়ে আল্টিমেটাম দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ। দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন থেকে তারা এই দাবি জানায়। তাদের দাবির মধ্যে ছিল, ফিটনেস ও পারমিট নবায়নে হয়রানি বন্ধ, কেস স্লিপের মেয়াদ থাকা অবস্থায় নতুন মামলা না দেয়া, সহজ শর্তে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান এবং গণ ও পণ্য পরিবহনের কাগজপত্র হালনাগাদ করার জন্য ন্যূনতম ৬ মাস সময় দেয়া। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব দাবি মানা না হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে পরিবহন ধর্মঘট পালনের হুমকি দিয়েছে সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন, আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন আহমদ। উপস্থিত ছিলেন, জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যকরী সভাপতি জহুর আহমদ, সহসভাপতি মাহবুবুল হক মিয়া, বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান ও পণ্য পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মোজাফফর আহমদ, সড়ক গ্রুপের অতিরিক্ত মহাসচিব গোলাম রসুল বাবুল, মহানগর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমীর পারভেজ জনি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির গোলাম নবী, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ চৌধুরী, চট্টগ্রামকঙবাজারটেকনাফ বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইউনুছ কোম্পানি, চট্টগ্রামবাঁশখালী যানবাহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, জাফর আহমদ চৌধুরী, অহিদুর নুর কাদেরী, মো. মহিউদ্দিন, হাবিবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম সমু, কলিম উল্লাহ কলি, সিরাজ উদ্দৌলা নিপু, বদিউল আলম মজুমদার, সাঈদ নাইম সুমন, নাজিম উদ্দিন, শাহজাহান, টিটু তালুকদার, হাসমত আলী, রিটন মহাজন, ইসহাক চৌধুরী প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকাসহ সমগ্র চট্টগ্রাম জুড়ে অভিযানের নামে বিআরটিএ ও পুলিশ প্রশাসন সড়কে অরাজকতা শুরু করেছে। একটি গাড়িকে তিনটি মামলা দেওয়া হচ্ছে, আইন না মেনে ‘টো’ করা হচ্ছে, গাড়ি চললেও রেকার দিয়ে গাড়ি টেনে নিয়ে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের কিছু সার্জেন্ট ও টিআইদের কারণে পরিবহন মালিকশ্রমিকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাছাড়া নতুন মোটর ভেহিকেল অধ্যাদেশ২০১৮ পরিবহন মালিকশ্রমিকদের নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে চালকরা ড্রাইভিং পেশা ছেড়ে দিলে এবং পরিবহন সেক্টরে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে অচিরেই পরিবহন সেক্টরে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে বিআরটিএ ও পুলিশের অভিযান বন্ধের দাবি জানানো হয়।

ফাঁসির রশি গলায় নিয়ে গাড়ি চালাব না : অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির নেতৃবৃন্দ বলছেন, ফাঁসির রশি গলায় নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি চালাবে না। গতকাল নগরীর একটি কমিটিনিউটি সেন্টারে সড়কমহাসড়কে নৈরাজ্য বন্ধ, সড়ক দুঘর্টনা প্রতিরোধ, সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের বহুমুখী হয়রানি নির্যাতন বন্ধ, সড়ক পরিবহন আইন২০১৮ সম্পর্কে সচেতন, সংগঠিত ও করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত কনভেশনে তারা এসব কথা বলেন।

সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ মুছার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কনভেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন, সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ সভাপতি আবদুর রহিম বঙ দুদু। প্রধান বক্তা ছিলেন ফেডারেশনের পূর্বাঞ্চল সভাপতি মৃনাল চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন ফেডারেশনের বিভাগীয় সভাপতি হাজী রুহুল আমিন, আবুল বাহার, রবিউল মাওলা, অলি আহামদ, হাজী আবদুস সবুর, আবু বক্কর ছিদ্দিকী, আবুল কালাম আবু, সফিকুর রহমান, মো. হারুন, মো. আলী, শেফায়েত আলম বাবু, পয়াশ মজুমদার, নুরুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, মো. ইলিয়াস, নুরুল হক পুতু প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ফেডারেশনের আঞ্চলিক কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুর রহিম।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেন, ফাঁসির দণ্ডাদেশ সড়ক ও পরিবহন সেক্টরকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। পেশাদার চালকরা পেশা ছেড়ে দেবে এবং নতুনরা এই পেশা গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিবহন শ্রমিকদের জন্য যে সুপারিশ করেছেন তা অবিলম্বে কার্যকর করা হলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

এই পরিবহন শ্রমিক নেতা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা আইনে ৩০২ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে তা কেবল পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়ে তাদের দুর্নীতির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। প্রধান বক্তা ফেডারেশনের পূর্বাঞ্চল কমিটির সভাপতি মৃনাল চৌধুরী বলেন, টার্গেট সিস্টেম, চুক্তি ভিত্তিক ও প্রাপ্তঅপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দিয়েছেন মালিকরা। এতে দুর্ঘটনার জন্য মালিকরাও দায়ী। তিনি ফাঁসির রশি গলায় দিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি চালাবে না বলেও উল্লেখ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ফেডারেশনের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুছা বলেন, শুধুমাত্র আইন করে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিসহ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি সড়ক দুর্ঘটনার দশটি কারণ চিহ্নিত করে তা অবিলম্বে দূরিভূত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে চালকদের গাড়ি চালানোর অনুরোধ করেন।

অভিযোগ ভিত্তিহীনবিআরটিএ : ছয় দফা দাবিতে পরিবহন মালিকদের ধর্মঘটের হুমকির জবাবে বিআরটিএ বলছে, পরিবহন মালিকদের অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন এমন আন্দোলনে বিআরটিএ’র দৈনন্দিন কার্যক্রমের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের দাবি, বিআরটিএ’র নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করতেই মূলত অসাধু পরিবহন মালিকরা এমন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন।

সংস্থাটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, পরিবহন মালিকেরা ঢালাওভাবে বিআরটিএ’র বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা দুঃখজনক। তিনি বলেন, হয়রানির বিষয়ে তা যে অভিযোগ করছেন তার কোনো ভিত্তি কিংবা সত্যতা নেই। আমাদের কাছে সেবা নিতে এসে হয়রানির শিকার হয়েছেন বা সেবা পাননি অন্তত এমন একটি অভিযোগও তারা দেখাতে পারবেন না। এ ধরনের হয়রানি হলে আমাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ আছে। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ তো তারা করেননি, যোগ করেন শহীদুল্লাহ।

তিনি বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিআরটিএ যেখানে শুক্র, শনিবার রাত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং যে কেউ কার্যালয়ে এসে অতি দ্রুত সেবা পাচ্ছেন, সেখানে ঢালাওভাবে বিআরটিএ’র বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করার বিষয়টি দুঃখজনক।

বিআরটিএ’র এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিআরটিএ ম্যাজিস্ট্রেট যোগদানের পর থেকেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছে। এ সময় বৈধ কাগজপত্র বিহীন যানবাহনসহ চালক, মালিকদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত আইনে মামলা ও জরিমানার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এতে করে বৈধ কাগজপত্র না থাকা চালক মালিকরা বেকায়দায় পড়ছেন। মূলত ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম বন্ধের জন্য পরিবহন মালিকরা বিআরটিএ’র বিরুদ্ধে এখন এমন অভিযোগ তুলছেন।’

একদিকে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা অন্যদিকে হয়রানির অভিযোগ তোলে ধর্মঘটের হুমকি, সবমিলিয়ে যেন এই সেক্টরে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এই সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টায় এখন হয়রানির অভিযোগ কেন? প্রশ্ন যাত্রী সংশ্লিষ্টদের।

x