অসহায় পরিবারের পাশে উড়িরচর ছাত্র ইউনিটি

সন্দ্বীপ প্রতিনিধি

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:১৯ পূর্বাহ্ণ
19

সন্দ্বীপ উপজেলার উপ-দ্বীপ উড়িরচরের বাসিন্দা সেলিম শেখ (৫৫)। হাতে কাজ নেই, মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই, এমন অবস্থায় তার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায় উড়িরচর ছাত্র ইউনিটি। তারা নিজেদের শ্রমে এবং অর্থ সংগ্রহ করে নতুন করে ঘর তৈরি করে দেয়। সেলিম শেখ তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে নিয়ে এমন এক জীর্ণ কুটিরে বাস করে, প্রথম দেখায় যে কারো কাছে মনে হবে একটি পুরাতন পরিত্যক্ত ঘর। কিন্তু এখানেই তাদের বছর পার করতে হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সেলিম শেখ আজ প্রায় আড়াই বছর ধরে জীবন্ত মুর্তি হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। ব্রেইন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড আক্রান্ত হয়েছে বছর দু’য়েক আগে। অসহায় এই দরিদ্র লোকের খবর পেয়ে তার বাড়িতে ছুটে যান উড়ির চর ছাত্র ইউনিটির সভাপতি মিলাদ দ্বীপরাজ। গিয়ে দেখেন সেলিম শেখদের মাথা গোঁজার মত ঘর নেই। দু’বেলা খাওয়ার মত খাবার নেই। তিনটি মেয়ে আর বাকহীন মৃতপ্রায় স্বামীকে নিয়ে অনাহারে দিনানিপাত করছে সেলিম শেখের বৃদ্ধা স্ত্রী। বিষয়টি তাকে খুবই নাড়া দিল। তিনি ঠিক করলেন এই পরিবারটির জন্য কিছু একটা করতে হবে। এরপর উড়িরচর ছাত্র ইউনিটির সদস্যদের সাথে নিয়ে তাদের ঘর নির্মাণের ভার কাঁধে তুলে নিলেন তিনি।
সাহায্যের জন্য হাত পাততে থাকেন নানাজনের কাছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলিম শেখদের জন্য সাহায্য চেয়ে প্রচার করার পর কিছু টাকা সাহায্যও পেয়ে যান। তাদের ডাকে সাড়া দেয় নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ও কয়েকজন প্রবাসী। তবে শেষ পর্যন্ত যত টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছে, সেটা দিয়ে থাকার মতো একটা ঘর তৈরি করা সম্ভব নয়। শুরুতে ভিটায় মাটি দেওয়া প্রয়োজন। সংগ্রহ করা টাকা খরচ করে মাটি কাটালে ঘরের কাজ শুরু করাই যাবেনা। তাই ছাত্র ইউনিটির সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিলো নিজেরাই মাটি কাটবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উড়ির চর ছাত্র ইউনিটির একঝাঁক সদস্য কোঁদাল ও মাটি টানার পাত্র নিয়ে হাজির হলো সেলিম শেখের বাড়িতে। সারাদিন শ্রমিকদের মত মাটি কাটলো এবং বানানো হলো ঘর নির্মাণের ভিটা। পরে সংগ্রহ কৃত অর্থ দিয়ে গাছ কিনে সেলিম শেখদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। শুরু হয় তাদের ঘর তৈরির কাজ। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে অর্থ সংকটে থেমে যায় কাজ। কাঠে বার্নিশ দেওয়া, পেরেক কেনা, কাঠমিস্ত্রীর মজুরিসহ নানা ক্ষেত্রে সংগ্রহ করা সব টাকা খরচ হয়ে যায়। এদিকে অনেকে পরে নানা মাধ্যমে টাকা পাঠাবে এমন আশ্বাস দেওয়ায় সংগঠনের সদস্যরা বাকিতে টিন, কাঠ কিনে পুনরায় ঘর তৈরির কাজ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সক্ষম হয় সেলিম শেখের পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে ঘর পেয়ে সেলিম শেখ বলেন, এ ছেলেরা যেভাবে আমাকে ঘর করে দিয়েছে তা কেউ দেয় না। তারা যেভাবে শ্রমিকের মত কাজ করেছে তা দেখে আমি আবেগ আপ্লুত হয়েছি। আমি ছেলেদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করি। উড়ির ছাত্র ইউনিটি সভাপতি মিলাদ দ্বীপরাজ বলেন, অসহায় সেলিম শেখের ঘর নির্মাণ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এ ক্ষুদ্র কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে ধন্য মনে হচ্ছে। সমাজে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছেন, যাদের কারণে আমরা এতো বড় একটি কাজ সমাপ্ত করতে পেরেছি। সবার আন্তরিকতা পেলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারবো। মানুষ হিসেবে প্রকৃত মানুষের দায়িত্ব পালন করতে পারবো। আওয়ার মাদারল্যান্ড সন্দ্বীপ গ্রুপের এডমিন সুজা উদ দ্দৌলা সজীব বলেন, আমাদের প্রত্যেককে নিজেদের অবস্থান থেকে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো উচিত। উড়িরচর ছাত্র ইউনিটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা যেভাবে কোদাল হাতে মাটি কেটেছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। সংগঠনের অন্যতম সদস্য সুমন রানা জয় বলেন, সংগঠনের আমরা সবাই তরুণ। আমাদের প্রধান লক্ষ্য সংকটকালীন সময়ে অসহায় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সে চিন্তা থেকেই আমরা অসহায় এ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। উল্লেখ্য, সামাজিক সংগঠন উড়িরচর ছাত্র ইউনিটি উড়িরচরের ছাত্রদের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। দুর্গম এ চরে ২০১৬ থেকে শিক্ষা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। পাশাপাশি যেকোন মানবিক আবেদনেও সাড়া দিয়ে অসহায় গরীব লোকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে তারা।

x