অসময়ের প্রতিনিধি

নাজনীন আকতার

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ
41

সকাল ৪.১৫

সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি আমার পোষা পাখিগুলোও বেশ নিশ্চিন্ত মনে খাঁচার ভেতর তক্তপোষ স্বরূপ দন্ডটাতে একেবারে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। মানে কাকডাকা/পাখিডাকা ভোর এখনো হয়নি। এখনো এক গুচ্ছ সূর্য রশ্মি উঁকি মারেনি আকাশে। আমি সেই ভোরের জন্য অপেক্ষমাণ। বসে আছি ডিজিটাল বাগানে। পাখির খাঁচার মতো ডিজিটাল বাগান। আশেপাশের উঁচু দালানের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফাঁকফোকর দিয়ে আসা রোদের ছটায় বেড়ে ওঠে এই বাগানের গাছপালা। ফুল ফুটে চুপিসারে। এই খাঁচার মধ্যে অন্য এক খাঁচা জায়গা করে নিয়েছে, যার মধ্যে বসবাস আমার অতি যত্নে লালিত পাখিগুলোর। বাগানের গাছগুলো খুব রেগে আছে তাই বছরে লেবু ধরে ৩ থেকে ৪টা। তাদের আর দোষ কি? উঁচু উঁচু দালানগুলো যে সূর্যালোককে বেঁধে রেখেছে, গাছের স্পর্শে তাকে খুব একটা আসতে দেয়না। তাছাড়া এক টুকরো জমির স্থলে গাছগুলো শিফট হয়েছে ছোট্ট ছোট্ট টবে। এই সময়ের মানুষরাই পারছে না এক টুকরো জমি একার করে নিতে। যেখানে ৫০-৬০টা খাঁচা তৈরি করে বাস করে একটাতে, সেখানে গাছপালাকে আমরা কিভাবে খুশি করবো? তাই শখের মূল্য হিসেবে ৩ থেকে ৪টা লেবু নিয়েই আমি সন্তুষ্ট চিত্তে থাকি। ছোট্ট একটা খাঁচা, খাঁচার মধ্যে খাঁচার বাগান (আমি অবশ্য বলি ডিজিটাল বাগান)। তারই মধ্যে পাখির খাঁচা। এসব কিছু ঘিরে আমার পৃথিবী। মাঝে মাঝে ভাবি, বিশাল পৃথিবী হতে আমার পৃথিবীটা এত্ত ক্ষুদ্র! মনে হয় যেন সময়ের চেয়ে ধীরে চলতে চলতে এই সময় হতে বড় বেশি পিছনে পড়ে গেছি, আর জীবনের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে দিয়ে নিজের পৃথিবীকে ক্ষুদ্র বানিয়ে ফেলেছি। এই ক্ষুদ্রতায় আমার বসবাস। একে ঘিরে আমার জীবন চলমান। এই চলমান পথই আমার অহংকার।
যাই হোক ভোর হয়ে এসেছে। পাখিগুলো ক্লান্তি ঝরিয়ে ডানা ঝাপটে উঠে পড়েছে। গাছগুলো চুপসে আছে পানির অপেক্ষায়। এখন পানি দিলেই গা ঝেড়ে আবারো সতেজ রূপে ফিরবে। আমার বাচ্চারা উঠবে তাদের বাবার সাথে ঠিক সকাল আটটায়। এরপর তড়িঘড়ি করে কেউ যাবে না খেয়ে অফিসে, কেউ টিফিন প্যাক করে স্কুলে। ওদের অনেক চেষ্টা করেছি রুটিন মাফিক চালাতে। কিন্তু ওরাই এই সময়ের বড় ব্যস্ত মানুষ। ব্যস্ততার জন্য সকালের নাশতাই করা হয়ে উঠে না! আর আমায় বলে,‘‘তুমি না বড্ড ব্যাকডেটেড!” ওদের কথাটা অবশ্য মিথ্যা না। আমি অনেকটাই ব্যাকডেটেড! কিন্তু আবার একালের হাউজওয়াইফ! বাচ্চারা স্কুলে যায় ওদের নিয়মে। বুয়া আসে। কাজ করার ছলে সারাক্ষণ বকবক করে গোটা পৃথিবীটাকে নর্দমায় ডুবিয়ে, মানুষগুলোকে জানোয়ার বানিয়ে, বড়লোকদের জাত উদ্ধার করে। তবু তার প্রতিদিনকার কাজ শেষ হয় না! ঘন্টা গোনে, ফাঁকির কাজ শেষ করে চা খায়, তারপর ঘর ঠাণ্ডা করে বের হয়। আমিও রোজদিনকার স্বভাবসুলভ দরজা বেঁধে কিছুক্ষণ ডায়রি লিখি বা কোন বই পড়ি বা টিভিতে চ্যানেল পাল্টাতে থাকি।
দুপুর ১১.৫০

মাঝে মাঝে দুপুর সময়টায় বিরক্ত হই। একলা থাকলে বিরক্ত হই না। যখন আশেপাশের ফ্ল্যাটের ভাবি-আপারা বাড়িতে হানা দেন তখন বিরক্ত হই। তারা রোজ কোন না কোন ফ্ল্যাটে যাবেন, হালচাল দেখবেন, এই বিল্ডিং এর স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে কাজ করবেন, নিজেদের-নিজেদের হাজবেন্ডদের পজিশন জাহির করবেন, স্ব-স্ব কর্ম উদ্দীপনার ঢোল পিটাবেন। তারা কেউই হাউজ ওয়াইফ নন। তারা কেউ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মর্নিং শিফটের টিচার, কেউ ঘরে বসে বিজনেস করে, শেয়ার বাজারে টাকা লগ্নি করেন, ক্লাব-পার্টি মেইনটেন করেন, তথাকথিত সোশাল ওয়ার্ক করেন, কেউ বা আবার ফুড সাপ্লাইয়ার! তাই তারা নিজেদের ব্যস্ত, কর্মজীবী মহিলা বলে অভ্যস্ত। শুধু এগারোটা থেকে দুটো এই টাইমটা তাদের হাতে অবসরের সময়। তখন তারা আবার সামাজিকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তারা আমার মতো হাউজওয়াইফ তো ননই, বরং আমাকে আমার ক্ষুদ্র জগৎ হতে টেনেহিঁচড়ে বের করতে চান। দেখাতে চান তাদের বিশাল জগতটা কতোটা অপার মহিমায় মহিমান্বিত! তারা সময়োপযোগী, চলমান ধারার প্রতিনিধি। আমার ব্যাকডেটেড ধারাকে তারা সহ্য করতে পারেন না। আমি বোঝাতেই পারি না যে, আমার জগত নিয়ে আমি কতোটা হ্যাপি। আমার নরমাল ধাঁচে চলা তাদের কাছে গ্রাম্য ধরা হলেও আমি তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তাদের হাইফাই কোয়ালিটির মাইম কস্টিউমটা আমার কাছে উচ্ছৃংখলা। আমি এই সময়ের জোয়ারে গা ভাসিয়ে আনন্দ পাবো না। আামি এই গ্ল্যামার‘স ওয়ার্ল্ডের মিসেস স্মার্ট হওয়া থেকে ক্ষুদ্রতাকে আপন করে নিয়েছি। তাদের মতো বিশালতাকে চিনতে-জানতে না পারাটা না হয় হোক আমার সংকীর্ণতা! তাই চা পর্ব চলা পর্যন্ত তাদের কথাগুলো শ্রবণ করে শেষটুকুতে অনুনয় বিনয়, আদেশ-উপদেশে সরি বলে নির্গমন পানে চেয়ে থাকি।
বিকাল ৫.৪৫

এই সময় বাচ্চারা খেলে। ছোট্ট ফ্ল্যাটে যতটুকু জায়গা ব্যবহার করে খেলা যায়। এরা একালের স্মার্ট বাচ্চা। মাকে বানিয়েছে বন্ধু। চার দেয়ালের মধ্যে ছোট্ট ছোট্ট বন্ধুদের সাথে আমার বন্ধুতা। মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজনরা আসে। কথোপকথন, চা পর্ব শেষে বাসায় নিমন্ত্রণ করে চলে যায়। বাচ্চারা খুব টিভি, ট্যাব, ল্যাপটপ সিক। গেমস নিয়েও অনেক সময় ব্যয় করে। চটপট হোমওয়ার্ক সেরে নেয়, পড়ার পর্ব চুকিয়ে নেয়। আমাকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয় না তাদের নিয়ে। আমিই পড়াই ওদের, নিজের পড়াটাকে কাজে লাগানো আর কি! নইলে তো জানি, অনভ্যাসে বিদ্যা নাশ। বাচ্চাদের চঞ্চলতাকে উপভোগ করি বসন্ত বাতাসের মতো। এই সময়ের ধারা দেখে মনে হয় বড় অসময়ে জন্ম হয়েছিল। বোধহয় বড় অসময়ে চলে এসেছি, কোন হিসাবই মিলাতে পারি না। তাই যোগ-বিয়োগকে জীবন থেকে গুডবাই জানিয়ে দিয়েছি। আর নিঃশব্দে সময়ের নদীতে ওল্ড ভার্সনের তরী চালিয়ে ধীর গতিতে চলছি দিগন্তের পানে। যে চলায় নেই কোন লক্ষ্য, আশা, স্বপ্ন। সবকিছু ছাড়া কিভাবে একজন মানুষ বেঁচে থাকে? মানুষ বেঁচে থাকে পৃথিবীর নিয়মে। পৃথিবীর নিয়মে ছুটে মৃত্যু পানে। এরমধ্যে কেউ আঁকড়ে ধরে কর্ম, স্বপ্ন, লক্ষ্য, চাহিদাকে। যে যত বেশি আঁকড়ে ধরে, সে তত বেশি ছুটে চলে, তত বেশি বেঁচে থাকে নিজের পৃথিবীতে, মানুষের মনে। আমি ক্ষুদ্র পৃথিবীতে ক্ষুদ্র সময়ের জীবন সমাপ্তির পানে ধীরে সুস্থে চুপিসারে চলমান। এক ক্ষুদ্র প্রতিনিধি, যে ডিজিটাল সময়ের চলমান গতিপথে বড় অসময়ের এক প্রতিনিধির দিনলিপি রচনা করে চলেছি।

x