অশেষ রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড রবীন্দ্রনাথ

ড. আহমেদ মাওলা

শুক্রবার , ৯ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
33

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছেন’ তোমার পানে চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নাই।’ রবীন্দ্র- প্রতিভার আসলে কি আদি অন্ত আছে? আমরা আসলে রবীন্দ্রনাথকে জানি খণ্ডিতভাবে। মূল্যায়নও করতে বসি বিচ্ছিন্নভা,। নিজের সীমাবদ্ধ গজ- ইঞ্চিতে। ফলে রবীন্দ্রনাথকে আমরা করে ফেলেছি যার যার মাপে, ছোট , ক্ষুদ্র, প্রয়োজন মাফিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এতছোট নয়। আবার গুরুদেব, গুরুদেব বলে ধর্মীয় গুরুর আসনে বসিয়ে পূজা দিয়ে অতি ভক্তির চূড়ান্ত করি। রবীন্দ্র- সাহিত্য বিবেচনার এই যে অসঙ্গতি তা দূর করবে কে?
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রথম কয়েকদশক নানা রকম নিন্দা- মন্দ, কটূক্তি সহ্য করেছেন। কিন্তু তিরিশের দশকের তিনি শুধু লেখক নন, এক বৃহৎ মহীরুহ হয়ে ওঠেন। তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করেছে, কবিতার বিকল্প পথ অনুসন্ধানের জন্য। তাদের দ্রোহের প্রকাশ ছিল এরকম -‘ তিন জোড়া পায়ের ঘায়ে রবীন্দ্রনাথ- রচনাবলী লুটায় পাপোশে।’
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন ‘ সম্মুখেতে পথ জুড়ে বসে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘ রবীন্দ্রনাথ পথ জুড়ে বসে আছেন, সেজন্য তাঁরা নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন না? একটা তিরিশের প্রতিভাবান কবিদের জন্য সম্মানজনক ছিল কী? মোটেই না।
ছয় জোড়া পায়ের ঘায়ের রবীন্দ্র- রচনাবলী গড়াগড়ি খায় পাপোশে? এরকম বাড়াবাড়িও ঘটেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন- সারাদিন আড্ডায়- তর্কে রবীন্দ্রনাথের মুণ্ডপাত করে রাতে বাড়ি ফিরে প্রায়শ্চিত্ত করার মতন আপন মনে অবিরাম রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ করতে, এমন দৃষ্টান্ত আছে। দু এক দশক পরেই, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত হয়ে ওঠেন। রুদ্ধদেব বসু ‘ কবি রবীন্দ্রনাথ : কথাসাহিত্য’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন। অন্যদিকে যারা শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে লালীত হয়েছেন, তারা রবীন্দ্রনাথকে ‘ গুরুদেব’ বলেই সম্বোধন করতেন। রবীন্দ্রনাথের নাম তারা সরাসরি উচ্চারণ করতেন না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও কী সম্বোধন পছন্দ করতেন? আমার বিশ্বাস পছন্দ করতেন না। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের পাল্লায় পড়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে একটি স্কুল খুলে রবীন্দ্রনাথ যেন ভুল পথে পা বাড়ালেন। ইংরেজ প্রবর্তিত কেরানি সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদে তিনি প্রাচীন ভারতের আদর্শের একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সেটা হয়ে গেল প্রায় হাস্যক, বরণাশ্রম প্রথার মত। খাওয়ার সময় ব্রাহ্মণ ছাত্ররা পৃথক বসতো, কায়স্থ ছাত্ররা ব্রাহ্মণ শিক্ষকদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করবেনা। ভাবতে অবাক লাগে- যে কবি ‘ ভারত তীর্থের’ মত কবিতা লিখেন, তিনি কী করে এই পশ্চাদপদ প্রথা মেনে নিলেন? যা হোক, শান্তিনিকেতনের ব্রাহ্ম স্কুল পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এর অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারিতে হিন্দু- মুসলমান প্রজাদের পৃথক আসন পরিত্যাগ করে তাদের একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ওই ছয় জোড়া পায়ের ঘায়ে রবীন্দ্র- রচনাবলী? ওই ছয় জোড়া পা আসলে সুনীল, শক্তি, বেলাল চৌধুরীর কী?
এখান একটা জিনিস পরিষ্কার হওয়া দরকা, তিরিশের রবীন্দ্র বিরোধিতা আর পঞ্চাশের রবীন্দ্র বিরোধিতা কিন্তু একরকম নয়। তিরিশি লেখকদের রবীন্দ্র- প্রত্যাখ্যানের প্রধান সুর ছিল, রবীন্দ্রনাথের কাব্যে কৃষক- মজুর নেই, শারীরিক বর্ণনা নেই, সমসাময়িক বাস্তবতা নেই ইত্যাদি। যেমন, এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্যানপ্যানানি বা ঘুম পাড়ানি গান মনে হয়। তাই বলে কী রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাহাত্ম্য কমে যায়নি। পঞ্চাশের কবিরা রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করেছে, রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রমের জন্য। তাই তাদের ‘ সম্মুখ জুড়ে’ কেবল রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না। কারণ, সাহিত্যের একটি পথ বাধা নেই। সাহিত্যের অনেক রাস্তা, বিচিত্র পথ রয়েছে। পঞ্চাশের কবিরা রবীন্দ্রনাথের বাহিরে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশকে। যিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে রবীন্দ্র- প্রভাব মুক্ত অনবদ্য কবি। যার কবিতার ভাষা ছিল মোহময়,ভুবন ছিল অনুভবে ইন্দ্রিয় প্রবণ, রূপময়। পঞ্চাশের কবিদের জীবনানন্দ দাশ মুগ্ধতা দেখে সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ জীবনানন্দ দাশের মধ্যে তোমরা কী পাও?
উত্তরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলে, নতুন কাব্য- ভাষা। “কৃত্তিবাস” এর দলই জীবনানন্দ দাশের পথ ধরে আধুনিকতার দিকে চলতে থাকেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের মতো বিরল প্রতিভার লেখক শুধু কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, শিশুসাহিত্য, এবং গান রচনা করে তৃপ্ত হন না। তার জীবনী শক্তি আরো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যায়। দেশের কাজে, কৃষি ও গ্রামের উন্নয়নে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে এবং ছবি আঁকায়ও। তাই আমরা বারবার ফিরে যাই রবীন্দ্রনাথের কাছে, প্রত্যাবরতন করি রবীন্দ্রনাথের দিকে। যে রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে থাকে, সে মূর্খ। রবীন্দ্রনাথকে যে জীবন যাপনের সঙ্গী করে না, সে আরো বড় মূর্খ।

x