অর্থবছরের মধ্যভাগে বাড়তি করারোপ ব্যবসায়ী ও জনগণকে দুর্ভোগে ফেলবে

বৃহস্পতিবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
64

চলতি বছরের প্রথমার্ধেই রাজস্ব আহরণে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো ঘাটতিতে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব ঘাটতির এ আশঙ্কা অর্থবছরের শুরুতেই করেছিল এনবিআর। এ ঘাটতি পূরণে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে রাজস্বের নানা ক্ষেত্র খুঁজে বের করছে সংস্থাটি। বন্দরের সব ধরনের সেবা মাশুলের ওপর ভ্যাট আদায়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আগেই চিঠি দিয়েছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়, রাজস্ব বাড়াতে এবার পণ্যের মোড়কেরও শুল্কায়ন করতে চাইছে। যদিও এর তীব্র বিরোধিতা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের দামও বেড়ে যাবে বলে দাবি করছেন তারা। মোড়কজাত পণ্যের ক্ষেত্রে শুধু পণ্যের শুল্ক পরিশোধ করেই এতদিন আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। এখন থেকে মোড়কের জন্যও শুল্ক কর দাবি করছে কাস্টম হাউজ। সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনে মোড়কসহ পণ্য শুল্কায়নের নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। নির্দেশনা অনুযায়ী, আমদানিকৃত যেসব পণ্য মোড়কসহ (প্যাকেট, বোতল, জার কিংবা অন্যান্য ম্যাটেরিয়াল) বাজারজাত হয়, তার মূল্য বিবেচনায় নিয়ে (গ্রস ওয়েট) শুল্কায়ন করতে হবে। নিট ওয়েট বলতে শুধু পণ্যের ওজন বিবেচনায় আনা হয়। আর গ্রস ওয়েট বলতে পণ্য (কনটেন্‌স) ও এর সঙ্গে মোড়কের (বোতল, টিনের কন্টেইনার, কাগজের প্যাকেট ও স্টিল আয়রন, গ্লাস অ্যালুমিনিয়ামসহ যে কোনো প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল) ওজন বোঝানো হয়। এনবিআরের হিসাবে, মোড়কসহ পণ্য শুল্কায়ন হলে বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আহরিত হবে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে এনবিআর বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো দেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পন্থায় শুল্কায়ন করে আসছে। বাংলাদেশও চর্চাটি চালু করতে চাইছে। এনবিআর সদস্য (কাস্টমস নীতি) এ প্রসঙ্গে বলেন, পণ্য আমদানির পর বাজারে শুধু পণ্যই বিক্রি হচ্ছে না, বরং তার সঙ্গে প্যাকিং ম্যাটেরিয়ালও বিক্রি হয়। তাই মোড়কেরও শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। তবে যে মোড়ক পণ্যের সঙ্গে বাজারে বিক্রি হবে না, তাতে শুল্কারোপ করা হচ্ছে না। এনবিআরের এ যুক্তি মানতে রাজি নন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন হলে আমদানি পণ্যে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যাবে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য, বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের দাম বেড়ে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে। বাজার ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। খাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেশি। এনবিআরের এ অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

চলতি অর্থছরের বাজেট পাসের সময়েই অর্থনীতিবিদেরা করের বোঝা বাড়বে বলে মন্তব্য করেছিলেন। ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অটুট রাখায় এ ধরনের সংশয় আরো বেড়ে উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, এনবিআর কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জন করবে? অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস কোন উদ্যোগই এনবিআরের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতিতে রয়েছে এনবিআর। এ অবস্থা বিরাজ করলে অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। সঙ্গিন অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য এনবিআর এখন শুল্ক করভ্যাট আদায়ে নতুন উৎস খুঁজছে। এরই মধ্যে তারা কয়েকটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে ভ্যাটশুল্ক চাপিয়ে দিতে চাইছে। উদাহরণ হিসেবে এতদিন বন্দরের ২৫ ধরনের সেবার ওপর ভ্যাট পরিশোধ করতে হতো। এখন ৬০ ধরনের সেবার ওপর ভ্যাট চাইছে এনবিআর। শুধু তাই নয়, আমদানিতে এতদিন শুধু পণ্যের ওপর শুল্কায়ন হলেও এখন থেকে মোড়কের ক্ষেত্রেও শুল্ক আদায় করতে চাইছে সংস্থাটি। জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে এসব সিদ্ধান্ত নেয়ায়। এটি বাস্তবায়ন হলে আমদানি পণ্যে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যাবে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে স্থানীয় বাজারে অস্থিরতাও সৃষ্টি হবে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই আমদানি ব্যয় বেড়েছে। দেশে ডুয়িং বিজনেস ব্যয়ও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। সন্দেহ নেই, বছরের মাঝামাঝি সময়ে নতুন করে করারোপ হলে ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে। এ কথা সত্য যে বাংলাদেশে কর জিডিপি অনুপাত অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। এটি বাড়ানো প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এনবিআর পুরনোদের ওপরই চাপ প্রয়োগ করে চলেছে। এটি কাম্য নয়। সারাদেশে করজাল বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি নির্দিষ্ট রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এতে একজন ব্যবসায়ী দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিকল্পনা করে এগোতে পারবেন। ঘন ঘন রাজস্ব নীতি পরিবর্তন হলে ব্যবসায়ীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

এনবিআরের বর্তমান সিদ্ধান্ত বাড়াবে ব্যবসার ব্যয়। বিরূপ প্রভাব ফেলবে ব্যবসার ক্ষেত্রে। ব্যয় বৃদ্ধির এ প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়বে। পণ্যের মূল্য তো বাড়বেই, একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়ে যাবার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে। এতে অর্থনীতি ও মুদ্রাবিনিময় হারের ওপর চাপ পড়বে। এর ফল হবে, রফতানি খাতেও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব। অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন দেশের ব্যবসায়ীরা। ফলে বৈদেশিক বাজার ধরা তাদের পক্ষে কষ্টকর হবে। ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কাও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে এনবিআর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবেণ্ড এটাই আমাদের প্রত্যাশা। একতরফাভাবে ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে আমদানিরফতানি ব্যয় বাড়ানোটা যুক্তিসঙ্গত হবে না। গত কয়েক বছরে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। চলতি বছর মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে রাখার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এরই মধ্যে তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বন্দর ব্যবহারে বাড়তি খরচ ও শুল্কায়নের প্রভাব যোগ হলে ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হবে। পণ্যের বিপরীতে শুল্ক কর পরিশোধের পর বন্দর ব্যবহারে আরো ভ্যাটশুল্কারোপ হলে তা ব্যবসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এর প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতির ওপর। তাই এনবিআরকে সার্বিক পরিস্থিতি আরো বিশ্লেষণ করে সেবায় ভ্যাট ও শুল্কারোপের বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়াই হবে যুক্তিসঙ্গত। জনগণের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার মতো কোনো কাজ করা তাদের দুর্ভোগ বাড়ানোর নামান্তর। আমরা আশাকরি এনবিআর তথা সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।

x