অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য বিকল্প খাতের সন্ধান করতে হবে

শনিবার , ২ জুন, ২০১৮ at ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ
46

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অনেক তৈরি পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ খবরে আনন্দের হাওয়া বইছে সমগ্র পোশাক শিল্পে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এখন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেশি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেতারা গত বছর পোশাকের যে দাম দিয়েছেন, তার চেয়ে এ বছর ৫ থেকে ৭ শতাংশ কম দাম দিচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে সেই ক্রয়াদেশ নিচ্ছেনও।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ২৮৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে রপ্তানি হয় যথাক্রমে ২৬০ ও ২৫৭ কোটি ডলারের পোশাক। পোশাক রপ্তানিতে ফেব্রুয়ারিতে ১৬ দশমিক ৮৬ ও মার্চে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। গত এপ্রিলে ২৪৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির বিপরীতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ফলে সামগ্রিকভাবে চলতি ২০১৭১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পোশাক রপ্তানিতে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশের বাড়তি চাপের কারণ কীসে সম্পর্কে শিল্প উদ্যোক্তারা নিশ্চিত করে কিছু বললেও কয়েকটি কারণের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। যেমন সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, বেশ কয়েকটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসা বাড়াচ্ছে। ফলে তারা গতবারের চেয়ে এবার ক্রয়াদেশ বেশি দিচ্ছে। ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। তা ছাড়া চীনের পোশাক কারখানা থেকে অনেক ব্র্যান্ড ক্রয়াদেশের একাংশ সরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সেটির সুফল পাচ্ছে কিছুটা।

পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশের ভালো চাপ থাকার বিষয়টি রপ্তানি আয়ের উপরিউক্ত পরিসংখ্যানে কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ বোঝা যায় যে, পোশাক রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের মাসগুলোতে এর প্রতিফলন আরও বেশি দেখা যাবে বলে আশা করা যায়। কারণ পোশাক রপ্তানির পর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসতে সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাস লাগে।

তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি রপ্তানিমুখী খাতে পোশাক শিল্পই অন্যতম। যে কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পনির্ভর। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখানে শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। গোটা বিশ্বে পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। এ দেশের তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানি বাণিজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বেকার সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান উৎসাহজনক। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এই শিল্পের হাত ধরে বিশ্ববাজারে একটি ব্র্যান্ড সৃষ্টি করেছে। যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের দেশ বিশ্বদরবারে নতুন পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করছে। বাংলাদেশের নারীদের হাতের তৈরি পোশাক গত বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলোয়াড়দের পরনে ছিল। যা আমাদের গর্বের বিষয়। দেশের উন্নয়নে এই গার্মেন্টস শিল্পের এতো অবদান থাকা সত্ত্বেও বিগত সরকারের আমলে যথেষ্ট সদিচ্ছার অভাব ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে এই শিল্প এগিয়ে চলছে ত্বরিৎ গতিতে। বর্তমান সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। দেশিবিদেশি নানা ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প।

বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে ক্রেতাদের ধরে রাখতে কয়েকটি কাজ জরুরিভাবে করা দরকার। বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারীরা প্রতিনিয়ত লিডটাইমে মার খাচ্ছেন। সে জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর যত দ্রুত সম্ভব নির্মাণ করা দরকার। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; গ্যাস বিদ্যুতের সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি; রেলে পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে এবং ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে ভয়াবহ যানজট দূর করতে হবে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, এখনও তৈরি পোশাক শিল্প তথা আমাদের বস্ত্রখাত একান্তই সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী খাত। এই খাতের অগ্রগতিতে আরও বেশি বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিকল্প একাধিক রপ্তানিমুখী খাত না থাকাতে আমাদের পুরো অর্থনীতি এখনও এই খাতের ওপরই নির্ভরশীল রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও যত দ্রুত সম্ভব বিকল্প খাতের সন্ধান করতে হবে।

x