অরিত্রী আমাদের মৃত্যুঞ্জয়ী মা

জয় দাশগুপ্ত

শনিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ
302

অরিত্রী অধিকারী মরিয়া প্রমাণ করিলো সে মরে নাই। দেশতো বটেই দেশের বাইরেও এই ঘটনা বাংলাদেশিদের মনে গভীর বিষাদের ছায়া ফেলেছে। যাতে প্রমাণিত হয় মানুষের কাছে এখনো জীবনই মুখ্য বিষয়। নিজের একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি। এসএসসি অবধি পড়ালেখা ছিলো আমার কাছে মূর্তিমান আতংক। অংক বিষয়ে আমার দুর্বল মেধার জন্য আমার ফলাফলও ছিল বিষাদময়। ঘরের মাস্টার আমার দুইগালে যত চড় কষিয়েছিলেন তার কোনও হিসেব নাই। মার খেতে খেতে আমার মনে হতো সন্ধ্যা নামা মানেই ভয়ের বিষয়। এমন এক মানসিক অবস্থা হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিলাম এই জীবনের কোনও মূল্য নাই।
কীভাবে কী করবো আমি? কীভাবে জীবন কাটবে আমার? মায়ের স্নেহ আর ভরসার কারণে আত্মহননের মতো কঠিন বিষয় মাথা থেকে সরিয়ে রাখলেও মাঝে মাঝে তা হানা দিতো। সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছেড়ে আমি এসএসসি কোনওভাবে পাশ করার পর মানবিক বিভাগে চলে যাই। আর তখন থেকে আমার লেখাপড়ার আনন্দ আর সার্থকতার শুরু। বিনয়ের সাথে বলি, এইচএসসি-তে বোর্ডে সেরা বিশ জনের মধ্যে জায়গা পেয়েছিলাম আমি। পরে আর কোনও ভুল করিনি বলেই হয়তো জীবনে বড় অঘটনের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম।
অরিত্রীর মন পরিপক্বতা পায় নি। সে বয়সেও পৌঁছেনি সে। তার আগেই মৃত্যুর মতো ভয়াবহ এক আততায়ীকে আপন করে নেওয়া এই কন্যাটি কী আমাদের আত্মজা বা আত্মীয় হতে পারতো না? তেমন ভাবে ভাবলে এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। বিহিত প্রয়োজন দেশের তারুণ্যের স্বার্থে। আমাদের পড়াশোনার জগতটা গোলমেলে। এখানে কিছু নম্বর ছাড়া আর কিছুই কাজ করেনা। প্রতিবছর আমরা জিপিএ ফাইভের বাহুল্য আর উল্লাস দেখে বুঝতে পারি কতটা তার দাম। এরা বড় হয়ে কে কী হয় বা হতে পারবে সে খবর জানিনা আমরা। যে জাতির প্রধান দুই কবি স্কুলের সীমানা পেরোননি, যাদের লেখা ছাড়া সংস্কৃতি জীবন জাতি অচল, তারা কেউই ব্যক্তিজীবনে পড়াশোনার নামে সার্টিফিকেট নিয়ে মাথা ঘামান নি। আমাদের রাজনৈতিক কবি বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু ও লেখাপড়ায় তারকা কেউ ছিলেন না। কিন্তু তার মেধা আর প্রজ্ঞার কাছেই হার মেনেছিল পাকিস্তানের বাঘা বাঘা মানুষজন। আমাদের কবি গীতিকার দার্শনিক লালন সাঁইজী আজো অতুলনীয়। কী তার কথিত যোগ্যতা? কী যোগ্যতা ছিলো হাজার বছরের সেরা দার্শনিক বুদ্ধের? প্রকৃতির কাছ থেকে পাঠ নেওয়া এইসব মানুষের অবদানে দুনিয়া ঋদ্ধ হয়েছে।
এসব জানার পরও আমাদের ভুল ভাঙেনা। এ ঘটনা নতুন কিছুনা। আমাদের দেশের এককালের বিখ্যাত নায়ক ওয়াসিমকে নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের। পর্দা কাঁপানো এই নায়কের কন্যার ভাগ্যেও জুটেছিল করুণ মৃত্যু। একই কাহিনী। এক ধরনের ঘটনা। স্কুলে অপমানিত মেয়েটি নিজের জীবন কেড়ে নেয়ার পর ওয়াসিমও নাই হয়ে গেছেন। মা বাবার কাছে সন্তানের মৃত্যুর চাইতে করুণ আর কোনও ঘটনা থাকতে পারেনা। অরিত্রী আজ নাই। কিন্তু এই আঘাত এই শোক তার মা-বাবাকে আজীবন বইতে হবে। তার আত্মীয় স্বজনদের তাড়িয়ে মনে আজীবন থেকে যাবে এই দাগ। এটা কি সভ্য সমাজের ইঙ্গিত বহন করে?
অরিত্রী বাংলাদেশের অন্যতম সেরা স্কুলের ছাত্রী ছিলো। যে স্কুলে পড়তে পারাটাই সম্মানের বলে মনে করা হয়। সে স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল বা টিচারদের কাছে জাতির প্রত্যাশাও অনেক বেশি। সেদিন কী হয়েছিল আমরা না জানলেও, অনুমান করতে পারি। মেয়েটি তার মা বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল সাহস করে। সে সাহস কাজে লাগেনি। নিশ্চয়ই তার সামনেই অপমানিত হয়েছিলেন তারা। সে অপমানিত মুখ মেয়েটি মেনে নিতে পারেনি। পারেনি মুখ দেখাতে। এই যে আমরা কথায় কথায় বলি দেশ জাতি এগুচ্ছে আমরা ডিজিটাল হচ্ছি এ কি তার নমুনা?
একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে বাচ্চাদের পড়াশোনা যে কত সহজ আর আনন্দের সেটা আমি গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখছি। চাপ থাকলেও নম্বর পাওয়ার জন্য জান-পরাণ দেবার কোনও কারণ নাই এখানে। শুরু থেকে স্কুল শেষ অবধি ‘ফান’ করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয় তাদের। সেখানে আত্মহননের প্ররোচনা থাকেনা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি সবসময় ছেলে-মেয়েরা ঠিক কাজ করেনা। করতে পারেনা। এটা তাদের বয়সই করতে দেয়না।
এমন অনেক অভিভাবক টিচার মিটিং এ আমি গিয়েছি যেখানে অভিযোগ ছিল। কিন্তু আক্রমণ ছিল না। বরং তারা বলতেন- আমাদের যে কোথায় ত্রুটি সেটাই বুঝতে পারছি না। উন্নত সমাজে আধুনিক সমাজে নম্বর কম পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের দায়-দায়িত্ব টিচারও বহন করেন। তারা কেন কম নম্বর দিতে বাধ্য হলো তার ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। সে ধরনের জবাবদিহিতা নাই বলেই আমাদের সমাজে আছে শুধু অপমান আর গালাগালি।
বড় বড় নামের গালভারী স্কুলগুলো মনে করে তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারাটাই সৌভাগ্যের। বাদবাকী সব হবে যাদুর মতো। ছেলেমেয়েরা ভালো করবে। পাশ করবে। না করলে হয় বিদায়, নয়তো অপমান। অভিভাবকের কী দোষ থাকে এতে? স্কুলের ফি আনুষঙ্গিক খরচাদি যোগাতে তাদের জীবন শেষ। পিতা করলে মা থাকেন পাহারায়। কোন পিতা-মাতা চায় তাদের সন্তান নকল করুক? তারা কেন সন্তানের সামনে ইজ্জত খোয়াবেন? যে বয়সে পিতা ঈশ্বরতূল্য নায়কসম সে বয়সে পিতাকে অপমানিত হতে দেখলে বাচ্চারা নিতে পারবে না এটাও কী টিচারেরা জানেন না?
পুরো ব্যবস্থাই এখন এমন। দেশের যেসব কর্তারা দেশ চালায় তাদের জীবনে নকল নাই? সমাজে নকল ভোটে সাংসদ হওয়া জায়েজ। নকল আইডি খুলে দাঙ্গা লাগানো জায়েজ। নকল মানুষকে কারাগারে পাঠানো জায়েজ। নকল খাবারে, নকল ওষুধে মানুষ মারা জায়েজ। শুধু মোবাইলে কথিত নকল নাজায়েজ। মেয়েটি যদি তা করেও থাকে তার সংশোধনমূলক শাস্তি হতে পারতো। এমন কী হয়েছিল যার জন্য তাকে জীবনের মত মূল্যবান মহার্ঘ্য বস্তু স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিতে হলো? জানা দরকার আমাদের। যদি এ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় আবার তা ফিরে আসবে আর কারও জীবনে। এটা একশ পার্সেন্ট নিশ্চিত।এ বিষয়ে সরকার প্রভাবশালী মহলসহ সুধিজনদের ভূমিকা জরুরি। তারা চুপ করে থাকতে পারেন না। এ কোনও ছেলেখেলার বিষয় না। এতে সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত আছে আমাদের ধ্বংস আর পতনের। সমাজ ভালো না থাকলে, সমাজ ঠিকভাবে না চললে জাতি কিভাবে ভালো থাকবে? অরিত্রী এখন আর কারো সন্তান না। সে এখন বিকলাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা আর পতনমুখি সমাজের প্রতীক। যে আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে চিরবিদায় নিয়েছে।
গ্রামে-মফস্বলে কী হয়, কী হতে পারে, তার একটা গোপন ইঙ্গিতও আছে এতে। তাই আমরা এর বিচার চাই। লোক দেখানো কমিটি গঠন করে, সময় অপচয় করে ঘটনা ভুলিয়ে দেয়ার পুরনো খেলা যেন আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে। তাহলে আই ওয়াশের তলায় চাপা পড়ে যাবে সন্তানদের ভবিষ্যত। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় দেখলাম ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকেরা ক্রোধে বিষাদে ফেটে পড়েছে। কেউ কেউ এও বলছে স্কুলে মূলত লেখাপড়া হয়না। ভালো ফলাফল বা ভালো করার মূল কারণ নাকি অভিভাবকদের চেষ্টা আর অর্থের জোগান। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বাম ঘরানার মানুষ। নামে বদনামে তিনি মোটামুটি জবাবদিহি করার মতো। তাই তার কাছে এর একটা বিহিত চায় জাতি। অরিত্রী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে দেশ ও জাতি কোথায় দাঁড়িয়ে। আমরা কী এবার এর একটা সুষ্ঠু প্রতিকার দেখবো? না অরিত্রীর জন্য সবুর করবো? সে আমাদের মৃত্যুন্‌জয়ী জননী হয়ে উঠুক এটাই আমাদের চাওয়া। এতেই তার আত্মার শান্তি ও সমাজের কল্যাণ হবে।

সূত্র : বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

x