অভিশাপ যার জন্য আশীর্বাদ : ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা

আজিজুল হক

বুধবার , ৪ জুলাই, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
60

যদি তোমাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়, রবীন্দ্রনাথের পরে এশিয়ার কোন সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন? উত্তরটা কি তোমাদের জানা আছে? যদি জানা না থাকে তাহলে আমি বলে দিচ্ছি। তিনি হলেন জাপানের সাহিত্যিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছিল। সনদে বলা হয়েছিলআপনি অসাধারণ বর্ণনাত্মক ভঙ্গিমার মাধ্যমে জাপানি হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ভাষার অনুভবী ক্ষমতা। ভাবতে অবাক লাগে, যাঁকে এভাবে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি দেওয়া হল, শৈশবের দিনগুলো তাঁর আক্ষরিক অর্থেই কেটে গিয়েছিল পথের ধুলোর মধ্যে।

জন্মেছিলেন তিনি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন। জাপানের উসাকা শহরে। যখন তাঁর বয়স মাত্র তিন বছর, তখন এক দুর্ঘটনাতে বাবা এবং মা উভয়েরই মৃত্যু হয়। বেচারি ইয়াসুনারি, কে যেন তাঁর সোনালি শৈশব এভাবেই চুরি করে। তখন নিদারুন অর্থকষ্টের মধ্যে দিন কাটছে শিশু কাওয়াবাতার। পথেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রাস্তার ছেলেদের সঙ্গে ভাব করছেন। ভিক্ষার থলি হাতে বসে আছেন মন্দিরের সামনে। পথ চলতি মানুষ জন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন এই ফুটফুটে শিশুটির দিকে। ভাবেন, আহা, কার ছেলে, এভাবে পথের ধারে বসে ভিক্ষা করছে! কাওয়াবাতার ভাগ্য ভালো। এক সহৃদয় ভদ্রলোক তাঁকে টোকিওতে নিয়ে এসেছিলেন। ভর্তি করে দিয়েছিলেন একটি সরকারি আবাসিক বিদ্যালয়ে। সেখানকার পরিবেশ কাওয়াবাতাকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। জাপানি শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠতম গুণগুলোকে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। মন দিয়ে পড়াশোনা করতেন। মাঝে মধ্যে যখন ভীষণ একা লাগত, তখন চুপটি করে এসে বসতেন অলিন্দের পাশে ছোট্ট একটি বেদীর ওপর। তখন হয়তো সন্ধ্যা সমাগত হয়েছে। শহরের বাইরে এই আবাসিক বিদ্যালয়টির অবস্থান। পাঁচিল ঘেরা বিরাট প্রান্তর। দূর আকাশে মিটিমিটি তারা জ্বলছে। তার মধ্যে কোনটি আমার মা, আমি তো চিনতে পারছি না!

কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলেন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা। বরং তাঁর মনের মধ্যে একটা প্রবল প্রতিজ্ঞার জন্ম হচ্ছিল। আমাকে স্বনামধন্য হতে হবে। অনাথ বলে কেউ যেন আমাকে করুণা করতে না পারে। অতি অল্প বয়স থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চাতে মনোনিবেশ করেছিলেন। প্রথমেই ছোট ছোট হাইকু কবিতা লিখতেন। সেই কবিতার মধ্যে মানুষের জীবনের এক একটি দিককে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। ভাবতে অবাক লাগে, কী বিচিত্র সুন্দর মানুষের জীবন। সেখানে আনন্দ আছে, উৎসাহ আছে, আছে ব্যথা এবং বিষণ্নতা। সবকিছু মিলেমিশে মানুষের জীবনকে এত রহস্য রোমাঞ্চময় করে তুলেছে।

পরবর্তীকালে কাওয়াবাতা অবশ্য তাঁর লেখনী শৈলী পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এবার বৃহৎ প্রেক্ষাপটে উপন্যাস লিখতে হবে। উপন্যাস না লিখলে সমকালীন ঘটনাবলীকে ঠিকমতো তুলে ধরা সম্ভব হয় না।

এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক জাপানি সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা পুরুষ। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে সমকালীন বিষয়গুলো বিধৃত হত। এর পাশাপাশি তিনি চিরন্তনতার সাধনাও করে গেছেন।

নোবেল পুরস্কার হাতে পাওয়ার পর কাওয়াবাতাকে জবাবি ভাষণ দিতে বলা হয়েছিল। সেই ভাষণের মধ্যে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন দূর শৈশবের দিনগুলোতে। অকপটে স্বীকার করেছেন তাঁর যন্ত্রণার কথা। যে বয়সে ছেলেরা ঘুড়ি ওড়ায়, অথবা ডাঙ্গুলি খেলে, সেই বয়সে তাঁকে অন্ন সংস্থান করতে হয়েছে। আর এভাবে অতি অল্প বয়স থেকে তিনি কঠোর বাস্তবের জগতে পা রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন বলেই বোধ হয় পরবর্তীকালে তিনি এমন নিখুঁত বর্ণনা দিতে পেরেছেন। ঈশ্বরের অভিশাপ শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছিল ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার কাছে।

x