অবৈধ দখল ও দূষণ থেকে কর্ণফুলীকে বাঁচাতেই হবে

শুক্রবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৯ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ
85

৮ এপ্রিল দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছিল, দুইমাস চারদিন ধরে বন্ধ কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান। প্রথম পর্যায়ে উচ্ছেদের পর কর্ণফুলীর তীরকে সাজানোর ‘মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়নে অভিযান থমকে থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবতা অন্যখানে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। লালদিয়ার চর, ফিশারিঘাট মাছ বাজার ও কর্ণফুলী শিপবিল্ডার্সে আদালত নির্দেশিত অংশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় ‘তিন শক্তিমান’ ব্যক্তির নেতিবাচক ‘তৎপরতার’ কারণে এ অভিযান থমকে আছে বলে জানা গেছে। এ ‘তিন শক্তিমান’ ব্যক্তির মধ্যে দুইজন রাজনীতিবিদ ও একজন ব্যবসায়ী। এ সংবাদ প্রকাশের পরদিন আরেকটি সংবাদে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীর তীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে হাই কোর্ট। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বন্দরের চেয়ারম্যানকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পাঁচ দিন নগরীর সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। পতেঙ্গা এলাকার মোহনা থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকায় কর্ণফুলীর দুই তীর থেকে দুই হাজার ১১২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করার কথা রয়েছে জেলা প্রশাসনের। প্রথম পর্বের উচ্ছেদ অভিযান শেষে ৯ ফেব্রুয়ারি ওই এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেছিলেন, ‘চার-পাঁচ দিনের মধ্যে’ দ্বিতীয় পর্যায়ে কর্ণফুলী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ফের শুরু হবে। তবে এরপর আর উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে রোববার একটি আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাই কোর্ট বেঞ্চ নদী তীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের এই আদেশ দিল। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
কর্ণফুলী নদীকে বলা হয় চট্টগ্রামের প্রাণ। এটি শুধু চট্টগ্রামের ‘প্রাণ’, তা নয়; এটিকে বাংলাদেশের প্রাণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খরস্রোতা কর্ণফুলী মোহনাতেই চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু অব্যাহত দখল-দূষণে এই নদীর প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত। এর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা দিন দিন এমনভাবে চলেছে, যা রীতিমত উদ্বেগজনকভাবে। এটি নদীর দূষণ ও সংকোচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে, যা পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। চট্টগ্রাম শহরে প্রতি বছর যে দুঃসহনীয় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, এর জন্য এই পরিস্থিতিই দায়ী বহুলাংশে। এভাবে যদি কর্ণফুলী দখল হতে থাকে তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরও অদূর ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে। পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরাও এ নদী রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ দূষণ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, দখলের ব্যাপারটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি অনেক দিন। নজরে পড়লে আড়াই হাজার স্থাপনা অবৈধভাবে গড়ে উঠতে পারতো না। হয়ত বা আদালত নির্দেশ না দিলে বিষয়টি জেলাপ্রশাসনের নজরে আজও আসতো না। আদালতের নির্দেশেই জেলা প্রশাসন এ নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করেছে এবং করতে গিয়েই এ আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে কর্ণফুলীসহ যে কোনো নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার মূলে যাওয়া খুবই জরুরি। ফুটপাত বা নদী দখল যা’ই বলি না কেন, আসলে এই প্রক্রিয়ায় থাকে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি। একদিকে উচ্ছেদ করা হলেও অন্যদিকে আবার অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে থাকে। নদী থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর তার পাড় যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান টেকসই হতে পারে। যত শক্তিধর লোকই হোক না কেন, বৃহৎ স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। উচ্ছেদ অভিযান থমকে যাওয়া নিয়ে লোকজনের মুখে নানা কথা প্রচার পাচ্ছে। অভিযান জোরেসোরে চালিয়ে যাবে সেই সব কথা ভিত্তিহীন- তা প্রমাণ করতে হবে। অবৈধ দখল ও দূষণ থেকে কর্ণফুলীকে বাঁচাতে সবাইকে একাট্টা হতে হবে।

x