অবশেষে রুবি সিমেন্টের সেই দেয়াল উচ্ছেদ

আধঘণ্টার মধ্যে নেমে গেল তিন দিন ধরে রাস্তায় জমে থাকা পানি।। সেনাবাহিনী, সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএ’র যৌথ অভিযান

হাসান আকবর

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
3056

বন্দর-পতেঙ্গা এলাকার দুঃখ হয়ে ওঠা রুবি সিমেন্টের দেয়ালটি অবশেষে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সিমেন্ট ক্রসিং এবং সন্নিহিত এলাকায় ফুলে ফেঁপে উঠা পানি সরাতেই দেয়ালটি গুড়িয়ে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে ওয়ান ইলেভেনের সময় অনেকটা জোর করেই দেয়ালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে করে নদীর তীরবর্তী সিমেন্ট ক্রসিংসহ সন্নিহিত এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে দেয়ালটি ভাঙার জন্য দফায় দফায় অনুরোধ করা হয় রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু কোন অনুরোধেই দেয়াল ভাঙেনি তারা। এতে করে শুধু সিমেন্ট ক্রসিংই নয়, কাঠগড় পর্যন্ত পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশনে মারাত্মক সমস্যা হয়েছে। বৃষ্টির পানি নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে নির্মিত দেয়ালটির কারণে গত ক’দিন ধরে এলাকাটি স্থবির হয়ে পড়ে। গতকাল সেনাবাহিনী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষকে দেয়ালটির কিছু অংশ ভেঙে দেয়ার অনুরোধ করা হয়। দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে কোন সুফল মিলেনি। রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ দেয়ালটি ভাঙার জন্য তাদের সময়ের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে বৈঠক শেষ করে। অবশেষে চট্টগ্রাম মহানগরী জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং স্থানীয় শত শত মানুষ যৌথভাবে দেয়ালটি গুড়িয়ে দেয়। বিকেল চারটা থেকে দেয়াল ভাঙার কাজ শুরু হয়। সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএর দুইটি স্কেভেটর এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা ভাঙার পর রাত আটটা নাগাদ পানি নামতে শুরু করে। ২৫ ফুটের মতো দেয়াল ভেঙে দেয়ার পর ফুলে ফেঁপে ওঠা পানি খাল দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে নামতে শুরু করে। তিন দিন ধরে এলাকায় থৈ থৈ করা পানি মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নদীতে চলে যায় বলেও জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন জানান।
স্থানীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, কর্ণফুলী নদীর উপকূলীয় এলাকা সিমেন্ট ক্রসিং এবং নারিকেল তলা, হাসপাতাল গেটসহ সন্নিহিত এলাকার বৃষ্টির পানি স্থানীয় রুবি সিমেন্ট কারখানার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ৭ নম্বর খাল হয়ে নদীতে পড়ে। ছয় ফুট চওড়া নালাটি এলাকার পানি নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত ছিল। যুগের পর যুগ এলাকায় কোনদিন কোন ধরনের জলাবদ্ধতা কেউ দেখেনি। নদী পাড়ের এই এলাকার পানি বৃষ্টির সাথে সাথে নদীতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেনের সময় রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের গেট করতে গিয়ে ৬ ফুট চওড়া নালাটি পুরোপুরি ভরাট করে আঠার ফুট লম্বা একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। রুবি সিমেন্টের গেট করার সময় স্ল্যাব দিয়ে এবং ঢালাই দিয়ে খালে পানি নামার ড্রেন বন্ধ করে দেয়া হয়। এলাকাবাসী ওই সময় প্রতিবাদ করলেও ওয়ান ইলেভেনের প্রভাব খাটিয়ে দেয়ালটি নির্মাণ করা হয় বলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ জিয়াউল হক সুমন দৈনিক আজাদীকে জানান। তিনি বলেন, আমরা ওই সময় দেয়ালটি না দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কথায় কোন পাত্তা দেয়া হয়নি। দেয়াল নির্মাণে নিজেদের সিমেন্ট ব্যবহার করে সিসি ঢালাই দেয়া হয়। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালে দেয়ালটি দেয়া হলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে ২০১০ সাল থেকে। এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হতে থাকে। বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি জোয়ারের পানিতেও সয়লাব হতে থাকে এলাকা।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন বলেন, আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দফায় দফায় রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষকে দেয়ালটির কিছু অংশ ভেঙে ড্রেনটি উন্মুক্ত করে পানি যাওয়ার পথ করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু তাতে কোন সাড়া পাইনি। আমি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তিন দফায় বৈঠক করেছি। কিন্তু প্রতিবারই তারা ‘দেখছেন, দেখবেন’ বলে এলাকাবাসীর দাবি এড়িয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন সুমন।
দুইদিন আগে সরজমিনে এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকাটি থৈ থৈ করছিল পানিতে। সিমেন্ট ক্রসিং থেকে রুবি সিমেন্টের গেট পর্যন্ত এলাকাটি কর্ণফুলী নদী থেকে একশ’ গজ দূরে। অথচ এই রাস্তাটির কোথাও হাঁটু পানি এবং কোথাও কোমর পর্যন্ত পানিতে থৈ থৈ করছিল। বিমানবন্দর, ইস্টার্ণ রিফাইনারি, জ্বালানি তেলের প্রধান ডিপোসমূহ, সাইলো, টিএসপি, ড্রাইডক, বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটিসহ সন্নিহিত অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনায় যাতায়তের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তাটিতে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাঠগড় রোডে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রুবি সিমেন্টের দেয়ালের কারণে নারিকেল তলা এলাকায়ও পানি ফুলে ফেঁপে ওঠে। একই সাথে রাস্তাটির মাঝের অংশ এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ের পাইলিং কাজের জন্য ঘিরে ফেলায় গাড়ি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। টিনের ঘেরায় সংকুচিত এবং বড় বড় খানাখন্দকে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া রাস্তাটিতে সিঙ্গেল লেনে একটি একটি করে গাড়ি পারাপার হচ্ছিল। ফলে ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়। সিমেন্ট ক্রসিং এলাকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া যানজট নগরীর আগ্রাবাদ এবং মাদারবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। হাজার হাজার গাড়ি আটকা পড়ে। মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। হজযাত্রীসহ বিমানবন্দরগামী অসংখ্য যাত্রী ফ্লাইট মিস করে। যাত্রীর অভাবে ফ্লাইট বাতিল করা হয়। শহর থেকে বিমানবন্দরে যেতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। বাধ্য হয়ে বহু যাত্রী অভয়মিত্র ঘাট ও সদরঘাটসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে উত্তাল নদীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় বিমানবন্দরে যাত্রা করে। এত কিছুর পরও রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ দেয়াল ভেঙে নালাটি উন্মুক্ত করতে রাজি হচ্ছিল না।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন জানান, সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিনের নির্দেশে রাস্তার পানি নিষ্কাশনের জন্য বুধবার রাতে চারটি পাম্প মেশিন স্থাপন করা হয়। এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী অসীম বড়ুয়া সারারাত এলাকায় অবস্থান করেন। রাতভর পানি ফেলার পর ভোরে রাস্তায় আর পানি ছিল না। কিন্তু সকালের ভারী বর্ষণে এলাকায় আবারো পানি ফুলে উঠে। এই সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ এলাকায় যান। তিনি পরিদর্শন করে নিশ্চিত হন যে রুবি সিমেন্টের দেয়ালটি অপসারণ না করা পর্যন্ত এই সংকটের সুরাহা হবে না। কাউন্সিলর সুমন জানান, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মেগা প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি জানান। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও পুরো বিষয়টি মনিটরিং করছিলেন। সিটি মেয়র রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের সাথে ফোনে কথা বলেন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করেন। তাদেরকে চট্টগ্রামের বিস্তৃত এলাকার দুর্ভোগের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেয়ালটি ভাঙার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোন কিছুতেই তারা দেয়াল ভাঙতে রাজি হচ্ছিলেন না। রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা দেয়াল অপসারণের সিদ্ধান্ত প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের অনুমোদন আনতে সময় লাগবে। আমরা এখনই কিছু করতে পারবো না। বৈঠকে কোন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবশেষে বাধ্য হয়ে দেয়ালটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়। সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুমন বলেন, সিটি কর্পোরেশনের একটি স্কেভেটরের সাথে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মেগা প্রকল্পের একটি স্কেভেটরও যোগ দেয়। মেগা প্রকল্পের সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী, মেজর মোহাম্মদ মাহমুদ, মেগা প্রকল্পের সিডিএর পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অসীম বড়ুয়া, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে স্কেভেটর দিয়ে প্রায় ২৫ ফুটের মতো দেয়াল ভেঙে ঢালাই দেয়া ড্রেনটি উন্মুক্ত করা হয়। এই সময় সিডিএর ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল আলম চৌধুরী এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দেয়াল ভাঙার সময় শ্রমিকদের সাথে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষও স্বেচ্ছাশ্রমে যোগ দেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মেগা প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন বলেন, দুইটি স্কেভেটর দিয়ে দেয়াল ভেঙে ড্রেনটি উন্মুক্ত করতে চার ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এখন হু হু করে পানি নামতে শুরু করেছে। আধ ঘণ্টার মধ্যে রাস্তার সব পানি নদীতে গিয়ে পড়বে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ৭ নম্বর খালটি মেগা প্রকল্পের আওতায় খনন ও পরিষ্কার করা হবে বলেও তিনি জানান। তবে উপরের ড্রেনের কাজ সিটি কর্পোরেশন করবে বলেও তিনি জানান।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অসীম বড়ুয়া দৈনিক আজাদীকে বলেন, পানি নেমে যাবে। যতই বৃষ্টি হোক না কেন এখানে আর কোন পানি জমবে না। রাস্তাটি দিয়ে গাড়ি চলাচলে আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলো না। তিনি বলেন, রাস্তাটির পাশে ড্রেন নির্মাণের একটি কাজ চলছে। পানির জন্য কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আগামীকাল সকাল থেকে আমরা আবারো কাজ ধরবো। এখানে আমরা ‘ইউ’ শেফের ড্রেন নির্মাণ করবো।
বিষয়টি নিয়ে রুবি সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন ধরনের বক্তব্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে কোম্পানির পাবলিক রিলেশন বিভাগের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। অপর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যিনি এসব ব্যাপারে কথা বলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তিনি বিদেশে রয়েছেন।

x