অবরোধে উত্তাল খাগড়াছড়ি অগ্নিসংযোগ, গুলিবিদ্ধ ১

খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিনিধি

বৃহস্পতিবার , ২২ মার্চ, ২০১৮ at ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ
212

হিল উইমেন ফেডারেশনের দুই নেত্রীকে অপহরণের প্রতিবাদে ইউপিডিএফের ডাকা সকালসন্ধ্যা হরতালে গতকাল দিনভর উত্তাল ছিল খাগড়াছড়ি জেলার পরিস্থিতি। সকাল থেকে জেলার বেশ কয়েকটি স্থানে গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলা সদরের অদূরে বেলা সাড়ে ১১টায় পেরাছড়ার গাছবান এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। এতে গাড়িটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। এর আগে খাগড়াছড়িমাটিরাঙা সড়কের সাপমারার সেগুন বাগান এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টায় একটি ব্যক্তিগত মোটর সাইকেলে আগুন দেয় তারা। মাটিরাঙা থানার ওসি সৈয়দ জাকির হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে মোটর সাইকেলের মালিক সাবেক ইউপি সদস্য প্রবীণ কুমার ত্রিপুরাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’ এছাড়া খাগড়াছড়ির রামগড়ে অবরোধকারীরা এক সিএনজি চালকে গুলি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় রামগড়ের পাতাছড়ার কলাবাড়ি এলাকায় অবরোধকারীরা শরীফুল ইসলাম (২৩) নামে ওই সিএনজি চালককে গুলি করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সিএনজি চালকের উপর অবরোধকারীরা গুলি ছোঁড়ে। পরে তাকে আশংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সড়কের তিন মাইল এলাকায় খায়রুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে আহত এবং তার মোটর সাইকেলে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত খাইরুলকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ।

সূত্র জানায়, অবরোধের সর্মথনে গতকাল সকালের জেলার চেঙ্গি ব্রিজ এলাকার খবং পড়িয়া, স্বর্নিভর, মানিকছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও পানছড়িসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় টায়ারে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। এ সময় জেলার চেঙ্গি ব্রিজ এলাকায় পুলিশ ও হিল আনসার সদস্য অবরোধকারীদের ধাওয়া দিলে অবরোধকারীরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা পাড়ায় তল্লাশি চালায়। তবে এসময় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি তারেক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘অবরোধকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলতি ছোড়ে। খাগড়াছড়িচট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন দেয়। এসময় পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়।

মানিকছড়ি থানার ওসি জানান, ‘অবরোধ চলাকালে সকাল সাড়ে ৬টায় মানিকছড়িতে বিআরটিসির একটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় গাড়ির চালক আবুল কাশেম (৪৫) আহত হন। মানিকছড়ি থানার পুলিশ গিয়ে পরে গাড়িটি উদ্ধার করে।’

অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়িরাঙামাটি, খাগড়াছড়িঢাকা ও চট্টগ্রাম সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। এছাড়া জেলার খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি ও মাটিরাঙাসহ অভ্যন্তরীণ কোনো সড়কে যানচলাচল করতে দেখা যায়নি। তবে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নৈশ কোচগুলো পুলিশ ও বিজিবি স্কটে খাগড়াছড়ি সদরে পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় কিছুটা যান চলাচল করেছে। অবরোধে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। অনেকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান। কয়েকজন পথচারী জানান, ‘পিটিআই থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান।

এদিকে অবরোধের কারণে খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটকরা আটকা পড়ে যান। সাজেক বা কোনো সড়কে যান চলাচল না করায় পর্যটকরা বিভিন্ন হোটেল অবস্থান করেন। ঢাকা থেকে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, ‘অবরোধের কথা আগে থেকে শুনিনি। খাগড়াছড়ি পৌঁছানোর পর জানতে পারি অবরোধে কারণে পর্যটকবাহী গাড়ি সাজেক যাবে না। তাই এখন হোটেলেই অবস্থান করছি।’

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অমল ত্রিপুরা বলেন, ‘পানছড়ি কলেজ গেইট এলাকায় দু’জন এবং গুইমারা বাইল্যাছড়ি এলাকায় একজন আহত হয়েছেন। তবে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অবরোধে ছাত্রযুব সমাজের বিপুল সর্মথন রয়েছে।’

খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম সালাউদ্দিন বলেন, ‘কয়েকটি জায়গায় গাড়ি পোড়ানো ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোথাও বড় রকমের কোনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে জেলার পানছড়িতে পিকেটারদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অবরোধের কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে।’

১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা: আমাদের রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, জেলার কুতুকছড়ি এলাকা থেকে হিল উইমেন ফেডারেশনের দুই নেত্রীকে অপহরণের ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে রাঙামাটির কোতোয়ালী থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন অপহৃত দয়াসোনা চাকমার বাবা বৃষধন চাকমা। এ মামলায় নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা ও শ্যামল কান্তি চাকমাসহ ১৯ জনের নামোল্লেখ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সত্যজিৎ বড়ুয়া নিশ্চিত করেছেন।

উল্লেখ্য, গত রোববার সকালে রাঙামাটির সদর উপজেলার কুতুকছড়ি উপর পাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় ইউপিএফের সমর্থিত গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের নেতা ধর্ম সিং চাকমা গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় দুর্বৃত্তরা একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে অস্ত্রের মুখে হিল ইউমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণ করে।

x