অবকাঠামো নির্মাণে যৌক্তিকতা মূল্যায়নও ব্যয় সাশ্রয়ী হতেই হবে

মঙ্গলবার , ২৮ মে, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
26

দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব মূল্যায়ন করে প্রকল্পের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। কারণ প্রকল্পের জন্য সরবরাহ করা ঋণ ভবিষ্যতে সরকারের দায় তৈরি করবে। ফলে কোন অবকাঠামো আগে বানানো প্রয়োজন, সেটি নিয়ে গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিআইডিএস ক্রিটিক্যাল কনভারসেশন ২০১৯ঃ বাংলাদেশ জার্নি মুভিং বিয়ন্ড এলডিসি’ শীর্ষক দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। রাজধানীর সিঙ সিজনস্‌্‌ হোটেলে এই আলোচনা সভা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. কে এ এম মুরশিদ। অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশের শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাত বা আর্থিক সুশাসনের ব্যবস্থাপনা সময় উপযোগী করতে হবে। উচ্চ ও মধ্য আয়ের দেশে যেতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে হবে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ব্যয় ও গুরুত্ব মূল্যায়ন করে অগ্রাধিকার ঠিক করা উচিত। কারণ এসব প্রকল্পের জন্য নেয়া ঋণ সরকারের দায়। কর্ণফুলী টানেল আগে, নাকি বুড়িগঙ্গা টানেল আগে নাকি কোনটিরই প্রয়োজন নেই, সেটি ভাবতে হবে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ অনুষ্ঠানের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। তাই এখন কথা উঠেছে অবকাঠামো নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে। বেশির ভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে ঋণের অর্থে। এতে দেশের ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠছে প্রকল্প থেকে কী পরিমাণ উপকার পাওয়া যাবে। এ কারণে দেশে বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরা প্রকল্প গ্রহণের আগে আরো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে বলছেন। উল্লিখিত সেমিনারে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা একথাটিই তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে এ পর্যন্ত প্রশ্ন বড় কম ওঠেনি। বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনো প্রকল্পের আগাগোড়া মূল্যায়ন কখনো হয়নি; হলেও তার ফলাফল প্রকাশ পায়নি। এ কারণে অধিকাংশ প্রকল্পের সুফল প্রাপ্তি ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধকও বটে। শুধু অর্থ ব্যয়ের চিন্তা থেকে প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা হলেও তাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণের আগে এর সঠিক মূল্যায়ন এবং উপযোগ প্রাপ্তির পরিষ্কার হিসাব থাকা দরকার। যথাসম্ভব পরিকল্পিত ব্যয়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোন ছাড় দেওয়া যাবে না বলে অর্থনীতিবিদরা যে পরামর্শ দিচ্ছেন, তা আমলে নেওয়া প্রয়োজন। ইউরোপ মহাদেশে সড়ক নির্মাণে খরচ হয় প্রতি কিলোমিটার ২৯ কোটি টাকা, চীনে ১৩ কোটি টাকা ও ভারতে ১০ কোটি টাকা। আর এদিকে অবিশ্বাস্যভাবে বাংলাদেশে গড়ে লাগে ৫৯ কোটি টাকা যা ভারতের ছয়গুণ বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অবকাঠামো দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম। এত ব্যয়ের পরও প্রকল্পের মান ঠিক রাখতে না পারা হতাশাজনক।
বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে কী কী কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে থাকে। প্রথমত যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তখন অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য বেশি দেখানো হয়। কিন্তু সে তুলনায় জমির মালিককে অনেক কম দেওয়া হয়। টেন্ডার আর নিলাম নিয়ে দুর্নীতি তো আছেই। এছাড়া পত্র পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে কী প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়। যত বেশি টাকার প্রকল্প এত বেশি কমিশন পেয়ে থাকেন প্রকল্পের প্রকৌশলী ও অন্য কর্মকর্তারা। ঠিকাদাররা অর্থ ভাগ করে নেন প্রকৌশলীদের সঙ্গে। বিরাট যে দুর্নীতিটি হয় সেটি হলো নির্মাণ সামগ্রী কেনাবেচায়। নির্মাণ সামগ্রীর দাম অতিরিক্ত দেখিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যয়ের ওপর নজরদারি স্বচ্ছতা রক্ষা এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে প্রকল্প কর্মকর্তার বড় ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু যাদের নজরদারি থাকার কথা তারাই যখন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন তখন এ ব্যয় লাগামহীন হয়েতো পড়বেই। এ অবস্থায় প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন যথাসময়ে নিস্পন্ন করার নিশ্চয়তা বিধান করতেই হবে। পাশাপাশি কাজের মান আন্তর্জাতিক মানের সমান হতে হবে। অবকাঠামো বরাদ্দ বাড়ানোর এবং একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে আরো ভালভাবে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পিপিপি এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উপায় হলেও পিপিপির অতীতের কাজকর্ম মোটেই উৎসাহব্যঞ্জক নয়। এ বিষয়ে কোথায় কী ধরনের বাধা বা সমস্যা রয়েছে তা দূর করতে হবে।
দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো গত উন্নয়ন অপরিহার্য। এশিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমেই বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন তরান্বিত করার বিকল্প নেই। তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও দুর্নীতিমুক্ত। উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই বৃহত্তর জনগণের উপযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার প্রকল্পসহ প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেরই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় ক্ষেপণের প্রবণতা। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নির্মাণ ব্যয় ৭০০ কোটি টাকা থেকে পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ প্রকল্প নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব দুর্নীতির দায়ভার বহন করতে হচ্ছে জনগণকে। নির্মাণ চুক্তি লঙ্ঘন করে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে টোলের হার শুরু থেকেই দ্বিগুণ করা হলেও কর্তৃপক্ষের সেদিকে খেয়াল নেই। আমরা চাই মেগাপ্রকল্পের নামে জনভোগান্তি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় বন্ধ করা হোক।

x