অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুর সংক্রমণ রোধে ‘হু’-এর নীতিমালা অনুসরণ জরুরি

রবিবার , ৭ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
40

অপারেশন থিয়েটার বা অস্ত্রোপচার কক্ষকে হাসপাতালের সবচেয়ে রিস্কি জোন বা বিপজ্জনক জায়গা ধরা হয়। জীবাণুর সংক্রমণের কারণে সফল অস্ত্রোপচারের পরও অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। একবার সংক্রমণ হলে তা দূর না করা পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটতেই থাকে। ঈদের আগে-পরে এক মাসে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অস্ত্রোপচারের পর সাতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সব মৃত্যুই হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুর সংক্রমণে; অস্ত্রোপচারের ত্রুটির কারণে নয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতোই অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুর সংক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে রাজধানীর একাধিক বেসরকারি হাসপাতালেও। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ওই মৃত্যুগুলোর পর এর কারণ অনুসন্ধান করে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগ। এর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে তারা। প্রতিবেদনে অপারেশন থিয়েটারের নানা সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই অটোমেটেড নয়। পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার পাশাপাশি ঘাটতি আছে অপারেশন থিয়েটারে পরিচালনায় দক্ষ জনবলেরও। এছাড়া অস্ত্রোপচারের পর ডিটারজেন্ট দিয়ে অপারেশন থিয়েটারের মেঝে পরিষ্কার ও ফ্রেশ অ্যানেস্থেশিয়া সার্কিট ব্যবহারের নিয়ম আছে। জীবাণুনাশের জন্য প্রতিদিন প্রয়োগ করতে হয় আলট্রাভায়েলেট রে, সেই সঙ্গে নিয়মিত বিরতিতে অপারেশন থিয়েটার ফিউমিগেশন বা গ্যাস দিয়ে জীবাণু- মুক্তকরণ প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর ব্যত্যয় ঘটায় অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুর সংক্রমণ হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, হাসপাতাল কোড না মেনে অপারেশন থিয়েটার নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মান অনুসারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্রের ব্যবস্থা না থাকলেও জীবাণু সংক্রমণ ঘটাতে পারে চিকিৎসক, নার্স অ্যাটেনডেন্টদের জন্য জোনের ব্যবস্থা না থাকলেও। পত্রিকান্তরে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক খবরে এসব তথ্য পরিবেশিত হয়। খবরে যে বিষয়টি মোটের ওপর পাওয়া যাচ্ছে, তাহলো জীবাণু মুক্তকরণ যন্ত্রপাতি ও ড্রেসিং সরবরাহ, নিরাপদ খাবার, কার্যকর লন্ড্রি পদ্ধতি ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপারেশন থিয়েটার জীবাণুমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে এবং অপারেশন থিয়েটারের সঠিক নকশার ওপরও জোর দেয়া হয়।
অপারেশন থিয়েটার ও সংশ্লিষ্ট সেবা একজন রোগীর জন্য অপরিহার্য। এর সঙ্গে জীবন-মৃত্যু প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে। এমনই অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তদারকির অভাব, নিয়ম-নীতি মেনে না চলা কোন ক্রমেই সহনীয় নয়। অস্ত্রোপচারের পর এতগুলো রোগীর মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আরো তদন্ত হওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। জীবাণুর সংক্রমণ হবে বলে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রাখা কোন সমাধান নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা মেনে অপারেশন ও আইসিইউ, সিসিইউর মতো স্পর্শকাতর কক্ষের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মধ্যেই রয়েছে সমাধান। এমন ঘটনা শুধু সরকারি হাসপাতালে ঘটছে তা নয়, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। আমরা চাই, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে সব হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার পরিদর্শন করে সেগুলোর যথাযথ মান নিশ্চিত করুক। দেশের চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। তাই, মধ্যবিত্ত সচ্ছল ও উচ্চবিত্তরা দেশে চিকিৎসা না করিয়ে বিদেশ যান। অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুর সংক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এতে রোগীদের বিদেশ যাওয়া বাড়বে বৈ কমবে না। এটা টেকসই চিকিৎসা খাত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধাও নিশ্চয়।
এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সকলের আগে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারগুলোর জীবাণু মুক্তকরণ নিশ্চিত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা, তাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। অপারেশন থিয়েটার জীবাণুমুক্ত কিনা, তা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা সংস্থান করা প্রয়োজন। হাসপাতাল কোড সঠিকভাবে মেনে অপারেশন থিয়েটার নির্মাণ ও তা পরিচালনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবস্থাও জীবাণু সংক্রমণ কমায়। অপারেশন থিয়েটারে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসক, নার্স, অ্যাটেনডেন্টদের জন্য নির্ধারিত জোনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অচিরেই এই বাধা এড়িয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে বিদ্যমান সংশয় দূর করবে।

x