অপহরণ নয়, নিজের ইচ্ছায় ভারতে যান মনিকা রাধা

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
227

অপহরণ নয়, নিজের ইচ্ছায় ভারতে গিয়েছিলেন নিখোঁজ সঙ্গীত শিক্ষিকা মনিকা বড়ুয়া রাধা (৪৫)। গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম একথা বলেন। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে একই বক্তব্য দিয়েছেন মনিকা রাধা।
প্রসঙ্গত, গত ১২ এপ্রিল নগরীর কাতালগঞ্জ এলাকার লিটল’স জুয়েল স্কুলে গানের শিক্ষিকা মনিকা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তার কোন হদিস না পাওয়ায় তার স্বামী দেবাশীষ বড়ুয়া ১৩ এপ্রিল এ বিষয়ে নগরীর খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ২৮ এপ্রিল সেটি ‘অপহরণ’ মামলায় রূপান্তর করা হয়। তার নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাটির বিস্তারিত তুলে ধরতে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আমেনা বেগম বলেন, ‘ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে ভারতের ব্যবসায়ী কমলেশ কুমার মল্লিকের (৩৫) সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মনিকার। গত ১২ এপ্রিল কমলেশ চট্টগ্রামে এসে সড়কপথে প্রথমে মনিকাকে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই মনিকাকে ভারতে অনুপ্রবেশ করানো হয়।’
আমেনা বেগম বলেন, ‘এটা ছিল একটা সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) ঘটনা। তাই ঘটনার পর থেকেই আমরা সর্বোচ্চ সক্রিয় ছিলাম। মামলার সূত্র ধরে পুলিশ ভিকটিমের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে থাকে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ জানতে পারে মনিকা ভারতে অবস্থান করছেন।’ তিনি বলেন, শুরুতে আমরা মনে করেছিলাম তাকে অপহরণ বা পাচার করা হয়েছে। পরে জানতে পারি তিনি স্বেচ্ছায় কমলেশের সাথে ভারতে চলে যান। যারা তার সন্ধান চেয়ে মানববন্ধন করেছেন তারাও জানতেন মনিকা ভারতে আছেন। এটা আমাদের জানা থাকলে আরও আগেই তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হত বলে জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ব্যবসার কাজে বাংলাদেশে আসা কমলেশকে গত ৪ নভেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করা হয়। কমলেশের মাধ্যমে মনিকাকে কৌশলে সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশে আনা হয়। পরে তাকে হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা টিম। জিজ্ঞাসাবাদে মনিকার দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, সেখানে বিয়ে করে তারা কলকাতায় একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন। স্বামীর সূত্রে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র পান। এটাকে সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বলে থাকে। ভারতে মনিকার নাম বদল করে দেওয়া হয় অনামিকা মল্লিক। তিনি সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ডে জন্মসাল লেখেন ১৯৮৭ সালের ৬ আগস্ট। তিনি বলেন, দু’জনকে আদালতের কাছে সোপর্দ করা হবে। আদালত যা সিদ্ধান্ত নেবে সে অনুযায়ী পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পুলিশ বলেছে, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বড় মেয়ের মাধ্যমে ফেসবুকে নিজের নামে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন মনিকা। বিভিন্নজনের কাছ থেকে বন্ধুত্বের অনুরোধ আসতে থেকে। একপর্যায়ে আগস্টের শেষ সপ্তাহে আসে কমলেশের কাছ থেকে বন্ধুত্বের অনুরোধ। মনিকা তা গ্রহণ করেন। তাদের মাঝে শুরু হয় ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে কথাবার্তা। ডিসেম্বর ফেসবুকে যোগাযোগের পর কমলেশের পরামর্শে দুজন হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ শুরু করেন। তখন মনিকা ফেসবুকে নিস্ক্রিয় হয়ে যান।
গত ১৩ এপ্রিল রাতে তারা যশোরের বেনাপোলে পৌঁছেন। ১৪ এপ্রিল ভোরে কমলেশ বৈধভাবে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। মনিকাকে নেওয়া হয় অবৈধ পথ দিয়ে। কমলেশ মনিকাকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বিরাটি এলাকায় (কোড নম্বর-৭০০১৩২) মধুসূধন ব্যানার্জি সড়কের সিদ্ধেশ্বরী ভবনের একটি ফ্ল্যাটে উঠেন। ফ্ল্যাটটি তার নিজের।
মনিকা নগর গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, সেখানে যাবার এক সপ্তাহের মধ্যে তারা এক মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেন। তবে এ বিবাহের কোন রেজিস্ট্রি করা হয়নি। কমলেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাসাতের বীরেন কুমার মল্লিকের ছেলে। ভারত থেকে বাংলাদেশে কেমিকেল রফতানি এবং বাংলাদেশ থেকে টি-শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক আমদানির ব্যবসা করেন কমলেশ। এর মধ্যে পুলিশের কাছে খবর আসে গত তিন মাস ধরে মনিকার সঙ্গে তার দুই ছোট বোনের যোগাযোগ আছে। তাদের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা হয়। এমনকি তাদের মাধ্যমে দুই মেয়ের খোঁজখবরও নিয়মিত নিতেন মনিকা। পুলিশ জানায়, ৫ নভেম্বর বিকেলে মনিকা সাতক্ষীরা ভোমরা সীমান্ত সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে আসেন। কিন্তু আমাদের দেখে বুঝে যান, তার স্বামী আটক হয়েছেন। এসময় তিনি জিরো পয়েন্ট থেকে ফিরে যান। কমলেশের বারবার অনুরোধে একপর্যায়ে ৬ নভেম্বর আবারও অবৈধ পথে মনিকা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তখন আমরা তাকেও আমাদের হেফাজতে নিই।
এদিকে এ ঘটনায় বিস্তারিত উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মনিকা। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মহিউদ্দিন মুরাদের আদালত এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। একই আদালত কমলেশ কুমার মল্লিককে (৩৫) জামিন দিয়েছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

x