অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি এদেশে পুষ্টিহীনতা ও বাল্যবিবাহ রোধ করুন

রবিবার , ৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
35

অপরিণত শিশু জন্মহার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশুকে অপরিণত হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের শিশুর স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যা থাকে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুরও অন্যতম কারণ এটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বে অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। দেশে মোট জন্ম নেওয়া শিশুর ১৯ দশমিক ১ শতাংশ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নেয়। মায়ের অপুষ্টি, অল্প বয়সে মা হওয়া ও গর্ভকালীন মায়ের জটিলতাকে অপরিণত শিশু জন্মের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। তাদের মতে, মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, দূষণসহ বিভিন্ন কারণেও অপরিণত শিশু জন্মায়। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে আরো বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউনেটোলজি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপকের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়ের অসুস্থতা অপরিণত শিশু জন্মের মূল কারণ। মায়ের হৃদরোগ, কিডনি রোগও এর জন্য দায়ী। সচেতনতা বাড়লেও এখনো আমাদের দেশে কিশোরী মায়েদের মধ্যে গর্ভধারণের হার অনেক বেশি। অল্প বয়সে গর্ভধারণ করলে মায়ের শরীর ঠিকমতো গঠিত হওয়ার আগে গর্ভধারণ করার ফলে অপরিণত শিশু জন্ম নেয়। মায়ের অপুষ্টিও এজন্য দায়ী। পাশাপাশি ইনফার্টিলিটিতে ভোগা মায়ের হার এখন বাড়ছে। ওষুধ খেয়ে অনেক মা গর্ভধারণ করার কারণে জটিলতা তৈরি হয়। মায়ের কথা ভেবে অনেক সময় আগেই প্রসব করাতে হয়। মায়ের অসুস্থতা শিশুর বৃদ্ধিকে ব্যাহত করেও অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। বিশ্বে শিশু মৃত্যুর বড় কারণ অপরিণত নবজাতক। এ শিশুদের যথাযথ সেবা দেওয়া নিশ্চিত করা না গেলে এদের মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। উপরন্তু বেঁচে থাকা শিশুরাও পরবর্তী জীবনে নানাবিধ জটিলতা নিয়ে পরিবার ও সমাজের জন্য নানা দুশ্চিন্তা ও বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়ায় অধিকাংশ সময়। সমীক্ষায় দেখা যায়, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতেই অপরিণত শিশু সবচেয়ে বেশি জন্ম নেয়। বিশ্বব্যাপী যত অপরিণত শিশু জন্ম নেয়, তার দুই-তৃতীয়াংশই দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকায়, যেখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সম্প্রতি আরো উদ্বেগজনক তথ্য পাচ্ছি আমাদের উল্লিখিত পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আমাদের দেশেই বিশ্বে অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেয়। মা ও শিশু মৃত্যু হার কমিয়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিশেষ পুরস্কার পাওয়া একটি দেশের জন্য এ তথ্য সত্যিই উদ্বেগজনক। শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুস্থ ও সবল শিশু আগামী দিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কাজেই শিশুদের রক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ বছরের কম ও ৪০ বছরের বেশি যেসব মহিলা গর্ভধারণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে অপরিণত শিশু জন্মদানের হার বেশি। বাল্যবিবাহ এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। কিশোরী বয়সে গর্ভবতী হলে অপরিণত বয়সের শিশু জন্মের ঝুঁকি বেশি থাকে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে তা কমানো সম্ভব। কমপক্ষে দুই বছর অন্তর সন্তান নিলে এ ঝুঁকি এড়ানো যায় বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। গর্ভকালীন সঠিক যত্নবান হওয়া, সময়মতো ক্লিনিকে চেকআপ এবং নিরাপদ ডেলিভারি বা প্রসব অপরিণত শিশু জন্মদান কমাতে সহায়তা করে। গুণগত স্বাস্থ্যসেবায় পারে অপরিণত বয়সে জন্মানো শিশুর মৃত্যু ঠেকাতে। বাল্যবিবাহের পরিমাণ না কমালে নারীর প্রতি সহিংসতা, মা ও শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, অপরিণত শিশু জন্ম, নারী শিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
বাংলাদেশে অপরিণত শিশু জন্মের প্রধান কারণ মায়ের অপুষ্টি ও অতিরিক্ত পরিশ্রম। অপুষ্টিতে আক্রান্ত মায়েরা দুর্বল হয়। অপরদিকে অপুষ্টির সঙ্গে সংক্রমণের সম্বন্ধ আছে। এটা অনেক ক্ষেত্রেই অপরিণত শিশু জন্ম দেওয়াকে ত্বরান্বিত করে। সর্বোপরি অপরিণত বা সময়ের আগে জন্মানো শিশুর জন্ম রোধ করতে মায়েদের কিছু করণীয় আছে, যেগুলো পালন করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে অপুষ্টি, সংক্রমণ, অতি পরিশ্রমসহ রোগব্যাধি থেকে মায়েদের রক্ষা করা জরুরি। সুস্থ ফুটফুটে হাসি-খুশি শিশুর জন্ম মায়েদের গর্ভকালীন সুস্থতা ও নিয়ম মেনে চলা জীবন যাপনের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। সুস্থ শিশু জন্মদান আমাদের সর্বোচ্চ প্রয়াস হওয়া উচিত। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ। এজন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রসূতি স্বাস্থ্য সেবায় বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসিত হলেও শিশু মৃত্যুর হার এখনো বেশি। এটি কমিয়ে আনতে মেয়েদের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। সার্বিক পুষ্টিমান বাংলাদেশের এখনও অনেক নিচে পড়ে রয়েছে। এজন্য শিশুর বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নানা জটিলতার কারণে সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুরা মারা যায়। আর বেঁচে থাকলেও সেসব শিশু নানা সমস্যায় ভোগে। অপরিণত শিশু জন্ম প্রতিরোধে উন্নত পরিচর্যা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা বিস্তৃত হলেও সেটি এক্ষেত্রে কোন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। কেন পারছে না তা খতিয়ে দেখে কর্মসূচির পুনর্বিন্যাস করতে হবে। অপরিণত শিশু জন্মের যেসব কারণ এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে বাল্যবিবাহ ও পুষ্টিহীনতাই প্রধান। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মা ও শিশুদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া অত্যাবশ্যক। সর্বোপরি উন্নত চিকিৎসা সেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে।

x