অপরাধের ঘটনা হ্রাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে

রবিবার , ১০ মার্চ, ২০১৯ at ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
35

ক্রমেই বেড়ে চলেছে খুন-অপহরণের মতো ভয়ংকর সব অপরাধ। বেড়েছে দস্যুতা, অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন ও মাদকের মামলা। নানা অপরাধে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল দৈনিক আজাদীতে এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘নগরীতে বাড়ছে অপরাধ : তুচ্ছ ঘটনায় হচ্ছে খুন, আত্মহনন পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্ব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরীতে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রথম দুই মাসের মধ্যে শুধু জানুয়ারিতেই নগরীতে ৬৭৮টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। নগরীর ১৬টি থানায় এসব অভিযোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এতে খুন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, অপহরণ, চোরাচালান, মারামারিসহ নানা অপরাধের ঘটনা আছে। এর বাইরেও নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন কারণে যেগুলো থানায় অভিযোগ হিসেবে আসছে না। অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন সিএমপির কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে আত্মহত্যার ঘটনাও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তু্‌চ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন ও আত্মহননের ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক অস্থিরতা, একাকীত্ব, হতাশাসহ নানা কারণে এসব অপরাধের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং সংস্কৃতি চর্চার ওপর জোর দেন তারা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারিতে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় সিএমপিতে ৬৭৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি খুনের ঘটনা ঘটে। এছাড়া অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালানে ৪৮৮টি, নারী ও শিশু নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ১২৫টি ঘটনার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাসের গতকাল পর্যন্ত নগরীর ১৬টি থানায় যেসব অপরাধের ঘটনা ঘটে তার মধ্যে কিছু স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির আরেকটি কারণ মাদকাসক্তি। আজকের তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। মাদকের নেশা কেবল বাড়তেই থাকে। নেশা করার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে অনেকে সামাজিক অপরাধ করে। চুরি-ডাকাতি ও শিশু অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বৃদ্ধির এটিও একটি কারণ। ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইন এত সহজলভ্য হয়ে পড়েছে যে, এগুলো এখন নাকি অনেক পানের দোকানেও কিনতে পাওয়া যায়। যশোর, বেনাপোল, দর্শনা ইত্যাদি সীমান্ত এলাকার ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ডে কেবল বাংলাদেশে অবৈধভাবে ব্যবসা করার জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফেনসিডিল তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ওই কারখানাগুলোয় ‘কফ লিঙ্কার্টস’ হিসেবে তৈরি না করে নেশা করার লক্ষ্যে বিশেষভাবে ফেনসিডিল তৈরি করে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করা হয়। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে চোরাচালানিদের অদৃশ্য সমঝোতা ভেঙে গেলে এসব মাদকের চোরাচালান ধরা পড়ে। তবে ধরা পড়লেও চোরাচালানিদের শক্তিশালী সিন্ডেকেট এসব অপরাধীকে জামিনে বের করে আবারও কাজে লাগায়।
প্রযুক্তিও সামাজিক অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির একটি কারণ বলে অনেকে মনে করেন। কোনো সমাজ শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে না পারলে সেখানে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। আজকাল তরুণদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত। এই আসক্তি এতো বেশি যে তার সাথে মাদকাসক্তির তুলনা করে অনেকে। তাঁরা বলেন, মাদকের পরিবর্তিত সংস্করণ হচ্ছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বা ইন্টারনেটে অকারণে অতিমাত্রায় আসক্তি। মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন যে, একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যারা শেয়ার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সমবেদনা দিয়ে থাকেন এ ব্যাপারে উভয়ই অতিমাত্রায় ফেসবুক বা যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত। বলা হচ্ছে, মাদক ছাড়া যেমন অনেকে থাকতে পারেন না, সেরূপ ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া থাকতে পারেন না! নেট সমস্যা বা কিছু সময়ের জন্য এ সব মাধ্যম বন্ধ থাকলে হতাশায় রি-অ্যাকশন দিয়ে পোস্ট দেন তাদের মোটা দাগে আসক্ত বলা যায়! যে সব ফেসবুক ব্যবহারকারী একাকিত্বে ভোগেন তারাই ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বেশি স্ট্যাটাস দেন। প্রেম বা অন্য ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বা যারা অযথা ফেসবুক তর্কে লিপ্ত হয় বা প্রশ্ন ছুঁড়ে উত্তর আশা করে তারাও ফেসবুকে অতিমাত্রায় আসক্ত। ফলে এর থেকেও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে অপরাধ কমানো যায়। অপরাধীদের শাস্তি দিলে তারা অপরাধ করা থেকে বিরত থাকবে। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে।

x