অপত্য

লাবণ্য ভট্টাচার্য

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ
43

হঠাৎই যেন কাল বৈশাখী ঝড় হামলে পড়েছে তার উপর। চড়, থাপ্পড় অজস্র কিল,ঘুষির তাণ্ডব-আর লাগামহীন অকথ্য গালির লাগাতার শিলাপাত, হাত নেড়ে অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বলতে চাইছে সে, কিন্তু ক্ষীপ্ত প্রতিপক্ষ নাছোড়,আক্রান্ত লোকটা তাই দিশেহারা।
তার দুটো দাঁত গত হয়েছে কিছুদিন আগেই, বাকি নড়, বড়ে দাঁতগুলোও মারের চোটে পড়ো, পড়ো প্রায়,অসহায় লোকটার দু চোখ উপচে পড়া জল প্রপাত ধূয়ে দিচ্ছে তার গায়ের ময়লা ফতুয়া, গামছা।
দুই একটা শব্দ প্রসবের চেষ্টা চালাতেই আবারও ভারী ওজনের একটা চড় এসে পড়ে লোকটার মুখে তার খোলা চোখে ঘূর্ণি ওঠে, ঠোঁটের কোনো রক্ত। এ ঝড় কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। শরীরে ঝাঁকিয়ে বসা বেশ পুরানো বার্ধক্যের অক্ষমতায় সে ব্যর্থ হচ্ছে বার, বার আর সেই কষ্টই বুকের পাঁজর খাঁমচে ধরেছে তার।
একটা অপরাধতো হয়েছে, চুরি করেছে সে, চোরের সাজা এ সমাজে নির্মম প্রহার। তার রুগ্ন স্ত্রী যদি
এ দৃশ্য দেখতো তবে তার দুর্বল হৃদযন্ত্রটি বিকল হয়ে পড়তো দ্রুত ।
অসুস্থ মানুষটা বিশেষ কিছু খেতে পারে না, রাত দিন বিছানায় পড়ে থাকে। নিজেই নিজের আয়ুর খাঁচা ভেঙে পালাতে চায়, তবু ও জীবন প্রভুভক্ত কুকুরের মত মাঝে মাঝে এসে তার গা চেটে যায়। ঐ মৃত প্রায় মানুষটার জন্য ওষুধ পত্রের বালাই নেই, একটু খাবার দিতে শত অনীহা, সংসার থেকে দুই আপদ বিপদ বিদায় হলেই বাঁচে সবাই, আজ একটা মিষ্টি খেতে চেয়েছে হিতেনের স্ত্রী, দোকানের শোকে সে সাজানো থরে, থরে হরেক পদের সুস্বাদু মিষ্টি সেখান থেকে একটা নিলে ছেলের আর্থিক ক্ষতি কতটুকু? গর্ভধারিণী মা তার এই সামান্য অধিকার টুকু হারালে কখন? এই প্রশ্ন হিতেনের শূন্য মগজের খোলে তীরের মত গেঁথে থাকে। লালু তো তার নিজেরই ছেলে, লালুর মা মৃত্যু পথ যাত্রী, অনেকটা অপারগ হয়ে ছেলের দোকান থেকে একটা পান্তুয়া সরিয়ে ছিলো , অমনি হাতে নাতে ধরা পড়া। তাইতো অপত্য স্নেহে বড় করে তোলা আপন সন্তানের হাতে নির্মম প্রহারে জর্জড়িত হতে হোল তাকে, বাবাকে মারতে, মারতে প্রচণ্ড ক্লান্ত লালু গলার গামছা খুলে পরিশ্রমের নুনঘাম মুছে দোকানদারীতে মন দেয়।
অগত্যা, ধীর পায়ে বাড়ীর পথে হাঁটা দেয় হিতেন। কিন্তু মারের চোটে ফুলে ওঠা চোখ মুখ নিয়ে কারো সামনে পড়ে গেলে লজ্জা পাবে সে, তাই রায় বাবুদের পুকুর ঘাটলায় এসে দাঁড়ায়। চারিদিকে সুনসান নীরবতা, কালের নির্মম কামড়ে হতশ্রী সব। পুকুরের অনেকটাই দখলে নিয়েছে কচুরী পানা, ঘাটের শেষ ধাপে নেমে এসে হাত মুখ ধোয়ার চেষ্টা করে হিতেন, সকালের নবীন রোদে জলের আয়না চিক চিক করছে। সেখানে মুখ দেখে হিতেন, ভিমরুলের চাকে পড়া কোন মানুষ যেন, ফুলে উঠেছে চোখ মুখ। রক্তের দাগ ধুয়ে মুছে ঘাটলার ভাঙা সিঁড়িতে এসে বসে পড়ে হিতেন। কি হবে সামনের দিনগুলোয়? নানা দুর্ভাবনা আস্তানা গাড়ে তার মাথার ভিতর। নিজের জীবনটা এখন বোঝা হয়ে উঠেছে তার কাছে ।
হিতেন ভাবে তার ক্ষয়ে যাওয়া ভাঙা চোরা স্বপ্নগুলোকে সে আর জোড়া দিতে পারবেনা কোন দিন। জীবন হয়তো এমনিই, মানুষ যখন তার সুখ স্বপ্ন সাজিয়ে জীবনের মুখোমুখি হতে চায় তখনই জীবন মুখ ঘুরিয়ে নেয়,
এমনি নানামুখী ভাবনা ডালপালা বিস্তার করে জড়িয়ে ধরে হিতেনকে, একটা গাছে ঠেস দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে সে। মহাশূন্যের স্তব্ধতায় ভরে উঠে তার মাথা। তন্দ্রা, অবসাদ বিষন্নতা বেশ কিছু সময়ের জন্য কয়েদ করে ফেলে তাকে।
এরই ফাঁকে রোদ মরে আসে, বিকেল তার পোড়া ছাই ছড়িয়ে, ছিটিয়ে ছুটছে সন্ধ্যার ট্রেন ধরতে। চোখ খুলতেই এ দৃশ্য। হিতেনের বুকের ভেতর মোচড় পড়ে। ঘরে তার অসুস্থ স্ত্রী ক্ষুধা তৃষায় কাতর। ছুটতে ছুটতে বাড়ী ফেরে হিতেন, অস্থির চোখজোড়া নিয়ে ঝুঁকে পড়ে স্ত্রীর মুখের উপর, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা খোঁজে ।
একটু জল খাবার তো দিতে হবে তাকে। লালুর বউ এর কাছে চাইতেই নেকড়ে মুখে খেঁকিয়ে ওঠে সে। শংখীনীর মত ফণা নাচায়।
“ছেলেকে জেলে পুরে দিয়ে এখন খাবার চাইতে এসেছো কোন আক্কেলে”?
হিতেনের চোখ ছানাবড়া, এসব কি বলছো বউ,
তার কথায় ঘোর আপত্তি লালুর বউয়ের “আহ! ন্যাকা খোকা, না হয় দুটো চড় থাপ্পড় মেরেছে, তাই বলে নিজের ছেলের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে নালিশ করলে? এখন যে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো কি হবে আমার সংসারের”?
বিদ্যুতের জটিল তারের মত অজস্র ভাবনা হিতেনের মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যায়। সে তো কোন নালিশ করেনি, তাহলে লালু কেন থানায় গেলো? প্রশ্নটা হিতেনকে কাঁটা ফুটিয়ে দিয়ে চলে যায়, কোন উত্তর না রেখেই।
দীর্ঘক্ষণের অনুরোধের পর দুটো বিস্কিট পেয়ে তাই জলে গুলে লালুর মার পেটে চালান করে দেয় হিতেন। খেতে না খেতেই আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে তার স্ত্রী, নিজেও কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ে হিতেন। বিছানা ধরতেই হাজারো ভাবনা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে মাথার ভেতরে। তার একমাত্র সন্তান এখন থানা হাজতে।
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, মশার কামড় তার উপর হয়তো চলছে দারোগা বাবুদের মার।
বিস্ময়ের ধারালো পোঁচ পাড়ে হিতেনের বুকের ভেতর। লালুর নামে থানায় নালিশ করলো কে? সে তো মুখ খোলেনি কারো কাছে। কেন তবে ছেলেটাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো? এখন কে ছাড়িয়ে আনবে তাকে? এখানে তো একেবারেই অসহায় হিতেন ।
নানা দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা কালি ডাকাতের মত তার ঘুম চুরি করে নিয়ে যায়, এভাবেই ধড়ফড়িয়ে নির্ঘুম রাতের সীমানা পাড় করে হিতেন, ভোর নামতেই সে ছুটে যায় প্রতিবেশী দয়ালের কাছে। তারপর ঘটনার আদ্যপান্ত বর্ণনা। শুনে মিট মিটিয়ে হাসে দয়াল। “আরে তোমার নালিশের অপেক্ষায় তো কেউ বসে নেই”। কথা বলতে বলতে দয়াল মোবাইলের সুইচ অন করে , হিতেনের চোখের সামনে মেলে ধরে গতকালের সেই মার পিঠের দৃশ্য। অবাক চোখে তাকায় হিতেন, পলক পড়েনা আর।
ভিডিও শেষ হতেই সুইচ অফ করে দয়াল। “এই যে তোমার গায়ে হাত তুলেছে ছেলে, সেটি দেখছে গোটা দেশের মানুষ”
ছি; ছি; কি লজ্জা অপরাধীর মতই সংকোচে কুঁকড়ে যায় হিতেন। মুখ খোলে দয়াল; “তোমার কিসের লজ্জা? অন্যায় তো করেছে লালু? তাই তাকে এই অন্যায়ের সাজা দিতে দোকান থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ”। তবুও হিতেনের মাথা সা্‌ফ হয়না। জট খোলেনা কিছুতেই, তাকে বোঝাতে এগিয়ে আসে দয়াল। “আরে দোকানে লালু যখন তোমাকে মার ছিলো তখন কে বা কারা সেই দৃশ্য মোবাইলের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে ফেসবুকে ছেড়েছে। এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ
থেকে প্রশাসনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, সব খানে টনক নড়েছে পুলিশ কর্মকর্তারও। আমতা আমতা করে হিতেন, “যদি থানায় মার ধর করে লালুকে? তাতে কি বুড়ো বাপকে যে এমন হেনস্থা করলো? থাকনা কদিন থানায়, তুমি এত উতলা হচ্ছ কেন’? দয়ালের পরামর্শ হিতেনের মনপুত: নয়,“ না দাদা ছেলেটার বড্ড কষ্ট হবে”।
“তাহলে কি আর করা থানায় যাও, গিয়ে বড় বাবুকে বল লালুকে ছেড়ে দিতে”।
থানা কম্পাউন্ডে ঢুকতেই খেঁকিয়ে ওঠে, পুলিশ কনষ্টেবল, অনেক অনুনয়, বিনয় করে তবেই হিতেন বড় বাবুর দেখা পায়, গিয়েই দারোগা বাবুর একেবার পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে “বাবু আমার ছেলেটাকে মাফ করে দেন”।
বয়স্ক মানুষ। বড় বাবু তাকে হাত ধরে টেনে তোলে। ততক্ষণে হিতেন চোখের জলে নাকের জলে একসা।
“ও তুমিই তাহলে লালুর বাবা”।
“আজ্ঞে বড় বাবু” কথা বলতে, বলতে মাথা নিচু করে অপরাধীর ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে হিতেন।
এবার কথার ট্রেন চালু করে বড় বাবু। “তা তুমি থানায় কেন এসেছো ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে”?
“আজ্ঞে বড় বাবু”।
“কিন্তু জল অনেকদূর গড়িয়েছে। লালুকে ছাড়া যাবে না”। শূন্য দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে বড় বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে হিতেন, অসহায় কোন পিতার আকুতি জমাট বাঁধে।
কিন্তু এতে বড় বাবুর ঘোর আপত্তি, “তোমার ছেলে জঘন্য অপরাধী। আর এ অপরাধের জন্য গোটা দেশ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। সামান্য একটা মিষ্টির জন্য জন্ম দাতা পিতাকে এতটাই অপমান?
লাঞ্চনা”? “আমিওতো অপরাধী বড় বাবু, না বলে চুরি করেছি যে,” লালুর দোষ ঢাকতে তৎপর হিতেন।
“চুপ কর” বড় বাবু ধমক দেয়, “অন্যায় করলে সাজা পেতে হবে, দোষী সাজা না পেলে সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে”
আবারও বড় বাবুর পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে হিতেন।
“লালুকে আপনে ছেড়ে দেন, বড় বাবু। এবারের মত মাফ করে দেন তারে, কাল থেকে তার পেটে কিছু পড়েনি ,ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর ছেলেটা”। ওঠ্‌, ওঠ্‌, পা ছাড়, “তুমি কি মানুষ হিতেন? কাল যে তোমাকে এতটাই মারলো তুমি এসেছো তাকে ছাড়িয়ে নিতে আজ”।
“কি করবো বড় বাবু, আমি যে তার বাপ,”
অপত্য পিতৃ স্নেহের কাছে হার মানে বড় বাবু, লক্‌ আপ থেকে বাইরে আসে লালু, বাবাকে দেখতে পেয়ে মাথানিচু করে দাঁড়ায়, বড় বাবুর লাঠির খোঁচা খেয়ে মুখ তোলে লালু্‌।
“দেখ্‌, দেখ্‌, যারে তুই এত মারা মারলি, সে এসেছে আজ আমার পায়ে ধরে তোকে ছাড়িয়ে নিতে, তোর মত নিষ্ঠুর ছেলের দণ্ড পাওয়া উচিত ছিলো”। এগিয়ে আসে হিতেন “ বড় বাবু ওরে মাপ করে দেন, অবোধ শিশু ও, আমি যে তার বাবা”।
ছাড়া পেয়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসে দুজন। ছেলের মুক্তির অপার আনন্দের দ্যুতি এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে হিতেনের ক্ষতবিক্ষত মুখে।

x