অন্যরকম একুশ

নাসের রহমান

বৃহস্পতিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ
56

প্রত্যয়ের এবারের একুশ কাটে অন্যভাবে। একেবারে ভিন্ন পরিবেশে। এভাবে যে একুশের প্রথম প্রহর ভোর আর সকালবেলা কাটবে সে ভাবতে পারেনি। কৈশোর থেকে একুশের প্রথম প্রহরে প্রভাতফেরীতে অংশ নেয়। স্কুল কলেজ ভার্সিটি যেখানে পড়েছে ভোরে ভোরে শহীদ মিনারে গিয়ে পৌঁছেছে। কর্মক্ষেত্রে যেখানে থেকেছে গ্রামে শহরে জেলা ও উপজেলায় সেখানে শহীদ মিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি বান্দরবান থাকতেও শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছে, দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। তবে কখনো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হয়নি। অন্যসময় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনেকবার গিয়েছে কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারিতে কখনো যায়নি। এবার কর্মসূত্রে ঢাকা থাকায় এ অপূর্ব সুযোগ আসে। কৈশোরে গ্রাম থেকে শহরে এসে প্রথমে শহীদ মিনারে গিয়ে যে আবেগ অনুভূতিতে জড়িয়ে গিয়েছিল এবারেও যেন এরকম কিছু অনুভব করতে শুরু করে। ভোর পাঁচটায় তার এক তরুণ সহকর্মী নিচে এসে অপেক্ষা করে। সোয়া পাঁচটায় বেরিয়ে পড়ে। রামকৃষ্ণ মিশন পার হয়ে দিলকুশা হয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে চলে। এখনো রাস্তায় লোকজন তেমন নেই। কিছু ভ্যান চালক আর সাইকেলে পেপার নিয়ে হকারেরা ছুটে চলেছে। রাস্তা ফাঁকা , দূরপাল্লার গাড়িও তেমন চোখে পড়েনি। ভবনের পাশ দিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। ওয়ালের ভেতর থেকে গাছের ডালপালায় বাহারী ফুলের সমারোহ। রাতে ঝরে পড়া ফুল পাতা ফুটপাত বেয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। এসবের উপর দিয়ে হেঁটে চলছে। পাখির ডাকও কানে আসছে। হঠাৎ মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। কিন্তু হাঁটার গতি কমে না। স্টেডিয়াম পার করে গুলিস্থানের কাছে এসে পৌছে। মোড়েও কোন যানবাহন নেই। সবকিছু ফাঁকা, রিকশাও নেই। দু’একজন লোক হেঁটেই চলেছে।
গুলিস্থান ফেলে কিছুদূর এগিয়ে গেলে কিছু লোকজন দেখা যায়। এরাও শহীদ মিনার যেতে বের হয়েছে। কিন্তু এদিকের পথ বন্ধ। দুজন পুলিশ রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। এদের অনেক পথ ঘুরে যেতে হবে। হাঁটতে শুরু করে। ভার্সিটির একুশে হলের সামনে এসে ক্ষণিক দাঁড়ায়। এ হলটি সে আর আগে দেখেনি। এ নামে যে একটি হল হয়েছে তা পত্র পত্রিকায় দেখছে। খুব ভাল লাগে একুশ নামের হলটি দেখে। এ হলের ছাত্রদের মাঝে একুশের চেতানা কতটুকু আছে কে জানে। আজ এ হল থেকে প্রভাত ফেরী বের হয়েছে কিনা বা এরা শহীদ মিনারে যাবে কিনা বাইর থেকে এসব কিছু বুঝা যাচ্ছে না। হলের সামনে কতটুকু এগিয়ে যাওয়ার পর চিপা এক গলিতে ঢোকে। এ পথে তাড়াতাড়ি শহীদ মিনারে পৌঁছা যায়। গলি থেকে রাস্তায় এসে দেখে লোকজন অনেক বেড়েছে।
মেডিকেলের পুরানো গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এ গেটটি বন্ধ। পাশের পুরানো বিল্ডিংটি বন্ধ এখন। বিল্ডিংএ কালো একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড। সাদা অক্ষরে লেখা এখানে বরকত গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। এখন লোকজন কেউ ঐ দিকে তাকায় না। সবাই শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসছে। পুলিশ এ রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছে। ঐ পাশ দিয়ে ঘুরে আসতে হবে। প্রত্যয় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছে এখানে। সাইনবোর্ড থেকে চোখ ফেরাতে পারেনি। বায়ান্নর একুশের সকালটা কেমন ছিল। যখন গুলি চলছিল অনেক তখন দৃশ্যটা কেমন ছিল। এসব পত্র পত্রিকায় অনেক পড়েছে কিন্তু বাস্তব কি আরো কঠিন ছিল না ? এসব ভাববার এখন সময় নেই।
শহীদ মিনার এলাকায় তাড়াতাড়ি ঢুকতে না পারলে ফুল দেওয়া যাবে না। ঘুরে আবার আরেক পথে মিনার এলাকায় এসে কিছুটা অবাক হয়। তখন ঘড়িতে সাতটা বাজে। এক ঘণ্টা সময় লাগে এখানে পৌঁছাতে। অনেক লম্বা লম্বা লাইন হয়ে গেছে। একটা লাইনের সাথে মিশে যায়। পেছনের লোক খুব একটা খেয়াল করেনি। না হলে লাইনের মাঝে কাউকে ঢুকতে দেয় না সহজে। লাইনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণের ক্লান্তিটুকু কোথায় যেন চলে যায়। লাইন ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ছোট ছোট পথ শিশুরা ফুল বিক্রি করে। এক গুচ্ছ গোলাপ কিনে নেয়। মূল বেদী থেকে লাইন এখনো অনেক দূরে।
শহীদ মিনারে এত সকালে এত লম্বা লাইন হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি। কয়েকদিক থেকে মানুষ লাইন করে ঢুকছে। এখানে এসে একটা লাইন হয়ে যাচ্ছে। লাইনটা ক্রমশঃ লম্বা হয়ে চলেছে । বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লা থেকে কোন না কোন সংগঠনের ব্যানারে বেশির ভাগ লোকজন এসেছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা বেশী । রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণেও আছে। বিভিন্ন সংস্থা ও বড় বড় কোম্পানির সংগঠনের ব্যানারও দেখা যাচ্ছে। শহীদ মিনারের পাশ থেকে মাইকে ধারা বর্ণনা ভেসে আসছে। ব্যানার থেকে নাম দেখে কারা ফুল দিচ্ছে তার ঘোষণা আসছে বার বার। সে যে লাইনটায় ঢুকে পড়ে সেটাতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ব্যানার। লাইনের লোকজন টের পায়নি। সে এদের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এরা দুলাইন করে এগিয়ে নিতে চায়। কিন্তু লাইনের লোকজন খানিক পর পর দুলাইনে থাকতে পারে না। লাইনের কোন কোন জায়গায় তিনজন এমনকি চারজনও হয়ে যায়। এরা চায় তাদের লাইনটা দু’লাইনে লম্বা হয়ে এগিয়ে যাক। কিন্তু পেছনের লাইনের চাপে এরকম ফাঁকা ফাঁকা হয়ে থাকতে পারে না। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলো লাইনে দাঁড়ানো কারো কারো কাছ থেকে একুশ সম্পর্কে জানতে চায়। সময় টিভির ক্যামরাটা এক জায়গায় স্ট্যান্ড বাই করে রেখেছে। সে ওদিকে তাকাতে মাইক্রোফোন হাতে লোকটি একে ডাক দিয়ে নিয়ে যায়। সংবাদ কর্মীটি একুশের চেতনা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বর্তমান প্রজন্ম এ সম্পর্কে কি ভাবছে জানতে চায়। সে মাইক্রোফোনের সামনে বলে, একুশের মূল দাবি ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করা এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা। রাষ্ট্রভাষা করা হলেও দীর্ঘ অনেক বৎসর পরেও সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ তরুণ একুশের চেতনায় উদ্বীপ্ত। এখানে দেখুন হাজারো তরুণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। এটা শুধু এখানকার চিত্র নয়। সারাদেশের শহীদ মিনারে দেখেন তারুণদের সংখ্যা বেশি। আর এখন একুশ শুধু আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পালিত হচ্ছে।
সে আবার লাইনে এসে দাঁড়ায়। তখন একজন বলে আপনি আমাদের লাইনে ঢুকে পড়লেন। প্রত্যয় কিছু বলার আগে আরেকজন বলে, উনি আগে থেকেই আমাদের লাইনে ছিলেন। সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েছেন। সে আবার বলে, আমি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের একজন সদস্য। ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী তরুণদেরকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলছে। এরা আর কথা বাড়ায় না। সামনের দিকে এগিয়ে চলে। উপরে অনেকগুলো ব্যানার দেখা যাচ্ছে। যারা শহীদ মিনারের পাদদেশে পৌঁছে তাদের সংগঠনের নাম ঘোষনা করে ব্যানার নামিয়ে ফেলতে বলে। তারা যেন বেদীতে ফুলের তোড়া দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পরবর্তী সংগঠনকে ফুল দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। মিনারের কাছাকাছি আসতে চোখে পড়ে অনেক টিভি চ্যানেল। তারা মিনারের পূর্বদিকে ক্যামেরা ফিট করেছে। অনেক সরাসরি প্রচার করছে। টিভি কর্মীরা এসময় বেশ ছুটাছুটি করছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা লাইন ঠিক রাখে সবাই যেন সারিবদ্ধ হয়ে ফুল দিতে পারে। তারা মনে হয় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। একই রকম ড্রেস সবার। অনেকটা ইউনিফরমের মত। ধীরে ধীরে একেবারে কাছে চলে যায়। মাইকে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ঘোষণা আসে।
সাথে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও তার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীর কথাও উল্লেখ করে ঘোষক। মূল বেদী থেকে কিছুটা দূরে শহীদ মিনারের পাদদেশে ফুলের তোড়া দিয়ে এরা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবকেরা মূল বেদীর দিকে যেতে দেয় না। প্রত্যয় এদের সাথে বের না হয়ে একপাশে সরে যায়। ক্যামরাগুলো যেদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে খানিকটা দাঁড়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখে বিচার বিভাগের একটি দল ফুল দিতে আসে দক্ষিণ দিক থেকে। এদেরকে মূল বেদীতে উঠতে দিচ্ছে। এদের সাথে মিলে মূল বেদীর কাছে চলে যায়। বিস্ময় আর শ্রদ্ধাভরা নয়নে তাকিয়ে থাকে শহীদ মিনারের দিকে। মিনারের পাদদেশে রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর বড় বড় ফুলের তোড়া। স্পিকার থেকে শুরু করে আরো অনেক রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের ফুলের তোড়ায় ভরে আছে। প্রত্যয় শহীদ মিনারের দিকে দৃষ্টি স্থির করে।
সন্তানের চরম আত্মত্যাগে গর্বিত মা মাথা নত করে সন্তানকে আশীর্বাদ করছে, মিনারের এ মূল ধারণাটি তাকে ক্ষণিকের জন্য ভাবিয়ে তোলে। মিনারের বুকে টকটকে লাল সূর্য যা আগামী দিনের স্বপ্ন, একে যেন ছিনিয়ে আনতে হয়েছে। আশেপাশে গাছগুলো ডালাপালা আর সবুজ পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এসব গাছ থেকে পাখির ডাক কানে আসছে। কোকিলের কুহু কুহু ডাকও ভেতরটা যেন তোলপাড় করে দিচ্ছে। এ জায়গাটিতে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যায় না। সবাই ফুল দিয়ে চলে যায়। স্বেচ্ছাসেবকেরা এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দেয় না। একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বেচ্ছাসেবক একজন তার পাশে এসে দাঁড়ায়। সে বুঝতে পারে কিছু বলার আগে সরে যেতে পা বাড়ায়। ডান দিকে ঘুরে আবার অবাক নয়নে তাকায়। মিনারের সামনের জায়গাটি ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। নিচের বেদীতে যে ফুলের তোড়া দেওয়া হচ্ছে সেগুলো এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে। একটার পর একটা সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। সে কয়েক কদম ফেলে এ দিকটায় এসে দাঁড়ায়। এখানে দাঁড়াতে তেমন কোন একটা বারণ নেই। এখানে অনেক মেয়ে সকাল থেকে ফুল নিয়ে কাজ করছে।এ জায়গাটায় আগে আলপনা আঁকা ছিল। কয়েকদিন থেকে আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা এখানে আলপনা এঁকেছে। শুধু এখানে নয়, পুরো শহীদ মিনার চত্বরে তারা রং তুলির আঁচড়ে নানা আলপনায় ভরে তুলছে। শহীদ মিনারের আশে পাশের দেয়ালেও একুশের চেতনার স্লোগান পোস্টার আর আলপনার ছোঁয়া চোখে পড়ে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে শুরু হয় এ জায়গাটাকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা। বিশেষ করে চিত্র শিল্পীরা এ কাজটি করার জন্য এগিয়ে আসে। আর্ট কলেজের ছেলে মেয়েরা ফেব্রুয়ারীর দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাতদিন পরিশ্রম করে এ জায়গাটিকে আলপনায় নতুন মাত্র সংযোজন করে। কিন্তু এ মেয়েগুলো ফুল দিয়ে কি করছে। প্রত্যয় বিস্ময় ভরা নয়নে তাকিয়ে আছে। শহীদ মিনারের এ বিশাল চত্বর জুড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সকালের কাঁচা
সোনা রোদটা এখন আর নেই। রোদের তীব্রতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
ছেলেরা তোড়া থেকে ফুল নিয়ে মেয়েদের কাছে দিচ্ছে। এরা দু’হাতে ফুল নিয়ে মানচিত্রের রেখা বরাবর রেখে রেখে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করছে। একদিক থেকে নয় একই সাথে রংপুর সিলেট চট্টগ্রাম খুলনা রাজশাহী বিভিন্ন সীমা রেখা বরাবর ফুল দিয়ে যাচ্ছে। এরা এমনভাবে বসে বসে ফুল দিচ্ছে যেন নিজেরা একটা মানচিত্র গড়ে তুলছে। শুধু মানচিত্র নয় ঠিক মাঝখানে ঢাকা যেখানে ফুল দিয়ে আমাদের লাল সবুজের জাতীয় পতাকা গড়ে তুলেছে। সাথে আর কতগুলো মেয়ে মানচিত্রের ভেতর বর্ণমালা সাজিয়ে তুলেছে। রোদকে এদের রোদ মনে হচ্ছে না। একাগ্র মনে এরা ফুলের সম্ভারে ভরিয়ে তুলেছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর রোদের উপর ভাসিয়ে উঠে অ আ ক খ আর পতাকার লাল সূর্যের চারপাশে সবুজের সমারোহ। ছেলে মেয়েগুলোর চোখে মুখে আলোর দিপ্তি। ক্লান্তির কোন ছাপ নেই। তারুণ্য যেন তাদের সব ক্লান্তিকে মুছে দিয়ে যাচ্ছে। রোদের তীব্রতাও এদের উদ্যমকে একটুও থামাতে পারছে না। এরা সবাই এদের কাজে মগ্ন। কোনদিক তাকাবার সময় তাদের নেই। বাইরের কোলাহল পাখির ডাক কিছুই যেন তাদের কানে পৌঁছছে না। নীচে মিনারের পাদদেশে ফুলের তোড়া দিয়ে চলেছে। এখন সংগঠনের চেয়ে সাধারণ লোকজনের সংখ্যা বেশি।
এখনো অনেক লম্বা লাইন। যতটুকু চোখ যায় লোক আর লোক। এসময়টাতে লোকজন বেড়ে যায়। পুরো এলাকাটি যেন লোকারণ্য পরিণত হয়। ছেলে মেয়ে ছোট বড় সব বয়সী মানুষের ঢল নামে এসময়। ছোট ছোট শিশুরা নিজ হাতে ফুল দিতে চায়। বাবা মা তাদের সাথে নিয়ে এসে ফুল দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ভীড়ের মধ্যে এসব শিশুরা ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। দুপুর পর্যন্ত এভাবে সারিবদ্ধ ভাবে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে। অনেক বিদেশীরাও আসে। প্রথম পহরে বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনৈতিকেরা মূল বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। সে মানচিত্রের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে। এরি মধ্যে বেশ কয়েকটি চ্যানেলের ক্যামেরা মানচিত্রের ছবি তুলছে। জানতে চেয়ে এর মাধ্যমে তারা কি বুঝাতে চায়। এদের মধ্যে একজন বলেছে, ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে নিয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে আমরা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছি। লাল সবুজের পতাকার স্বপ্ন এঁকেছি এবং একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্র পেয়েছি। প্রত্যয় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
এতক্ষণ একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে স্বেচ্ছাসেবকরা আবার সরে যেতে বলতে পারে। এদিকে সাধারণ লোকজন বেশি আসে না। মিনারের নীচের বেদীতে ফুল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বের হওয়ার পথটিতে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় না। এ জায়গাটা সবসময় ক্লিয়ার রেখেছে। তবে মন্ত্রী কেউ এলে সাংবাদিক কর্মীরা গিয়ে ধরে। এটা সেটা প্রশ্ন করে। কোনটার উত্তর দেয় আবার কোনটা এড়িয়ে যায়। যাওয়ার পথটায় তখন একটু জটলা পেকে যায়। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর তার লোকজন চলে যায়। পথটা আবার ক্লিয়ার হয়ে যায়। সংবাদ কর্মীরা কোন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা বিশিষ্ট জনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। সূর্য আরো উপরের দিকে উঠে যায়। রোদের তীব্রতা আরো বেড়ে যায়। অবশ্য সাথে বাতাসও আছে। আশে পাশের গাছের পাতারা বাতাসে থির থির করে কাঁপছে। সে মানচিত্রের চারপাশে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। মানচিত্রের নীচের দিকে ফুল ছিটিয়ে বঙ্গোপসাগর দেখানোর চেষ্টা চলছে। এ মানচিত্রটি অনেককে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। এ জায়গাটিতে যদিও লোকজনের আসাটা সীমিত তবুও মানচিত্রটা দেখার জন্য সবাই একবার আসতে চেষ্টা করছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা বাধা দিয়ে আর আটকে রাখতে পারছে না। আশে পাশের গাছের ছায়ায় কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। এরাও এখানে এসে ভীড় করছে মানচিত্রের কাছে। ঠিক মাঝখানে জাতীয় পতাকা আর চারদিকে বর্ণমালা যেন আলাদা আলাদাভাবে আবার একই সূত্রে গাঁথা। সবাই নির্বাক নয়নে তাকায় চিরচেনা মানচিত্রের দিকে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মানচিত্রটি আগে কখনো দেখেনি। এর সীমারেখা অনেকের কাছে মুখস্ত, আবার অনেকের হৃদয়পটে এমনভাবে আঁকা আছে যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়। এতে নতুন করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু এসময়ে একুশের সকালটা যখন দুপুরের দিকে এগিয়ে চলেছে ঠিক এসময়ে এ অপূর্ব সুন্দর ফুলে ফুলে সজ্জিত মানচিত্র থেকে এরা সহজে দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না। কি যেন লুকিয়ে আছে এর মাঝে যা খুঁজে খুঁজে বের করতে মন চাইছে। আর্ট কলেজের ছেলে মেয়েরা এখনো শেষ করেনি, তাদের যেন আরো কারুকাজ বাকী আছে তারা তাদের মনের রং মিশিয়ে ফুলের ছোঁয়ায় মানচিত্রটিকে মূর্ত করে তুলছে।
কিছু কিছু ফুল নিয়ে মানচিত্রের বাইরে প্রিয় বর্ণমালার প্রতীক গড়ে তুলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এরকম বেশ কয়েকটি বর্ণমালা সীমারেখার বাইরে সাজিয়ে তোলে। এর কারণ খুঁজে পায়না সে। মানচিত্রের বাইরে কেন তারা বর্ণমালা নিয়ে আসলো। নিশ্চয় কোন কারণ আছে। এখন ওদের কাছে জানতে চাইলে কি মনে করে বসে। তারা কি জানে এর মানে কি ? নাকি তাদের দিয়ে যারা তৈরী করাচ্ছে তারাই শুধু জানে। এসব ভাবতে ভাবতে মানচিত্রের এপাশ ওপাশ শান্ত পায়ে হাঁটতে থাকে। ততক্ষণে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরাগুলো মানচিত্রের নানা দিকের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ এক একটি বর্ণমালার ছবি তুলছে আবার কেউবা পতাকার লাল সূর্য আর সবুজের ছবি । একই সাথে এ সম্পর্কে কিছু তথ্যও সংবাদ কর্মীর কন্ঠে প্রচারিত হচ্ছে।
একজন সংবাদ কর্মী প্রশ্ন তোলে, মানচিত্রের বাইরে বর্ণমালা সাজানোর কারণ কি? আর্ট কলেজের একজন প্রবীণ চিত্রশিল্পী শিক্ষক এর উত্তর বলেন, একুশ এখন শুধু আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ দিন পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসাবে আমরা পালন করেছি। কিন্তু তা বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হচ্ছে। দেশের মানচিত্রের সীমারেখার বাইরে এ বর্ণমালা স্থান করে নিয়েছে। তাই কিছু বর্ণমালা মানচিত্রের বাইরে সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রত্যয়ের মনটা ভরে যায় শিল্পীর কথা শুনে। এরকম একটা কিছু সেও ভেবেছে। তখন অনেকটা দুপুর। আশেপাশের গাছ গাছালি থেকে পাখির ডাক কানে আসে। কোকিলের কুহু ডাকে মনটা যেন উদাস হয়ে ওঠে। সে শহীদ মিনারের দিকে তাকায়।তার দুচোখ বিস্ময়ে ভরে যায়। সে নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ পাখিদের ডাক থেমে যায়। সমবেত তরুণ তরুণী নারীপুরুষ সংবাদকর্মী যারা এতক্ষণ প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল তারা যেন নির্বাক হয়ে যায়। শিশুরাও কোলাহল থামিয়ে বাবা-মার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কারো মুখে কোন কথা নেই। যে যেখানে আছে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। এমনকি পাখিরাও যাদের কলতানে চারিদিক মুখরিত ছিল তারাও কেমন যেন চোখের দৃষ্টি নামিয়ে গাছের ডালে পাতার আড়ালে চুপচাপ বসে থাকে। ফুল পাতারাও বাতাসের সব ছোঁয়া উপেক্ষা করে থির হয়ে আছে। সবকিছু যেন নিঃশব্দতার ভেতর বিভোর হয়ে আছে। এসময় দূরের ভাস্কর্যগুলো তাদের উজ্জ্বল দৃষ্টি শহীদ মিনারের দিকে মেলে ধরে। তখন সবাই অবাক নয়নে তাকায় মিনার পাদদেশে। সেখানে সালাম জব্বার রফিকের চির তারুণ্যেমাখা উদ্বিপ্ত মুখ ভেসে উঠেছে মিনারের লাল সূর্যের মাঝে।

x