‘অন্তর মম বিকশিত করো’

ড. আনোয়ারা আলম

শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ
32


“সত্যের যথার্থ উপলব্ধি মাত্রই আনন্দ, তাহাই চরম সৌন্দর্য”-রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সত্য; সুন্দর ও আনন্দের স্বরূপ অভিন্ন। তিনি সুন্দরের সংগে সত্য মঙ্গল ও আনন্দের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
“কেন সুন্দর? কারণ মঙ্গল মাত্রেই সমস্ত জগতের সংগে একটা গভীর সামঞ্জস্য আছে, সকল মানুষের সংগে তাহার নিগুঢ় মিল আছে। সত্যের সংগে মঙ্গলের সেই পূর্ণ সামঞ্জস্য দেখিতে পাইলেই তাহার সৌন্দর্য আর আমাদের অগোচর থাকে না।”
সত্য এবং সুন্দরের সাধনা ছিল রবীন্দ্র সাহিত্যের মৌল বিষয়, পাঠকের মন যুগিয়ে লেখার চেষ্টা বা সাহিত্যকে হাটে বিকিয়ে দিয়ে খ্যাতি অর্জনের চেষ্টা তিনি করেননি- বরং সাহিত্য ও সৌন্দর্য তত্ত্বের ওপর তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন, ভাষণ দিয়েছেন, কবিতাতেও তাঁর এ বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন নানাভাবে। সৌন্দর্য পিপাসু কবি কি বিপুল তৃষ্ণায় বলেছেন-“নীলিমারে লইতে চাহি আকাশ ছাকিয়া।”
মানব সভ্যতার ক্রম বিকাশের ঊষাকাল থেকেই মানুষ গুহায়, গাছের ছালে, মাটিতে, পাথরে তার শিল্পরূপ চিন্তাকে মূর্ত করেছে। ভাষা সৃষ্টির আগে মানুষ ছবি এঁকে ভাব প্রকাশ করতে চেয়েছে-শিল্পের মধ্য দিয়ে মানুষ সুন্দরের সাধনা করেছে, সুন্দরকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে। পাশ্চাত্যে প্লেটো থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত বহু দার্শনিক ‘Beauty’ -নিয়ে আলোচনা করেছেন।
“সত্যের মতো সৌন্দর্য একটা আইডিয়া মাত্র। সৌন্দর্যের কোন অস্তিত্ব বস্তুজগতে নেই, সৌন্দর্য মাত্রই স্বর্গীয়।”-প্লেটো।
অ্যারিস্টটল কিন্তু সুন্দরকে দেখেছেন সঠিক পারস্পর্যে সামঞ্জস্যে ও স্পষ্টতায়।-
“The Chief forms of beauty are order and symetry and definiteness, which the mathematical science demonstrate in special degree.”
গ্রীক দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিন “ভগবদ্‌ সৌন্দর্যে সুন্দরকে অনুসন্ধান করেছিলেন। জার্মান দার্শনিক বোমগার্ডেন সৌন্দর্যকে পূর্ণত্ব ও সত্য ও মঙ্গলের মাঝে খুঁজেছেন।
নন্দনতত্ত্বের জগতে কান্ট একটি স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তক- তিনি সৌন্দর্যকে মঙ্গলের প্রতীক মান্য করেছিলেন, দার্শনিক শিলার বলেছেন ‘আকৃতির স্বাধীনতাই সৌন্দর্য। আর কবি কীটস!
“Beauty os truth, truth is beauty, that’s all.”
বৈজ্ঞানিক চার্লস ডারউইন মানুষ ও প্রাণীজগতের অন্যান্যদের সংগী নির্বাচনের প্রয়োজনে সৌন্দর্যকে অনুসন্ধান করেছিলেন, আর সৌন্দর্য বিষয়ে ইংল্যান্ডের রোমান্টিক কবিদের মধ্যে অন্যতম কোলরিজ।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম নান্দনিক, যিনি শিল্পকলাকে আদর্শের বৃত্ত হতে মুক্ত করে বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বে উত্তরণ ঘটান। সাহিত্য সৃষ্টি খন্ড নয়, অখন্ড সৃষ্টি। তথ্যের জগত থেকে রসের নিত্যলোকে কবি সেই সৃষ্টিকে প্রতিষ্ঠা করেন। মানুষের মন যে জ্ঞান রাজ্যে বিচরণ করে তার একদিকে আছে তথ্য, অন্যদিকে সত্য। সৃষ্টির সব রূপের সার্থকতা আনন্দে। শিল্প সাহিত্যে যখন সুন্দরের বিকাশ অখন্ড ও সামগ্রিকভাবে প্রকাশিত হয় তখন সৌন্দর্য সত্য, মঙ্গলময় ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। শিল্পে সৌন্দর্য হচ্ছে আনন্দ সৃষ্টির উপায়। একই সাথে শিল্প সৃষ্টিতে ধীর, সংযম ও মানসিক প্রশান্তি চাই। উত্তপ্ত মনের উপ্ত চিন্তায় সৌন্দর্যহানি হয় বরং মনের আবেগের গতির স্থিরতা ভাবকে ধীর স্থির ও প্রশান্ত করে তোলে।
“সৌন্দর্য আমাদের মন ও হৃদয়কে সত্যের দিকে, কল্যাণের দিকে, মঙ্গল ও সুন্দরের দিকে টানে। অন্যায় ও মিথ্যা হতে অসুন্দর হতে মন ও হৃদয়কে ফিরিয়ে দেয়। এভাবেই সৌন্দর্য আমাদের মনের জগৎ ও জ্ঞানের জগৎকে আনন্দময় করে তোলে, আমাদের চিত্তলোকে একটা নির্মাল্য প্রশান্তির সৃষ্টি করে।”
‘সত্য ও সুন্দরের’-পথে থাকাই হচ্ছে ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকে কখনো সাম্প্রদায়িক সীমা বা স্বজাতির মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। বস্তুতপক্ষে ধর্ম ও সাহিত্যের অন্যতম কাজ হচ্ছে মানবতাকে জাগ্রত রাখা। রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্বের মূলে রয়েছে ‘মিলন তত্ত্ব’। বিষয়ীয় মিলনেই সৃষ্টি হয় নান্দনিক চেতনার। সাহিত্যকে তিনি একদিকে জ্ঞানের বিষয় ও ভাবের বিষয়-অপরদিকে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় দু’ভাগে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কথায়-“যা জ্ঞানের বিষয় তা প্রকৃত পক্ষে সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে না। ভাবের বিষয়ই একমাত্র সাহিত্য। অপর ক্ষেত্রে যা সাময়িক প্রয়োজন মিটিয়ে শেষ হয়ে যায় তা হলো প্রয়োজনীয় সাহিত্য।”
রবীন্দ্রনাথের মতে সাহিত্যের সত্য সুন্দরের সত্য-আনন্দের ধারা-এ সত্য একবার মানুষের মনে প্রবেশ করলে সে প্রাত্যহিক গ্লানিও আবর্জনা হতে মুক্তি পায়-তার মন উত্তরোত্তর মহত্তর জীবনের সন্ধানে ফাউষ্টের মতে অনন্ত তৃষ্ণা নিয়ে ছুটে। এ সত্যের কোন সীমা নেই।”
বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির, মনন ও রুচির, স্বপ্ন ও আবেগের, উৎসব ও অনুভবের, সংশয় ও জিজ্ঞাসার প্রধানতম নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ-সাহিত্যে যে প্রেম ও আনন্দ সত্তাকে ধারণ করেছেন-তার ভেতর দিয়ে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ প্রতিফলিত। সত্য, সৌন্দর্য ও নন্দনতত্ত্বের বিকশিত অনুভবে মানুষ, প্রকৃতি বা জীবনবোধের স্বরূপ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন-জীবনই আসলে সাহিত্য। তিনি যখন বলেন-‘অন্তর মম বিকশিত করে/ অন্তরতম হে-নির্মল করো, সুন্দর করো হে-তখনি প্রশ্ন জাগে- এ আহ্বান তো কোন ধর্মের বা গোষ্ঠীর নয় বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতি। কখনো তিনি সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে আধিপত্য কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা চাননি চেয়েছেন মানুষের মুক্তি ও চিত্তোতৎকর্ষ। “জীবনের আনন্দধারা থেকে সত্য ও সৌন্দর্যের অন্বেষণ সহজ নয়। আমাদের ভেতরের এক আশ্চর্যময় শক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-তাঁর শাশ্বত চৈতন্যকে চিন্তা ও বোধে ধারণ ও লালন করে বাঙালি এগিয়ে গেছে স্বাধীনতা ও মুক্তির পথে। আমাদের এই সংকটময় সময়ে যখন সব মতাদর্শে এক ধরনের ব্যবধান-দেশে দেশে মানুষে বাড়ছে এ সহিংস আচরণ-ধর্মের জ্বলছে পুরো বিশ্ব-এই কাল সময়ে রবীন্দ্রনাথের মানবিক চেতনা ও আদর্শ যেন ধারণ করতে পারি। অহিংসা, মানুষের অখণ্ডতা, বিজ্ঞানের জীবন বান্ধব প্রয়োগ, প্রগতির মতে সামাজিক জাগরণ, সত্যের প্রতি আনুগত্য-এসব ধারণা থেকে রবীন্দ্রনাথ কখনো সরে আসেননি। শেষ ভাষণেও তিনি নবজীবনের মানবতার জয়গান গেয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনা প্রবন্ধে তিনি বলেন-“মৃত্যুর মধ্যে যে শোক, সেই শোকের শত যন্ত্রণা ছাপিয়েও এই যে ঐকান্তিক প্রেম, এই প্রেমের শক্তিই আমাদের সংলগ্ন করে রাখে জীবনের প্রবহমনতার সংগে।”
সহায়ক গ্রন্থ- সাহিত্য: সাহিত্যের পথে রচনাবলী।
বাংলা সাহিত্যে প্রগতি: সাহিত্যের ভবিষ্যৎ: বিষ্ণু দে।
সাম্প্রতিক দৃষ্টিতে রবীন্দ্রাবলী-সম্পাদক শামসুজ্জামান খান।

x