অনোমা’র সাংস্কৃতিক আড্ডা

এ জে বিপ্লব

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ
9

তখনো দুটো বাজেনি আড্ডা শুরু হবে সাড়ে চারটা কি পাঁচটায়। এরি মধ্যে সংগঠনের ষাটোর্দ্ধ বয়সী তুষার বড়ুয়া হরেক রকম থালা-বাসন নিয়ে ব্যস্ত। এর খানিক পরে দেখলাম ঐ ভদ্র লোকটি মোয়া, মুড়ি, চানাচুর আর লাল চা তৈরি করার জন্যেই এত তাড়াহুড়ো করছেন। খানিক পরে যোগ দেয় আরো দু’জন। একজন উত্তম বাবু আরেক জন রফিক। তারা সবাই সমবয়সী। যেহেতু অনুষ্ঠানের নামই আড্ডা ততক্ষনে উনাদের ব্যস্ত হওয়ার কারণ বুঝতে আর বাকী রইলো না। বসার স্থান সেকেলে আড্ডার আদলে। আড্ডার মাঝ সময়ে খাবারের থালা হাতে হাতে ঘুরছে আর মুঠি ভরে একহাতে মুড়ির অনুসঙ্গ অন্যহাতে নারকেল চিবিয়ে চিবিয়ে জম্পেস খোস-গল্পে মেতে ওঠার সেই চিরাচরিত দৃশ্য আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। যান্ত্রিক জীবনে মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা বর্তম নে উধাও হওয়ার পথে সেদিক থেকে অনোমার প্রাণময় সাংস্কৃতিক আড্ডার অয়োজনটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। বলা যায় সৃজনশীল মনস্ক মানুষদের মনে সঞ্চারিত করেছে।
১৯ অক্টোবর। সেদিন ছিল শুক্রবার । একেতো সাপ্তাহিক বন্ধের দিন তার ওপর ঐদিন ছিল শারদীয় দূর্গোৎসবের মহাদশমী। আড্ডারুদের উপস্থিতি নিয়েও উদ্যোক্তাদের খানিক শংকিত হতে দেখা গেলেও পরবর্তীতে বুড্ডিস্ট ফাউন্ডেশনের মিলনায়তনটি যখন পূর্ণ হতে লাগলো তখন উদ্যোক্তা তুষার, আশীষ, উত্তম, বিপ্লব, রঞ্জন, প্রবালদের চোখে-মুখে যেন আনন্দের সুবাতাস ফিরে আসে।
প্রাণময় সাংস্কৃতিক আড্ডায় নব্বই বছর বয়সী ব্যক্তির উপস্থিতি যেমন ছিল, মাঝ বয়সী ও তরুণদের উপস্থিতিও ছিল অনেক। সাহিত্যকর্মী, নাট্যকর্মী. লেখক, গবেষক, চিকিৎসক, সংগীত শিল্পী, আবৃত্তি শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক সহ সব শ্রেণি পেশার মানুষের মিলনে আনন্দ মুখর জমজমাট আড্ডা,গল্প, আবৃত্তি আর সুরেলা গানের মাধুরীতে ডুবিয়ে থাকার মুহুর্ত শেষ হয়েও যেন হলো না শেষ।
বাঁশীর সুরের লয়ে জাতীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আড্ডা। অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মহাসচিব আশীষ কুমার বড়ুয়া ও সাংস্কৃতিক আড্ডার সদস্য সচিব সংবাদ ও সংস্কৃতিকর্মি বিপ্লব বড়ুয়া’র সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য দেন আড্ডা’র আহবায়ক রঞ্জন বড়ুয়া। আড্ডার প্রাক্কালে ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক সলীল বিহারী বড়ুয়া’র প্রয়াণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
প্রথমেই আড্ডার নানা প্রসঙ্গ টেনে হাস্য রস তৈরি করেন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক সঞ্জীব বড়ুয়া। এরপর একে একে আড্ডায় জীবনের নানা সময় ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনারাবৃত্তি, সমকালীন ভাবনা যে যার মতো করে মুক্তমনে প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন রোগ কষ্টে ভুগে ভাঙ্গা হাত নিয়ে আড্ডায় যোগদিয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যমে মাতোয়ারা করে দেন রম্য সাহিত্যিক সত্যব্রত বড়ুয়া। এছাড়া বিষয় ও প্রাসঙ্গিক কথামালা দিয়ে আড্ডাকে আকর্ষনীয় ও মনোগ্রাহী করে তুলে সাহিত্যিক-গবেষক অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া, প্রাবন্ধিক-সাহিত্যিক অধ্যাপক শিশির বড়ুয়া, চিকিৎসক-গবেষক প্রফেসর ডাঃ প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, সাহিত্যিক-গবেষক দীলিপ বড়ুয়া। শিশুসাহিত্যিক বিপুল বড়ুয়া, দীপক বড়য়া, উৎপলকান্তি বড়ুয়া, লিটন কুমার চৌধুরী, সুপলাল বড়ুয়া, রুমি চৌধুরী। চারুলতা সম্পাদক চারুউত্তম কুমার বড়ুয়া।’ চার্টার্ড একাউনটেন্ট সিদ্ধার্থ বড়ুয়া এফসিএ। সংগঠক প্রকৌ. মৃগাংক প্রসাদ বড়ুয়া, তুষার কান্তি বড়ুয়া, সুজন কুমার বড়ুয়া, অধ্যাপক তুষার কান্তি বড়ুয়া, স্বপন কুমার বড়ুয়া, সুভাষ চন্দ্র রাজবংশী, লোকপ্রিয় বড়ুয়া, শীলানন্দ বড়ুয়া, অপু বড়ুয়া, সিমান্ত বড়ুয়া, সজীব বড়ুয়া ডায়মন্ড, বিকাশ বড়ুয়া, রণেশ চৌধুরী নন্তু। সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তা নান্টু কুমার বড়ুয়া। ব্যাংকার স্বপন কুমার বড়ুয়া। লালন গবেষক দীলিপ কুমার বড়ুয়া। সাংবাদিক নিবারন বড়ুয়া। সংগীত শিল্পী তাপস বড়ুয়া, শ্যামলী বড়ুয়া, লুপর্ণা মুৎসুদ্দী, সুদীপ বড়ুয়া, মৈত্রী বড়ুয়া, দীপংকর বড়ুয়া, ধ্রুব বড়ুয়া। অধ্যাপিকা হ্যাপী বড়ুয়া। আবৃত্তিকার প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া, অধ্যাপিকা শিউলি বড়ুয়া, প্রবাল বড়ুয়া। দীপংকর বড়ুয়া ভুটান, শিক্ষক দুলাল কান্তি বড়ুয়া, সুনন্দা বড়ুয়া চৌধুরী, এডভোকেট জিকো বড়ুয়া, ব্যাংকার সত্যজিৎ বড়ুয়া, অধ্যাপিকা মিশু বড়ুয়া, মিসেস লুনা বড়ুয়া, সংস্কৃতিকর্মি অমিত বড়ুয়া, সাহিত্যকর্মি প্রীতিময় বড়ুয়া লাভলু, দীপ্র বড়ুয়া, দোলন বড়ুয়া প্রমুখ।
বর্তমান সময়ের শুদ্ধ সংগীত চর্চার যেখানে আকাল চলছে সে সময়ে আড্ডায় যোগ দিয়ে তরুণ প্রতিভা মৈএী চৌধুরী’র গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত “আমার নয়ন ভুলানো এলে” গানটি তার কন্ঠে সত্যিই পরিপুর্ণ লেগেছিল। আরেকজন উঠতি তরুণ যুবক ধ্রুব বড়ুয়ার পরিবেশনা সদ্য প্রয়াত রক তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান “সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে” অসাধারন গায়কী ঢঙে গেঁয়ে ভিন্ন আবেশ তৈরি করতে সমর্থ হন। বেতার-টিভির প্রিয়মুখ তাপস কুমার বড়ুয়া’র দুটি গান আধুনিক “গান আমার প্রাণ” ও লালনগীতি “খাঁচার ভিতর অছিন পাখি কেমনে আসে যায়” শিল্পীর অসাধারণ পরিবেশনায় মনে হলো শুকিয়ে যাওয়া মরু ভূমিতে যেন এক পশলা বৃষ্টির ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেছে। লালন গবেষক ও শিল্পী দীলিপ বড়ুয়া যেমন একজন তাত্ত্বিক, তেমনি লালনের একনিষ্ঠ অনুরাগী তা তার আবেগ ও পরিবেশনায় যথার্থ প্রমাণ মিলেছে। শিল্পী লুপর্ণা মুৎসুদ্দীও আরেক লালন ভক্ত। “আমি অপার হয়ে বসে আছি” গানটির বিমুগ্ধ পরিবেশনা একজন জাতশিল্পীর পরিচয় দিতে ভুল করেননি শিল্পী লুপর্ণা। চট্টগ্রামের সংগীতের প্রিয়মুখ শ্যামলী বড়ুয়া এমনিতে রবীন্দ্র অনুরাগী। “সে দিন দু’জনে দুলেছিনু বনে” গানটির পরিবেশনা ছিল অনন্য। এছাড়া মনোমুগ্ধকর কবিতা আবৃত্তি করেন ব্যাংকার প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া, অধ্যাপক শিউলি বড়ুয়া সহ আরো অনেকে।
তবে সবচেয়ে মজার বিষয় আড্ডায় প্রধান বা মধ্যমনি বলতে কেউ ছিলনা। বক্তা-শ্রোতা সবাই ছিল সমানে-সমান এটিই প্রতীয়মান হয়েছে যে, বাঙালী মাত্রই আড্ডাবাজ। যুগে যুগে কালে কালে এর আবেদন কখনো ফুরাবার নয় তা সকলে এক বাক্যে স্বীকার করেন। আড্ডা থেকেই শুরু সাহিত্য, গান, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুই। আড্ডা হয়ে উঠুক নতুন কিছু সৃষ্টির উৎস। উপস্থিতিদের অভিমত প্রথম আড্ডাতেই বাজিমাত করলো অনোমা। “নতুন ও পরিবর্তিত জীবনের জন্য সংস্কৃতিচর্চা অপরিহার্য” স্লোগানকে ধারণ করে ১৯৭৯ সালে সাহিত্য পত্রিকা অনোমা’কে ঘিরে অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সাহিত্য ও শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে অনোমা যে অনন্য তা আবারো প্রমাণিত হলো বোদ্ধা সমাজে।

x