অনেক দেরিতে…

মোঃ বাদশা মিয়া

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
19

এবারে একুশে পদক তালিকায় ড. মাহবুবুল হক এর নাম দেখে আমার স্মৃতিতে অমস্নান নিচের ঘটনাটি মনে পড়ছে। “লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ, এসো দেশ গড়ি”- এ মূলমন্ত্রে দীড়্গিত এবং উজ্জীবিত হয়ে তাঁর মাস্টার্স ফাইনাল পরীড়্গা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা-গবেষণা কাজে যোগ দেয়ার আহবান উপেড়্গা করে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে নিয়োজিত ছিলেন আমাদের প্রিয় মাহবুব ভাই। ব্যাপারটি পছন্দ হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্বনামধন্য অধ্যাপক আবুল ফজলের। নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এদেশের বাম রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব কমরেড মনিসিংহকে জানিয়েছেন “ মনিদা, রাজনীতি করার জন্য এদেশে অনেকে আছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার জন্য বেশি নেই। আমি বলেছি, মাহবুব সম্ভবত: আমাকে শুনছে না। আপনি বললে হয়ত শুনবে”। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজলের সোনা চিনতে ভুল হয়নি। তিনি ছিলেন পাকা জহুরী। কমরেড মনিসিংহ/মাহবুব ভাইরা বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি হচ্ছে জন -সেবার সবচেয়ে ভাল উপায়। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু তখন তাঁর বাকশাল কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। মনি-দা বা মাহবুব ভাইদের চোখে তখন রঙিন স্বপ্ন। বাংলাদেশ ড়্গুধা, দারিদ্রমুক্ত হবে, দেশে সমাজতন্ত্র হবে। এই জরুরি কাজ বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার সময় কিংবা সদিচ্ছার কোনটাই তাদের ছিল না। মাহবুব ভাই এক পর্যায়ে চলে গেলেন রাশিয়ায়। যখন ফিরলেন তখন অন্য এক বাংলাদেশ।
সপরিবারে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু নিহত। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় কারাগারে। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। মোঃ ফরহাদ বন্দী। ক্ষমতা কেন্দ্রে সেনা শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান। রাঙ্গুনীয়ার মত অজপাড়া গাঁয়ে আমাদের বাড়ীতে চলে যৌথ অভিযান বড়দা মোঃ ইউসুফকে (সাবেক সাংসদ, মুক্তিযোদ্ধা) ধরতে। গ্রেফতার হয়েছেন আমাদের প্রতিবেশী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী), অমর বড়ুয়া (প্রয়াত) সহ অনেকে। এমতাবস্থায় একদিন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে রাঙ্গুনীয়া কলেজ সংলগ্ন আমাদের পুকুর পাড়ে আমার সামনে মাহবুব ভাই। বিস্ময়ের ঘোর কাটার পর স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময় শেষে আমি আবিষ্কার করলাম মাহবুব ভাই এখন আমাদের রাঙ্গুনীয়া কলেজের শিক্ষক। তার আগেই রাঙ্গুনীয়া কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বসত্ম সহযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রউফ। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্য পদ চলে যায় দলান্ধ লোকজনের কাছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা পেতে অনেক সময় ও মূল্য দিতে হয় অধ্যাপক আবুল ফজলের প্রিয় এবং সর্ব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র মাহবুবুল হককে, সিলেকশন কমিটি তিন-তিনবার নিয়ম মাফিক সর্বাগ্রে তার নাম প্রস্তাব করার পরও সেই ট্রেডিশন সমানেই চলছে। সম্প্রতি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি লক্ষয করা যায় অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায়।
মাহবুব ভাই আজীবন আপসহীন নীতিনিষ্ঠ একজন দেশ-প্রেমিক মানুষ। গভীরাশ্রয়ী মনন ও চিনত্মার অধিকারী এই মানুষটির একটি নিজস্ব ভাব জগৎ আছে। জাতিসত্তা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তিনি শেকড় সন্ধানী, আধুনিক এবং সংস্কারবাদী। ইতিহাস বিমুখ নন। প্রখর স্ম্বরণশক্তির অধিকারী মাহবুব ভাইয়ের পড়ালেখার সীমানা-ড়্গেত্র ছিল বহু বিসত্মৃত, বহুমাত্রিক। বাংলা, ইংরেজি এবং রুশ সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে তার পাঠ-বিচরণ ছিল বিস্ময়কর। তিনি মিতবাক, সময়নিষ্ঠ এবং প্রচার বিমুখ। আপন ঢোল বাজানোর শোরগোলে মুখ লুকিয়ে চলেন। সুতীক্ষন অনত্মদৃষ্টি সম্পন্ন মাহবুবুল হকের আছে দূর থেকে জানতে/চিনতে পারার অপূর্ব শক্তি। বর্তমানে দাঁড়িয়ে দেখতে পারেন সুদূর ভবিষ্যৎ। চট্টগ্রামের বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের বাঁক বদলের রূপকার হয়েও তিনি ছিলেন অনত্মরালবর্তী মানুষ। এই বিশিষ্টতাই তাঁর মহত্বের প্রমাণ। এখানেই মাহবুব ভাই ব্যতিক্রম।
এই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম মানুষটির ত্যাগ ও অবদানের কি প্রতিদান আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র দিয়েছে? তিনি কি তার প্রকৃত মর্যাদা পেয়েছেন? ড. মাহবুবুল হকের জীবন কি ব্যর্থ হয়েছে? কী অর্জন করলেন ৭০ বছরের জীবনে? সত্য বটে, মাহবুব ভাই জীবনকে বে-হিসাবির মত অপচয় করেছেন। কিন্তুু আসল পুঁিজ হারাননি কখনো। তার জীবন হয়ত সফল নয়। কিন্তুু সার্থক। কারণ জীবনকে তিনি উৎসর্গ করেন, মাটি ও মানুষের জন্য, যেমন ৭১ এর রণাঙ্গনে তেমনি যুদ্ধোত্তর সক্রিয় রাজনীতিতে কিংবা সৃজনশীল লেখালেখিতে। তিনি হচ্ছেন জাত চিনত্মাবিদ, লেখক, অনুবাদক , গবেষক আপাদমসত্মক শিক্ষক এবং সুদক্ষ প্রশাসক। জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে তার কাজ এবং রচিত গ্রন্থগুলী এরইমধ্যে তাকে এ বিষয়ে একজন অথরিটির সম্মান দিয়েছে দেশ-বিদেশে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পদ-পদকের দাবিদার- পাওনাদার হয়েছিলেন অনেক আগে। বেটার লেট দ্যান নেভার। ধন্যবাদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

x