অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন তাজিন আহমেদ

দিদার আশরাফী

বৃহস্পতিবার , ৩১ মে, ২০১৮ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
35

তাজিন নেই। হ্যাঁ, তাজিন আহমেদ মারা গেছেন ২৩ মে। তার মৃত্যুটা একেবারে নীরবে হয়েছে। উত্তরা ৭নং সেক্টরে একটি নীরব রুমে তার নীরব মৃত্যু হয়েছে।

তাজিন আহমেদের মৃত্যুকে নিয়ে সরব হয়ে ওঠে অনেক কৌতূহল। হাসপাতালে কিংবা তার মরদেহটা এক নজর দেখতে ছুটে গেছেন নাটক পাড়ার তাঁর সহকর্মীরা।

প্রিয় পাঠক, তাজিন আহমেদ চলে যাওয়ার সময়টা ছিল একেবারে করুণ। জীবনের শেষ বেলায় অনাহারে কেটেছে তার অনেক রজনী।

বন্ধুদের কাছে হাত পেতেছে অনেক দিবস রজনী। মানসিক যন্ত্রণায় তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়েছে। তাজিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিক বিভাগ থেকে পাস করে ৯০ দশকে। শুরুতে তিনি প্রথমে যোগদান করেন দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায়। তারপর প্রথম আলোতে কাজ করে হয়েছেন প্রিন্ট মিডিয়ার তারকা সাংবাদিক।

বিনোদন ফিচার সাংবাদিক হিসেবে তার অবস্থান ছিল খুব সুদৃঢ়। সাংবাদিকতায় হাঁটতে হাঁটতে তার অভিষেক হয় নাটক পাড়াতে। বেইলি রোডের নাটক পাড়ায় তার যাতায়াত। এর মাধ্যমে হয়ে ওঠেন মঞ্চকর্মী। দীর্ঘ সময় কাজ করেন ‘আরণ্যক নাট্যদলে’। নাট্যকার ও অভিনেতা মামুনুর রশিদের খুব প্রিয় ছিলেন তাজিন আহমেদ।

মঞ্চ নাটক থেকে একেবারে অভিনয় শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন টিভি মিডিয়াতে। শতাধিক নাটকে অভিনয় করে তাজিন আহমেদ নাম লিখা ‘জনপ্রিয়’ খেতাবে। টিভি মিডিয়াতে উপস্থাপনাও করেছেন দীর্ঘ সময়। কয়েকটি নাটক পরিচালনাও করেছেন তাজিন আহমেদ। ভালোবেসে বিয়ে করেন আরণ্যক নাট্যদলের অভিনেতা ও নির্মাতা এজাজ মুন্নাকে। অভিনেতা এজাজ মুন্নার সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবনটা খুব ভালই কাটছিল। এ সময়ে ঝড়ের গতিতে এজাজ মুন্নার হৃদয়ে ঠাঁই পেলেন লাক্স চ্যানেল আই সুপার স্টার ও অভিনয় শিল্পী ‘মম’। তারপর এজাজ মুন্না তালাক দেন তাজিন আহমেদকে।

নাটকের পাশাপাশি তাজিন চাকরি করলেন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে। এ কর্মজীবনে তার সময় অতিবাহিত হলো মাত্র দুই বছর।

এ সময় তাজিনের মা জলি জামান নাটক পরিচালনায় এলেন। কয়েকটি নাটক নির্মাণ করলেন। জলি জামানের প্রথম পরিচালনার নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তাজিন আহমেদ। জনৈক প্রযোজকের চেক ডিজঅনার মামলায় জলি জামান এখন কাশিমপুর কারাগারে।

হঠাৎ নির্মাতারা তাজিন আহমেদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। একদিকে মা জলি জামান কারাগারে. . . অন্যদিকে তার জীবন সঙ্গীর শূন্যতা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে তাজিন আহমেদের সঙ্গে দেখা উত্তরা নর্থ টাওয়ার মার্কেটে। একটি কফি হাউসে কপি কাপে চুমুক দিতেই প্রশ্ন করেছিলামকেমন আছেন?…

তাজিনের উত্তর ছিল ভালো না। তিনি জানালেন তার সময়টা অনুকূলে নয়। বহু প্রতিভার অধিকারী তাজিনের এ দুরবস্থা কেন প্রশ্ন করতেই তিনি অকপটে জানান . . . নাটক পলিটিক্সের শিকার আমি। নাটক পাড়াতে আমার অনেক বন্ধু এখন বড় শত্রু। কয়েকজন বন্ধু বান্ধব ছাড়া সকলেই বিমাতাসুলভ আচরণে ব্যস্ত। তিন বছর যাবত হাতে কোন নাটক নেইকাজ নেই . . . জীবন চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। মাও কাশিমপুর কারাগারে। শুধু অন্ধকার দেখছি . . .। তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আমার মোবাইল নম্বর চাইলেন এবং বললেন মাঝে মধ্যে বিরক্ত করবো তোমাকে . . .

প্রিয় পাঠক. . . আমাদের জীবন চলার পথে বিরক্তির শেষ নেই। হরেক রকম বিরক্তিতে আমাদের চলমান সময়। এপ্রিলের প্রথম দিকে তাজিন আহমেদ একটা আকুতি করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম আসবেন এবং তার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে . . .। কিন্তু চট্টগ্রাম আসার পূর্বেই তাজিন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব।

প্রসঙ্গত: অভিনয় শিল্পী তাজিন আহমেদের মৃত্যুকে নিয়ে এ সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা অনিমেষ আইচ বলেন, ‘তাজিন নাট্যাঙ্গনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিল।’ প্রতিভাও ছিল চমৎকার। তাজিন আমাদের সহকর্মী। আমরা কিন্তু কতটুকু ভালোবাসতে পেরেছি তাকে। তার লাশ দেখার জন্য নাট্যাঙ্গনে সহকর্মীরা ছুটে এসেছে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো জীবিত তাজিন আহমেদের কাছ থেকে আমরা অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।

সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে যদি আমরা সকলেই তাজিনের পাশে দাঁড়াতাম তাহলে তাজিন আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যেত না। তাজিন আমাদের কাছ থেকে ভিক্ষা চায় নি। চেয়েছিল কাজ করে বেঁচে থাকতে দর্শকদের হৃদয়ে।’

x