অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও তিনি বুঝিয়ে দিলেন ‘আমরাও পারি’

চারটি গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী পণ্ডিত সুদর্শন দাশ

বৃহস্পতিবার , ২৯ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
88

এক টানা তবলা বাজিয়েই চলেছেন। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এবং দিনের পর দিন। এভাবে বাজাতে বাজাতে ২০১৬ সালে তবলা বাজালেন একটানা ৫৫৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন এটা কি সম্ভব? তাই তারা তাকে উৎসাহ দেয়ার বদলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। আবার অনেকেই তাকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দেন, আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আর যখন তিনি ২৫ দিন তবলা বাজিয়ে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন বিশ্বের অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তখন তিনি সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন ‘আমরাও পারি’। তখন তার সাফল্যগাথা দেখতে ও প্রকাশ করতে ছুটে আসতে শুরু করলেন সবাই। এমনকি প্রথমে যারা তাকে সহযোগিতা করতে চাননি তারাও। তিনি মনে করেন উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা বাঙালিরাও বিশ্বে আমাদের তুলে ধরতে পারি সম্মানের সাথে। যুক্তরাজ্য প্রবাসী চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান ব্যারিস্টার পণ্ডিত সুদর্শন দাশ দৈনিক আজাদী’র প্রবীর বড়ুয়া’র কাছে এভাবেই তুলে ধরলেন তার সাফল্যের কাহিনী।
শুধু একটি নয় গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে পরে আরো তিনটি অর্থাৎ মোট চারটি রেকর্ড গড়েছেন পণ্ডিত সুদর্শন। অন্য তিনটি রেকর্ড হলো ২০১৭ সালে একটানা ২৭ ঘণ্টা ঢোল, ২০১৮ সালে একটানা ১৪ ঘণ্টা ড্রাম রোল ও ২০১৯ সালে একটানা ১৪০ ঘণ্টা ৫ মিনিট ড্রাম সেট বাজানোর। তিনি প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ রেকর্ডটি গড়ার সময় প্রতি ঘণ্টায় অবসর পান ৫ মিনিট করে। তৃতীয়টিতে অবসর নেয়ার কোনো সময় পাননি।
তিনি ভারতের শান্তিনিকেতন থেকে পড়াশোনা করে এসে বৃত্তি নিয়ে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করার জন্য যুক্তরাজ্য যান ২০০০ সালে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব গ্রীনিচে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর মাস্টার্স করেন নর্দাম্ব্রিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে। তিনি সেখানে দেখলেন সেদেশে প্রতিটি স্কুলে ভারতীয় সংস্কৃতি শেখানো হয় যার মধ্যে ছিল তবলাও। লন্ডনের নেহেরু কালচারাল সেন্টারের মহাত্মা গান্ধী অডিটরিয়ামে তার তবলাবাদন দেখে ২০০১ সালের দিকে একদিন ভারতীয় বংশোদ্ভুত কৃষ্ণা দিদি তাকে লন্ডনের ক্যাম্পডেন সেকেন্ডারি স্কুলে তবলা শেখানোর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান। কৃষ্ণা দিদি ছিলেন সেই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। সুদর্শন দাশ সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের পাশাপাশি তবলা, কঙ্গো, বঙ্গ ইত্যাদি শেখানোও চালিয়ে যেতে লাগলেন। এরই মধ্যে ২০০৩ সালে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে এমন সময় ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ সুদর্শনের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনে সহায়তা করে যেহেতু তিনি তাদের স্কুলে তবলা শেখাচ্ছিলেন অনেক দিন ধরে। তখন যুক্তরাজ্য সরকারের ডাক্তার, প্রকৌশলী সহ বিভিন্ন পেশার দক্ষ মানুষদের ভিসা দেয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এমন একটা সময়ে ছয় মাসের মধ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়ে গেলেন।
ইতোমধ্যে তার আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ হলেও ক্যাম্পডেন সেকেন্ডারি স্কুলে তার প্রশিক্ষণ দেয়া কিন্তু চলছিল। এমন অবস্থায় আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে মার্কিন বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক টম ওয়ার্ড তার ছেলেকে তবলা শেখানোর জন্য সুদর্শনকে অনুরোধ করেন। টম এশিয়ান ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার নামে একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চালাতেন তখন।
২০০৪ সালের এপ্রিলে সুদর্শন দাশ টম ওয়ার্ডের সাথে মিলে গড়ে তুললেন লন্ডন তবলা এন্ড ঢোল একাডেমি। তিনি হলেন অধ্যক্ষ আর টম কো-ফাউন্ডার। টমের ছেলেকে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে নিয়ে যে সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান যাত্রা করেছিল ২০০৪ সালে সেটিতে এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৬৫ জনের মতো। এখন শুধু তবলাই নয় সেখানে শেখানো হয় গিটার, সেতার, হারমোনিয়াম সহ পশ্চিমা সঙ্গীতও রয়েছে সমৃদ্ধ সিলেবাস। সুদর্শন ও টম মিলে যে প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন সেটিতে এখন অনেক পরিচালক ও শিক্ষক সঙ্গীত প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত। ২০০৭ সালে আইন বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করার আগে ২০০৫ সালে তিনি সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনার করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়া শুরু করলেন। সেই কোর্স সম্পন্ন করলেন ২০০৮ সালে। ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া মানুষটি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়লেন সঙ্গীতের জগতে। ২০০৮ সালে তিনি বিপিবি ল স্কুলে ব্যারিস্টারি পড়ার সুযোগও পেয়ে গেলেন।
পড়াশোনা-সঙ্গীত সব একসাথে চলছে। এমন সময় ২০০৯ সালে তিনি ভারতের চেন্নাইতে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে জানতে পারেন ডা. কুঝালমানাম জি রামাকৃষ্ণান একটানা মৃদঙ্গ বাজিয়ে গিনেজ রেকর্ড করেছেন। ভাবলেন তার কাছে গেলে হয়তো গিনেজ রেকর্ডে নাম উঠানোর ব্যাপারে অনেক পরামর্শ পাওয়া যাবে। তাই অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে দু’জন লোক লাগালেন ডা. কুঝালমানামের ঠিকানা খুঁজে বের করার জন্য। একসময় ঠিকানা পাওয়া গেল। চেন্নাই শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে তার বাড়ি। ডা. কুঝালমানাম পণ্ডিত সুদর্শন দাশকে গিনেজ রেকর্ড করার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা জানালেন। সেই সাথে কিছু পরামর্শও দিলেন। ইতোমধ্যে ২০১০ সালে সুদর্শন ব্যারিস্টার হয়ে গেলেন। গিনেজ রেকর্ডের কাছে চারটি বিষয়ে আবেদন করলেন ২০১২ সালে। গিনেজ রেকর্ডে শুধু আবেদন করলেই হবে না, রেকর্ড করার জন্য আবেদনকারীকে অনেক অর্থও খরচ করতে হয়। প্রথমে নিজের খরচে ডেমো দেখাতে হয়। আর সেজন্য সুদর্শনের খরচ হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার পাউন্ড। আর মূল সেশনে খরচ হয়েছিল ৩৫ হাজার পাউন্ডের মতো কারণ উভয়টিতেই ডাক্তার, এম্বুলেন্স, ভিডিওগ্রাফার ইত্যাদি নানা পেশার লোককে জড়িত রাখতে হয়। ডেমো এবং মূল সেশনের মধ্যে সময় ছিল মাত্র ৬ মাস। এ স্বল্প সময়ে তিনি এই খরচের মধ্যে ১৫ হাজার পাউন্ড স্পন্সরদের কাছ থেকে পেলেও বাকি টাকাটা নিজের ক্রেডিট কার্ড, সঞ্চয় ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাড় করেন। দেশ-বিদেশের অনেকে তাকে স্পন্সর করলেও কেউ কেউ তার সাফল্যের ব্যাপারে ছিলেন সন্দিহান। অনেকে ‘সে আর এমন কী করবে। দশদিনের মাথায় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে’ এমন মন্তব্যও করেছিলেন। কেউ কেউ তাকে রেকর্ড করার চিন্তা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে শিল্পী নিয়ে গিয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজন করার প্রস্তাবও দেন তখন।
গিনেজ রেকর্ডে সুদর্শনের তবলা বাজানোর মূল সেশনের প্রথমদিকে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও তিনি গিনেজ রেকর্ডের কঠিন সব নিয়ম-কানুন মেনে তবলা বাজিয়েই চলেছেন। তখন ১৮ দিন পর মিডিয়াগুলো আসতে শুরু করল তার সংবাদ প্রচার করার জন্য। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আসলেন নামীদামি ব্যক্তিত্বরাও। এভাবে একটানা ৫৫৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট তবলা বাজানোর পর তাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে যাবতীয় পরীক্ষার পর থাকতে হয় প্রায় দেড় মাসের মতো। এত কষ্টের পর তার অর্জিত সাফল্য তার মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে তুলল দেশের জন্য এমন একটা সম্মান আনতে পেরেছেন তাই। বিশ্বের সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ এ রেকর্ডে তার নামের পাশাপাশি বাংলাদেশের নামটিও লেখা হওয়াতে গর্ববোধ করেন পণ্ডিত সুদর্শন দাশ। যারা গিনেজ রেকর্ডে নাম লেখানোর স্বপ্ন দেখেন তাদের প্রতি তিনি ধৈর্য ধরে নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জেনে কঠোর পরিশ্রম করে প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দেন।
পণ্ডিত সুদর্শন দাশ তার তবলা বাজানোর গিনেজ রেকর্ডটি উৎসর্গ করেছিলেন তার মা-বাবাকে, ঢোল বাজিয়ে দ্বিতীয় রেকর্ডটি উৎসর্গ করেছিলেন তার তবলা এন্ড ঢোল একাডেমিকে। ড্রাম রোল বাজিয়ে করা তৃতীয় রেকর্ডটি উৎসর্গ করেছিলেন রোহিঙ্গা শিশুদের এবং ড্রাম সেটের চতুর্থ রেকর্ডটি উৎসর্গ করেন শরণার্থী শিশুদের জন্য। রেকর্ডগুলো উৎসর্গ করার পর বিভিন্ন সূত্রে যে আয় হয় সেটি তিনি সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন সামগ্রীর মাধ্যমে দিয়ে দেন।
এখন তার প্রতিষ্ঠিত লন্ডন তবলা এন্ড ঢোল একাডেমির শাখা রয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতে। এ শাখাগুলোতে সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় শেখানো হয়ে থাকে। ভারত ও চট্টগ্রামের শাখাগুলোতে মেধাবী ও দরিদ্রদের বিনামূল্যেও পড়ানো হয়। তবলা শিখতে আগ্রহীদের জন্য পণ্ডিত সুদর্শন দাশ তবলার দু’টি ডিভিডিও প্রকাশ করেছেন। একটি ‘লার্ন টু প্লে তবলা’ এবং অন্যটি ‘লার্ন টু প্লে তবলা উইথ সিঙ্গিং’। এ দু’টি ডিভিডিই এখন পাওয়া যাচ্ছে বিশ্ববাজারে।
কৃতী এ শিল্পী এবারের গিনেজের ওয়ার্ল্ড মিউজিক ট্যুরে সিঙ্গাপুর ও ভারতে পরিবেশনা শেষে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের আয়োজনে অংশ নেবেন আজ ২৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় থিয়েটার ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে। তার সঙ্গে কী-বোর্ডে থাকবেন যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত কী-বোর্ড বাদক মাইকেল বোর্ড। ছোটদের সাংস্কৃতিক জগত শিশুমেলা’র আমন্ত্রণ ও আয়োজনে চারটি গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান ব্যারিস্টার পণ্ডিত সুদর্শন দাশের এ পরিবেশনা সবার জন্য উন্মুক্ত। শিশুমেলা ২০১৫ সালের ১৭ মার্চ জাতীয় শিশুদিবসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর আয়োজন করে আসছে নবান্ন উৎসব, ছোটদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক আবহ বিকাশে গঠিত সংগঠনটি ২০১৭ সালে শুরু করেছে মাতৃ সম্মাননা প্রদান এবং শিশু উৎসব ও শিশুমেলা সম্মাননা। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পণ্ডিত সুদর্শন দাশের আজকের পরিবেশনার পর ভবিষ্যতে ওস্তাদ জাকির হোসেন সহ অন্যান্য শিল্পীদের অনুষ্ঠান আয়োজনেরও উদ্যোগ নেবেন বলে জানান শিশুমেলা’র পরিচালক রুবেল দাশ প্রিন্স।
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য একদিন যে মানুষটি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য গিয়েছিলেন সেই বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার হওয়ার পরও ধীরে ধীরে তার জীবন জড়িয়ে গেল সঙ্গীতের সাথে। সঙ্গীতের চারটি বিষয়ে গিনেজ রেকর্ডে নাম লিখিয়ে দেশের জন্য বয়ে আনলেন অনন্য সম্মান, মর্যাদা ও গৌরব। সঙ্গীত জগতে দেশকে বিশ্বের কাছে সম্মানের সাথে তুলে ধরার পাশাপাশি তার জীবনও হয়ে উঠল সঙ্গীতময়।

x